তীব্র স্রোত আর অব্যাহত ভাঙনে উথাল-পাথাল ধরলা নদী এখন লালমনিরহাটের মানুষের জন্য এক আতঙ্কের নাম। গত মাত্র এক সপ্তাহে জেলার দুটি ইউনিয়নের অন্তত আটটি গ্রামের প্রায় ৩৫০ বিঘা আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভিটেমাটি ও কর্ম হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে প্রায় দুই শতাধিক পরিবার। এরমধ্যেই নতুন করে যোগ হয়েছে লালমনিরহাট শহররক্ষা বাঁধের অন্তত ৬০ মিটার ধসে পড়ার চরম আশঙ্কা। ফলে বাঁধ সংলগ্ন এলাকার লাখো মানুষের চোখে এখন নির্ঘুম রাত।
জানা গেছে, ধরলা নদী মূলত একটি আন্তঃসীমান্ত নদী। ভারত থেকে চ্যাংড়াবান্ধা সীমান্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে পাটগ্রামের কাছে এটি আবারো ভারতে প্রবেশ করে। পরবর্তীতে দ্বিতীয়বারের মতো লালমনিরহাট সদর উপজেলার মোগলহাট ও কুলাঘাট ইউনিয়নের উত্তর-পূর্বদিক দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এই রাক্ষুসী নদী।
বিগত কয়েক বছরের ধারাবাহিক ভাঙনে মোগলহাট ও কুলাঘাট ইউনিয়নের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ফসলি জমি, ঘরবাড়ি, গাছপালা, স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদ, ক্লিনিক ও কাঁচা রাস্তাঘাটসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা গিলে খেয়েছে ধরলা। বিশেষ করে ফলিমারীর চরের প্রায় তিন ভাগই এখন নদীগর্ভে।
লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, ধরলা নদীর ডান তীরে মোগলহাট ইউনিয়নের ইটাপোতা ও কুরুল এলাকায় নির্মিত ১৮ দশমিক পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধটিই মূলত লালমনিরহাট শহররক্ষা বাঁধ হিসেবে পরিচিত। এই দীর্ঘ বাঁধের প্রায় ১০ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার অংশ বর্তমানে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নদীর তীব্র স্রোত ও অব্যাহত ভাঙনের কারণে বাঁধটির বিভিন্ন অংশ মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে বাঁধের প্রায় ৬০ মিটার এলাকায় বড় ধরনের ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। টানা বৃষ্টিপাতে ধরলা নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে লালমনিরহাটের নদী তীরবর্তী চর এবং দ্বীপচরের নিচু এলাকাগুলো নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। ফলে মাথা গোঁজার ঠাঁই ও জীবিকা হারানোর শঙ্কায় আতঙ্কে লাখো মানুষ।
বাস্তুহারা মানুষের করুণ আর্তনাদ এখন ওই এলাকাগুলোতে। ইটাপোতা এলাকার প্রবীণ কৃষক রমজান আলী (৬৫) অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, ‘রাক্ষুসী ধরলা আমার সবকিছু কেড়ে নিয়ে আমাকে নিঃস্ব করে দিয়েছে। দ্রুত এই বাঁধের ভাঙন ঠেকানো না গেলে কয়েক হাজার হেক্টর আবাদি জমি আর হাজারো মানুষের বসতভিটা নদীগর্ভে হারিয়ে যাবে।’
একই সুর শোনা গেল ঘাটের মাঝি আফর উদ্দিন ও চরের বাসিন্দা লুৎফর রহমানের কণ্ঠে। লুৎফর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, ‘এই ধরলাই আমার মা-বাবার কবরসহ আবাদি জমি ভেঙে নিয়ে গেছে। চরে ভাঙন, চারদিকে থৈ থৈ পানি—এর মাঝেই পরিবার নিয়ে কোনোমতে বেঁচে আছি।’
এমনকি মোগলহাট ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জনাব আলীও একসময় ফলিমারীর চরের বাসিন্দা ছিলেন; নদীভাঙনে সবকিছু হারিয়ে এখন তিনি ২ নম্বর ওয়ার্ডে আশ্রয় নিয়েছেন।
মোগলহাট ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান দুলাল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ভাঙন প্রতিরোধে উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বারবার জানানো সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো জরুরি পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।’
অন্যদিকে কুলাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইদ্রিস আলী সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, ‘২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যার ক্ষত মানুষ এখনও ভুলতে পারেনি। এবার যদি এই শহররক্ষা বাঁধ ভেঙে যায়, তবে শুধু কুলাঘাট বা মোগলহাট নয়, পুরো লালমনিরহাট শহর ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।’
এই মহা-সংকট প্রসঙ্গে জানতে চাইলে লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শুনীল কুমার জানান, ভাঙন প্রতিরোধে বড় ধরনের স্থায়ী পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
ধরলা নদীর ডান তীর সংরক্ষণ প্রকল্পটি ইতিমধ্যে প্রাথমিক অনুমোদন পেয়েছে এবং বর্তমানে এটি একনেকের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এছাড়াও বাঁধটি স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের জন্য প্রায় ৩০০ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প প্রস্তুত করা হয়েছে।
তবে তিনি স্বীকার করেন, প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা না গেলে যেকোনো সময় পুরো বাঁধটি ধসে পড়তে পারে, যা জেলা শহরসহ বিস্তীর্ণ জনপদকে এক ভয়াবহ বন্যার মুখে ঠেলে দেবে।
স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীদের দাবি—কাগজে-কলমে প্রকল্প পাসের অপেক্ষায় না থেকে অনতিবিলম্বে জরুরি ভিত্তিতে বালুর বস্তা (জিও ব্যাগ) ফেলে শহররক্ষা বাঁধটি টিকিয়ে রাখার স্থায়ী নদীশাসনের কাজ শুরু করা হোক। তা না হলে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে লালমনিরহাটের এক বিশাল অংশ।



