ইউরোপে লোক পাঠানোর নামে গ্রাহকদের ৭ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে লাপাত্তা সিলেটের ছাত্রদল ও যুবশক্তির দুই নেতা। টাকা নিয়ে গা ঢাকা দিয়েছেন ‘অ্যামেক্স অ্যাসোসিয়েটস’ নামের ওই প্রতিষ্ঠানের দুই মালিক। ভয়াবহ প্রতারণার শিকার গ্রাহকরা ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্ন চুরমার করে এখন টাকার সন্ধানে হন্যে হয়ে খুঁজছেন তাদের।
জানা গেছে, সিলেট নগরের উপশহরের সি-ব্লকের ৩৭ নম্বর রোডের ৪/এ নম্বর বাসায় ‘অ্যামেক্স অ্যাসোসিয়েটস’ নামের কনসালটেন্সি ফার্ম গড়ে তোলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুব সংগঠন জাতীয় যুবশক্তি সিলেটের আহ্বায়ক জাবের আহমদ (সম্প্রতি অব্যাহতিপ্রাপ্ত) ও মহানগর ছাত্রদলের সদস্য ইমন উদ্দিন। ‘ফ্যামেক্স’ ও ‘ট্যাক্সকম’ নামে আরো দুটি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে তাদের।
জানা যায়, ২০২৪ সালের শেষদিকের প্রতিষ্ঠানটি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে লোক পাঠানোর জন্য ফেসবুক পেজে বিজ্ঞাপন প্রচার শুরু করে। এমনকি ভুয়া লোক ও ভিসা দেখিয়ে ভিডিও প্রচার করা হয়। প্রতিষ্ঠানের মালিক জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুব সংগঠন জাতীয় যুবশক্তি সিলেটের আহ্বায়ক জাবের আহমদ (সম্প্রতি অব্যাহতিপ্রাপ্ত) ও মহানগর ছাত্রদলের সদস্য ইমন উদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তারা প্রায় ৭০০ তরুণ ও যুবককে ইউরোপে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের কাছ থেকে ১ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়েছেন।
সরাসরি তাদের অফিসের মাধ্যমে ২০০ এবং বিভিন্ন অ্যাজেন্টের মাধ্যমে বাকি লোকদের কাছ থেকে টাকা নেন। দীর্ঘদিনেও ভিসা না হওয়ায় অনেকে টাকা ফেরত চাইতে গেলে তাদের উল্টো হুমকি দেওয়া হয়। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে ভয় দেখানো হয় ভুক্তভোগীদের।
প্রতারণার বিষয়টি জানাজানি হলে গত ১৯ মে অফিসে তালা লাগিয়ে গা ঢাকা দেন জাবের ও ইমন। বিদেশে পালানোরও চেষ্টা করেন তারা। অফিস তালাবদ্ধ করার পর প্রতিষ্ঠানের ফেসবুক পেজটি গায়েব (ডিজলভ) করা হয়। এরই মধ্যে প্রতারণার অভিযোগে মামলা করেছেন ভুক্তভোগী সিলেটের হরিপুর এলাকার বাসিন্দা নিয়াজুর রহমান।
মামলার এজাহারে বলা হয়, প্রায় ৭০০ জনের কাছ থেকে অন্তত ৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। মামলার পর দুজনকে আটক করেছে শাহপরাণ থানা পুলিশ।
প্রতারিত ব্যক্তিদের তথ্যমতে, প্রতিষ্ঠানটির মূল কর্ণধার সিলেট জেলা যুবশক্তির সাবেক আহ্বায়ক জাবের আহমদ। পরে যুক্ত হন ছাত্রদল নেতা ইমন উদ্দিন। তাদের গ্রামের বাড়ি একই এলাকায়। জাবের বিয়ানীবাজারের চান্দগ্রাম ও ইমন কামারকান্দি গ্রামের বাসিন্দা। আওয়ামী লীগ সরকারের পতন-পরবর্তী সময়ে তারা পর্তুগাল, কানাডাসহ কয়েকটি দেশের ফাইল জমা নেন। ফাইল নেয়ার সময় জাবের এনসিপি এবং ইমন বিএনপি-ছাত্রদলের নেতাদের সাথে তোলা ছবিও কাজে লাগান। তারা পর্তুগালের জন্য ১ লাখ ও কানাডার জন্য দেড় থেকে দুই লাখ টাকা অগ্রিম নেন। ৪ থেকে ৬ মাসের মধ্যে ভিসা হওয়ার কথা থাকলেও বছর গড়িয়ে যায়। ফলে টাকা ফেরত চাইতে শুরু করে লোকজন। একপর্যায়ে টাকা ফেরতের জন্য চাপ দিতে শুরু করলে ভুক্তভোগীদের হুমকি ও মামলা দিয়ে হয়রানির ভয় দেখানো হয়। প্রতারিত ৮-১০ জনের সাথে কথা বলে এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ভুক্তভোগীদের একজন কোম্পানীগঞ্জের ফারহান আহমদ। তিনি জানান, পর্তুগালের জন্য এক বছর আগে ১ লাখ টাকা দেন তিনি। টাকা ফেরতের জন্য অফিসে গেলে তাকে বহিরাগত তিন যুবক দিয়ে ভয় দেখানো হয় এবং অস্ত্র প্রদর্শন করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক ভুক্তভোগী জানান, গত মাসে অফিসে গিয়ে টাকার জন্য চাপ দিলে অফিসের নারীদের দিয়ে উত্ত্যক্ত করার মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়ার ভয় দেখানো হয়েছে।
প্রতারণার বিষয়টি জানাজানি হলে ১৯ মে অফিস তালাবদ্ধ করে গা ঢাকা দেন জাবের ও ইমন। ওই দিন রাতে ৩০-৪০ জন ভুক্তভোগী নগরীর কুমারপাড়ার প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর বাসায় গিয়ে ভিড় করেন। তিনি ওই দিন পুলিশ কমিশনারকে ভুক্তভোগীদের মামলা নিয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন।
পরে মহানগরীর শাহপরাণ থানায় জাবের ও ইমনকে প্রধান আসামি করে আরও পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন নিয়াজুর রহমান নামের এক ভুক্তভোগী।
তিনি জানান, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ভিসার নামে অগ্রিম টাকা নেয়া হয় এবং সেই টাকাই তারা মেরে দেয়। ভুয়া ভিসা ও ভুয়া লোক দেখিয়ে ফটোসেশন করে প্রচারণা চালানো হয়। লোকজন বিশ্বাস করে টাকা দেয়।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে জাবের ও ইমনের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরসহ প্রতিষ্ঠানের তিনটি নম্বরে কল করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। সম্প্রতি ছাত্রদল নেতা ইমন বিদেশ পালানোর চেষ্টা করেন। পরে তার পাসপোর্ট ব্লক করা হয়েছে বলে পুলিশের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
সিলেট মহানগর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ফজলে রাব্বী আহসান বলেন, ‘ইমন উদ্দিন দলের কেউ নন। নেতাদের ছবি ব্যবহার করে অপকর্ম করলে এর দায় তাকেই নিতে হবে।’
জাবেরের বিষয়ে জেলা এনসিপির এক নেতা জানান, ‘নানা অভিযোগের কারণে জাবের আহমেদকে অনেক আগেই সংগঠন থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।’
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) কমিশনার আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী শুক্রবার নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘যারা বিদেশে লোক পাঠানোর নামে প্রতারণা করেছে, তারা পুলিশের নজরদারিতে আছে। এরই মধ্যে দুজনকে আটক করা হয়েছে।’



