চুয়াডাঙ্গায় মাছের আঁইশ রফতানিতে আয় হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা

বাজারগুলো থেকে সংগৃহীত এই আঁইশ ঢাকায় প্রক্রিয়াজাত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্ববাজারে। জাপান, চীন, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উন্নত দেশগুলোতে রফতানি হচ্ছে বাংলাদেশের এই পণ্য।

এফ এ আলমগীর, চুয়াডাঙ্গা

Location :

Chuadanga
মাছের আঁইশ
মাছের আঁইশ |নয়া দিগন্ত

একসময় যা ছিল পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ও পরিত্যক্ত বর্জ্য, তা-ই এখন রূপ নিয়েছে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের হাতিয়ারে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণের পর ফেলে দেয়া মাছের আঁইশ এখন চুয়াডাঙ্গার স্থানীয় অর্থনীতির নতুন মোড় ঘুরিয়ে দিচ্ছে। আঁইশ সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনকে কেন্দ্র করে জেলাটিতে তৈরি হচ্ছে নতুন কর্মসংস্থান, স্বাবলম্বী হচ্ছেন শতাধিক প্রান্তিক মানুষ।

চুয়াডাঙ্গা জেলা মৎস্য অফিস ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা যায়, বাজারগুলো থেকে সংগৃহীত এই আঁইশ ঢাকায় প্রক্রিয়াজাত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্ববাজারে। জাপান, চীন, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উন্নত দেশগুলোতে রফতানি হচ্ছে বাংলাদেশের এই ফেলনা পণ্য। আন্তর্জাতিক বাজারে মাছের আঁইশ দিয়ে বিশ্বমানের প্রসাধনী, অ্যান্টি-এজিং স্কিন কেয়ার, লিপস্টিক, ক্যাপসুলের জৈব আবরণ এবং ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্পে ব্যবহৃত উচ্চমূল্যের কোলাজেন, জেলেটিন ও কাইটোসান তৈরি হচ্ছে।

চুয়াডাঙ্গা শহরের বড়বাজার, জিনতলা পাড়া ও দর্শনা বাসস্ট্যান্ড বাজার ঘুরে দেখা যায় এক নতুন ব্যস্ততা। বাজারে যারা মাছ কাটার কাজ করেন, তারা এখন আর আঁইশ ড্রেনে ফেলে দেন না। মাছ কাটার পর আঁইশগুলো ধরে রেখে পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে কড়া রোদে শুকানো হয়। আর্দ্রতা ১০ শতাংশের নিচে নামলে তা বিক্রির উপযোগী হয়।

চুয়াডাঙ্গা বড়বাজারের মাছ কাটার কারিগর সাইফুল ইসলাম জানান, প্রতিদিন ১৫-২০ কেজি আঁইশ সংগ্রহ করে মাসে বাড়তি তিন থেকে চার হাজার টাকা আয় করছেন তিনি।

আরেক ব্যবসায়ী শরীফ উদ্দীন জানান, মাছ কাটার নিয়মিত পারিশ্রমিকের পাশাপাশি আঁইশ বিক্রি থেকে আসা এই অতিরিক্ত অর্থ তাদের সংসার পরিচালনায় বড় ভূমিকা রাখছে।

সংগৃহীত প্রতি মণ শুকনো আঁইশ স্থানীয় পাইকারদের কাছে দুই হাজার থেকে চার হাজার টাকায় বিক্রি হয়।

ব্যাপারিরা বাজার ঘুরে এই আঁইশ সংগ্রহ করে বস্তাবন্দি করে পাঠিয়ে দেন ঢাকা ও চট্টগ্রামের প্রধান রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে। দর্শনা বাজারের মাছ কাটার কারিগর শুকুর আলী জানান, পল্লী কর্ম-সংস্থান ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় এবং স্থানীয় ‘ওয়েভ ফাউন্ডেশন’-এর প্রশিক্ষণে তিনি আধুনিক উপায়ে আঁইশ সংরক্ষণ শিখছেন।

ওয়েভ ফাউন্ডেশনের মৎস্য কর্মকর্তা সাঈদ-উর-রহমান বলেন, ‘উদ্যোক্তা তৈরি ও উপযুক্ত পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ শিল্প দেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে।’

চুয়াডাঙ্গা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফরহাদুর রেজা বলেন, ‘একসময়ের আবর্জনা এখন সম্পদে পরিণত হয়েছে। মাছের আঁইশ মূলত অত্যন্ত মূল্যবান কোলাজেন সমৃদ্ধ উপাদান। দেশে বর্তমানে কোলাজেন ও জেলেটিন তৈরির প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা না থাকায় এটি কাঁচামাল হিসেবে বিদেশে রফতানি হচ্ছে। চুয়াডাঙ্গাসহ সারা বাংলাদেশে শত শত টন আঁইশ সংগ্রহ হচ্ছে। আমরা স্থানীয় বাজারগুলোতে এ বিষয়ে সর্বাত্মক সচেতনতা ও উৎসাহ প্রদান করছি।’