ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে শুরু ৩ দিনব্যাপী বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু উৎসব

পুরাতন বছরের গ্লানি ভুলে সুন্দর ভবিষ্যতের প্রত্যাশায় আমরা ফুল ভাসিয়ে প্রার্থনা করেছি। বিশ্বের সকল মানুষের মঙ্গল এবং পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় থাকুক এটাই আমাদের কামনা।

পুলক চক্রবর্তী, রাঙ্গামাটি

Location :

Rangamati
গঙ্গা দেবীর আশির্বাদ পেতে ফুল ভাসাচ্ছেন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নারী-পুরুষ-শিশুরা
গঙ্গা দেবীর আশির্বাদ পেতে ফুল ভাসাচ্ছেন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নারী-পুরুষ-শিশুরা |নয়া দিগন্ত

রাঙ্গামাটিতে কাপ্তাই হ্রদে গঙ্গা দেবীর উদ্দেশে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর তিন দিনব্যাপী বৃহৎ সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, চাংক্রান, চাংলান, পাতা ও বিহু।

রোববার (১২ এপ্রিল) ভোরে রাজবাড়ী ঘাটসহ বিভিন্ন স্থানে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উৎসবের সূচনা হয়। ভোর থেকেই পাহাড়ি তরুণ-তরুণীরা বাগান থেকে ফুল সংগ্রহ করে ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত হয়ে কাপ্তাই হ্রদের তীরে জড়ো হন।

পরে গঙ্গা দেবীর উদ্দেশে পানিতে ফুল ভাসিয়ে নতুন বছরের মঙ্গল কামনা করেন তারা। এ সময় নারী-পুরুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

শহরের গর্জনতলীতে ত্রিপুরা কল্যাণ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে গঙ্গা দেবীর উদ্দেশে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বৈসু উৎসবের উদ্বোধন করেন রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের সদস্য সাগরিকা রোয়াজা। এ সময় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

এ উৎসব পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ১৪টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় সামাজিক ও ধর্মীয় আয়োজন। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস, ফুল ভাসানোর মাধ্যমে তারা সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ লাভ করেন এবং পুরাতন বছরের সব গ্লানি ধুয়ে নতুন বছরের জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন।

রাঙ্গামাটি বৈসাবি উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব ইন্টু মনি তালুকদার জানান, পুরাতন বছরের গ্লানি ভুলে সুন্দর ভবিষ্যতের প্রত্যাশায় আমরা ফুল ভাসিয়ে প্রার্থনা করেছি। বিশ্বের সকল মানুষের মঙ্গল এবং পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় থাকুক এটাই আমাদের কামনা।

রাঙ্গামাটিতে উৎসবকে ঘিরে পাহাড়ের বাজার ও বিপণি বিতানগুলোতে বেড়েছে কেনাকাটা, আর শহরে ভিড় জমিয়েছেন অসংখ্য পর্যটক।

পাহাড়ের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী নিজেদের স্বতন্ত্র ঐতিহ্য অনুযায়ী এই উৎসব পালন করে। চাকমারা একে বিজু, মারমারা সাংগ্রাই, ত্রিপুরারা বৈসু, তঞ্চঙ্গারা বিষু, ম্রো ও খুমিরা চাংক্রান, সাওতালরা পাতা ও অহমিয়া বা গুর্খারা বিহু নামে উদযাপন করে থাকে।

সমতলের মানুষের কাছে এটি ‘বৈসাবি’ নামে পরিচিত হলেও সম্প্রতি প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব নামে উৎসব পালনের ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে, যা তাদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র রক্ষার একটি প্রয়াস হিসেবে দেখা হচ্ছে।

উৎসব ঘিরে চলছে নানা আয়োজন। যেমন— ফুল ভাসানো, ঘর সাজানো, পিঠা-পুলি দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন, ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও শিশু-কিশোরদের বিভিন্ন প্রতিযোগিতা।

১৩ এপ্রিল পালিত হবে মূল বিজু। এ দিন ঐতিহ্যবাহী পাঁজন রান্না করে অতিথি আপ্যায়নের মধ্য দিয়ে দিনটি উদযাপন করা হবে।

১৪ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হবে গোজ্যেপোজ্যে। এছাড়া ১৫ এপ্রিল কাপ্তাই চিৎমরম বৌদ্ধ বিহার এলাকায় ও ১৭ এপ্রিল রাঙ্গামাটির চিং হ্লা মং মারি স্টেডিয়ামে মারমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী সাংগ্রাই জলোৎসবের মধ্য দিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটবে।

তবে আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও মাসজুড়ে রাঙ্গামাটির বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে চলবে এই উৎসবের আমেজ।