সিলেটে সাংবাদিক তুরাব হত্যার দ্রুত বিচার দাবিতে প্রধানমন্ত্রীকে স্মারকলিপি

নামাজ শেষে বিএনপি ও অঙ্গসহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা মিছিল বের করলে তুরাব অন্যান্য সহকর্মীদের সাথে মিছিলের স্থির ও ভিডিও চিত্র তুলতে যান। মিছিলটি পুরানলেন গলির মুখে পৌঁছার পর সশস্ত্র পুলিশ পেছন দিক থেকে গুলিবর্ষণ শুরু করে। এতে অনেকে গুলিবিদ্ধ হন এবং ছবি তুলতে থাকা এ টি এম তুরাবও গুলিবিদ্ধ হন।

এমজেএইচ জামিল, সিলেট ব্যুরো

Location :

Sylhet
জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি প্রদান, (ইনসেটে) পুলিশের গুলিতে নিহত সাংবাদিক এ টি এম তুরাব
জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি প্রদান, (ইনসেটে) পুলিশের গুলিতে নিহত সাংবাদিক এ টি এম তুরাব |নয়া দিগন্ত

সিলেটে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের গুলিতে নিহত দৈনিক নয়া দিগন্তের সিলেট ব্যুরো প্রধান সাংবাদিক এ টি এম তুরাব হত্যার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার ও দ্রুত বিচার নিশ্চিতের দাবিতে সিলেটের জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন সিলেট বিভাগীয় কমিটির মাসব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে রোববার (১২ জুলাই) দুপুরে সিলেটের সর্বস্তরের সাংবাদিকবৃন্দের পক্ষ থেকে একটি প্রতিনিধি দল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে এই স্মারকলিপি হস্তান্তর করে। স্মারকলিপিটি গ্রহণ করেন সিলেটের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক পিংকি সাহা।

স্মারকলিপিতে সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালন করা অবস্থায় একজন সংবাদকর্মীকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের ওপর চরম আঘাত। ঘটনার এতদিন পেরিয়ে গেলেও হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা এবং নির্দেশদাতাদের দৃশ্যমান বিচার প্রক্রিয়া শুরু না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক ও হতাশাজনক। নেতৃবৃন্দ অনতিবিলম্বে সাংবাদিক তুরাব হত্যার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষী পুলিশ সদস্য ও জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

স্মারকলিপি গ্রহণ করে ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক সাংবাদিকদের আশ্বস্ত করে বলেন, সাংবাদিক এ টি এম তুরাব হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। তদন্ত প্রক্রিয়ার অগ্রগতি এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি জোরালোভাবে উত্থাপন করা হবে।

স্মারকলিপি প্রদানের সময় উপস্থিত ছিলেন সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি মুকতাবিস-উন-নুর, সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন সিলেট বিভাগীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হুমায়ুন কবির লিটন, সাধারণ সম্পাদক আশকার ইবনে আমিন লস্কর রাব্বি, সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি মো: দুলাল হোসেন, সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি মো: ইউসুফ আলী, সাবেক কোষাধ্যক্ষ মাহমুদ হোসেন।

এছাড়াও সিলেটের বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও নিহতের সহকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সিলেটে শহীদ হওয়া সাংবাদিক এ টি এম তুরাবের স্মরণে মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন (বিপিজেএ) সিলেট বিভাগীয় কমিটি। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে আগামী ১৮ জুলাই শহীদ এ টি এম তুরাবের স্মরণে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল, ১৯ জুলাই শহীদ তুরাবের কবর জিয়ারত এবং ২৫ জুলাই মানববন্ধন কর্মসূচি।

উল্লেখ্য, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বাদ জুমা সিলেট নগরের কোর্ট পয়েন্ট এলাকায় পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য অবস্থান করছিলেন বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন সিলেট বিভাগীয় কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য, সিলেট প্রেসক্লাব সদস্য ও দৈনিক নয়া দিগন্তের তৎকালিন সিলেট ব্যুরো প্রধান এ টি এম তুরাব। নামাজ শেষে বিএনপি ও অঙ্গসহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা মিছিল বের করলে তুরাব অন্যান্য সহকর্মীদের সাথে মিছিলের স্থির ও ভিডিও চিত্র তুলতে যান।

