২০২৪ সালের ২১ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় সাভারে কারফিউ অমান্য করে বিক্ষোভে অংশ নেন হাজারো মানুষ। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ, যুবলীগ এবং ছাত্রলীগের সশস্ত্র কর্মীদের গুলিতে ছয়জন নিহত হন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। একই দিনে বিএনপি, জামায়াত ও সাংবাদিকদের বাড়ি-অফিসে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগও উঠে।
আজ ২১ জুলাই। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের এই দিনটি সাভারবাসীর কাছে এক বিভীষিকাময় দিন হিসেবে স্মরণ করা হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সেদিন কারফিউ উপেক্ষা করে বিপুলসংখ্যক ছাত্র-জনতা ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে কেন্দ্র ঘোষিত ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিতে অংশ নেন। সকাল থেকেই মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ অভিযান চালায়। একইসাথে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র কর্মীদের মোটরসাইকেল শোডাউনের অভিযোগও ওঠে।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সাভার থানা বাসস্ট্যান্ড ও পাকিজা মোড় এলাকায় আন্দোলনকারীদের সাথে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ-সমর্থিত কর্মীদের তুমুল সংঘর্ষ হয়। স্থানীয় সূত্রের দাবি, এ সময় গুলিতে ছয়জন নিহত হন।
এর আগের দিন ২০ জুলাই সাভার বাসস্ট্যান্ডের কাঁচাবাজার এলাকায় প্রতিবন্ধী মুরগি ব্যবসায়ী কুরবান আলী, ফারুক এবং চাপাইন রোড এলাকায় জাবাল-ই-নূর মাদরাসার ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী সাদ মাহমুদ খান নিহত হন বলে স্থানীয়দের দাবি। এছাড়া মুদি দোকানি ইস্রাফিলসহ প্রায় অর্ধশত ব্যক্তি আহত হন।
স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের তথ্যমতে, ২০ ও ২১ জুলাই—এই দু’দিনে সাভারে নয়জন নিহত হন। আর পুরো জুলাই আন্দোলনে সাভার উপজেলায় মোট ৭১ জন নিহত হওয়ার তথ্য বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া যায়।
এদিন সকাল থেকে আন্দোলন দমাতে পুলিশ টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড, শটগান ও ছররা গুলি ব্যবহার করে বলে অভিযোগ রয়েছে। থানা বাসস্ট্যান্ড, পাকিজা মোড়, শিমুলতলা, রেডিও কলোনি, বিশমাইল, পল্লী বিদ্যুৎ, পলাশবাড়ী, বাইপাইল ও জামগড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।
দুপুরের পর থেকে সাভার পৌর এলাকায় বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং ভিন্নমতের ব্যক্তিদের বাড়ি ও অফিসে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ ওঠে।
ঢাকা জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক কাউন্সিলর খোরশেদ আলম অভিযোগ করেন, তাকে না পেয়ে ছায়াবিথী এলাকায় তার শ্বশুরের বাড়িতে হামলা চালানো হয়। সেখানে নগদ ৩৪ লাখ টাকা, ২০ থেকে ২২ ভরি স্বর্ণ, টেলিভিশন, ফ্রিজ, মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন মালামাল লুট করা হয় এবং বাসার বিভিন্ন স্থাপনা গুলিবিদ্ধ করে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়।
একই ধরনের হামলা ও লুটপাটের অভিযোগ করেন পৌর বিএনপি নেতা সোহরাব হোসেন, সাইফুর রহমান, সাবেক কাউন্সিলর আবদুর রহমান এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা জেলার রাজনৈতিক সেক্রেটারি হাসান মাহবুব মাস্টার।
আবদুর রহমানের স্ত্রী দিলরুবা আক্তার রুমী অভিযোগ করেন, তাদের বাসা থেকে প্রায় ৪০ ভরি স্বর্ণ, নগদ টাকা, মোবাইল ফোনসহ মূল্যবান সামগ্রী লুট করা হয় এবং বাসার বিভিন্ন আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়।
সাভার পৌর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও ব্যবসায়ী ওবায়দুর রহমান অভিও অভিযোগ করেন, তার তালাবদ্ধ বাসায় প্রবেশ করে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয় এবং পার্কিংয়ে থাকা দু’টি গাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়।
এছাড়া আইচানোয়াদ্দা এলাকায় যুবদল নেতা ইউনুস খান ও তার ছেলে পৌর ছাত্রদল নেতা নাঈম খানের বাড়িতেও হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে।
শুধু রাজনৈতিক নেতাদের বাসাবাড়িই নয়, সংবাদপত্র অফিসও হামলার শিকার হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় দৈনিক ফুলকি কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে কম্পিউটার, টেলিভিশন, সিসিটিভি ক্যামেরাসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ভাঙচুর এবং কিছু মালামাল লুট করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে। এ সময় পত্রিকাটির বার্তা সম্পাদক নজমুল হুদা শাহীনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদের পর ছেড়ে দেয়ার ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ২১ জুলাই ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক, সংযোগ সড়ক এমনকি আবাসিক এলাকাগুলোও আতঙ্কে পরিণত হয়। নিরাপত্তাহীনতার কারণে সাধারণ মানুষের চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।