মিছিলটি পুরানলেন গলির মুখে পৌঁছার পর সশস্ত্র পুলিশ পেছন দিক থেকে গুলিবর্ষণ শুরু করে। এতে অনেকে গুলিবিদ্ধ হন এবং ছবি তুলতে থাকা এ টি এম তুরাবও গুলিবিদ্ধ হন।

প্রসঙ্গত, পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে ইংরেজিতে বড় অক্ষরে ‘প্রেস’ লেখা ভেস্ট তুরাবের গায়ে ছিল। তা সত্ত্বেও তার দিকে লক্ষ্য করে পুলিশ গুলি ছুঁড়েছে।

গুলিবিদ্ধ তুরাব চিৎকার করে মাটিতে পড়ে গেলে অন্য সহকর্মীরা তাকে দ্রুত সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। শুক্রবার ছুটির দিনে সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় এবং তার শারীরিক অবস্থা আরো খারাপ হওয়ার শঙ্কায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে নগরের সোবহানীঘাটস্থ ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসারত অবস্থায় সন্ধ্যা ৬টা ৪৪ মিনিটে তার মৃত্যু হয়।

সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল হাসপাতালে ময়নাতদন্তে তার শরীরে ৯৮টি ছররা গুলির আঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলে চিকিৎসক রিপোর্টে উল্লেখ করেছেন। এ ঘটনায় একই বছরের ২৪ জুলাই সাংবাদিক তুরাবের বড় ভাই আবুল হাসান মো: আযরফ (জাবুর) এসএমপির কোতোয়ালি মডেল থানায় আট থেকে ১০ জন পুলিশকে অভিযুক্ত করে এজাহার দাখিল করেন। কিন্তু কোতোয়ালি থানা পুলিশ সেটিকে মামলা হিসেবে গ্রহণ না করে জিডি হিসেবে নথিভুক্ত করে।

৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর ১৯ আগস্ট সিলেটের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল মোমেনের আদালতে এ টি এম তুরাব হত্যার ঘটনায় পুনরায় মামলা দায়ের করেন তার ভাই আবুল আহসান মো: আযরফ (জাবুর)। মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ ১৮ জনের নাম উল্লেখসহ ২০০-২৫০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।

আদালত শুনানি শেষে মামলার এফআইআর করার নির্দেশ দিয়েছেন। মামলায় ২ নম্বর আসামি অতিরিক্ত উপকমিশনার (ক্রাইম উত্তর) মো: সাদেক দস্তগীর কাউসার, ৩ নম্বর আসামি সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার আজবাহার আলী শেখ, ৪ নম্বর আসামি সহকারী কমিশনার (কোতোয়ালি) মিজানুর রহমান।

অন্য আসামিরা হলেন— সিলেটের কোতোয়ালি মডেল থানার বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ কল্লোল গোস্বামী, থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মঈন উদ্দিন, ওসি (তদন্ত) ফজলুর রহমান, থানার এসআই কাজি রিপন সরকার, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ও সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আফতাব উদ্দিন, জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সভাপতি পিযূষ কান্তি দে, যুবলীগ নেতা ও সিসিকের তৎকালীন গণসংযোগ কর্মকর্তা সাজলু লস্কর, সিলেট সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি ও সিসিকের ৩২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর রুহেল আহমদ, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সজল দাস অনিক, নগরের চালিবন্দর নেহার মঞ্জিলের বাসিন্দা শিবলু আহমদ (মো: রুহুল আমিন), এসএমপির কনস্টেবল/২১৬৮ সেলিম মিয়া, কনস্টেবল/১৯৫৭ আজহার, কনস্টেবল/২২৫৫ ফিরোজ, কনস্টেবল/১৬০৩ উজ্জ্বল।

এই মামলায় দু’জন আসামি গ্রেফতার হলেও বাকিরা এখনো পলাতক রয়েছেন। মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন আছে। ট্রাইব্যুনালে কয়েকজন সাক্ষির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও নেয়া হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সিলেট তদন্ত করছে। সিলেটের সর্বস্তরের সাংবাদিকবৃন্দ দ্রুত তুরাব হত্যার বিচার দাবি করেছেন।