এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, ‘বিএনপির ইতিহাস প্রতারণার ইতিহাস। দেশের প্রত্যেকটি গণঅভ্যুত্থানের বেনিফিসিয়ারি বিএনপি, কিন্তু সব গণঅভ্যুত্থানের সাথেই প্রতারণা করেছে বিএনপি।’
শনিবার (১১ জুলাই) বিকেলে বৃষ্টিস্নাত রংপুর জিলা স্কুল মাঠে ১১ দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশে এসব কথা বলেন তারা।
গণভোটের রায় ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, সীমান্তে পুশইন বন্ধ এবং জনদুর্ভোগ কমানোর দাবিতে এই সমাবেশের আয়োজন করে ১১ দল।
এনসিপি আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামের সভাপতিত্বে সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন জামায়াত আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান।
দুপুরে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাবেশ শুরুর পরই শুরু হয় তুমুল বৃষ্টি। মঞ্চ থেকে আহ্বান করা হয় মাঠে টিকে থাকার। বৃষ্টিতে ভিজেই ৩ ঘণ্টা মাঠে থাকেন নেতাকর্মীরা।
এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বিএনপির বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ করে বলেন, ‘এই রংপুর থেকে আবু সাঈদ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের ডাক দিয়েছিল; গণঅভ্যুত্থানের সিপাহসালার ছিল। কিন্তু আমরা দেখতে পেলাম নির্বাচনের পরে বিএনপি গণভোটের সাথে প্রতারণা করল। বিএনপির ইতিহাস প্রতারণার ইতিহাস। আমরা ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পাবো, বিএনপি সকল গণঅভ্যুত্থানের সুবিধাভোগী এবং সকল গণঅভ্যুত্থানের সাথেই এই বিএনপি প্রতারণা করেছে।’
যুক্তি দেখিয়ে নাহিদ বলেন, ‘এখানে আমার থেকে যারা বয়োজ্যেষ্ঠ আছেন, অভিজ্ঞ আছেন—তারা ভালো বলতে পারবেন। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পরে সকলের দাবি ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমেই বিএনপি ক্ষমতায় এসেছিল এবং পরবর্তীতে সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অস্বীকার করেছিল। তার ফলাফল কী হয়েছিল? বিগত ষোলো বছর বিএনপিকে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে রাজপথে মার খেয়ে, নির্যাতিত হতে হয়েছিল। আজকে বিএনপি যেই গণভোটের কারণে, যেই সংস্কারের কারণে, যেই জুলাই ষোড়শের কারণে ক্ষমতায় আসতে পেরেছে, তার সাথেই তারা প্রতারণা করছে। গণভোটের সাথে প্রতারণা করেছে, বিএনপি ৩১ দফার সাথে প্রতারণা করেছে, বিএনপি জুলাই ষোড়শের সাথে প্রতারণা করেছে, বিএনপি গণতন্ত্রের সাথে প্রতারণা করেছে।’
হাসিনার ফিরে আসা নিয়ে মিডিয়ার সাক্ষাৎকারের কথা উল্লেখ করে নাহিদ বলেন, ‘আমরা গতকাল একটা সাক্ষাৎকারে শুনতে পেলাম যে, ডিসেম্বরে কেউ একজন দেশে আসার পরিকল্পনা করছে। আমরা ফাঁসির দড়ি রেডি করে অপেক্ষা করছি। আপনি ডিসেম্বরে আসুন আর যখনই আসুন, ফাঁসির দড়িতে তাকে ঝুলতেই হবে। বাংলার আটশত বছরের ইতিহাসে লক্ষণ সেনের পরে তিনি দ্বিতীয় শাসক, যিনি বাংলাদেশ থেকে কাপুরুষোচিতভাবে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। বাংলাদেশ থেকে যে পালিয়ে যায়, সে আর বাংলাদেশে কখনো ফেরত আসে না।’
হাসিনার বিদায় প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘পাকিস্তানিরাও এর থেকে সম্মানজনকভাবে বিদায় নিয়েছিল। ইংরেজরাও এই দেশের মাটি থেকে এর থেকে সম্মানজনকভাবে বিদায় নিয়েছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ সরকার যত অসম্মানজনকভাবে, কাপুরুষোচিতভাবে এই দেশ থেকে, এই দেশের জনগণ ও নিজেদের নেতাকর্মীদের ফেলে রেখে পালিয়ে গিয়েছে, ভারতের কোলে আশ্রয় নিয়েছে—তিনি আর এই দেশে আসার সাহস কখনোই পাবেন না। ফলে শেখ হাসিনা আসবে কি আসবে না, এটা দিল্লির সাথে ঢাকাকে নির্ধারণ করতে হবে। দিল্লিকে স্ট্রং মেসেজ দিতে হবে এই সরকারের। শেখ হাসিনা সেখানে বসে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন।’
নাহিদ ইসলাম আরো বলেন, ‘এদেশের কিছু ফ্যাসিস্ট মিডিয়া আর দোসরেরা সেই সকল তথ্য প্রচার করছে। বাংলাদেশের জনগণ এটা মেনে নেবে না। আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে রাজপথে আছি সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য, গণভোট বাস্তবায়নের জন্য। ইনশাআল্লাহ অচিরেই আপনাদের জন্য আন্দোলনের ডাক আসবে এবং সেই ডাকে আমরা সফল হব।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উদ্দেশ্যে করে নাহিদ বলেন, ‘যদি দেশ পরিচালনা সঠিকভাবে করতে হয়, তাহলে আপনাকে (প্রধানমন্ত্রীকে) অবিলম্বে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে। অবিলম্বে অর্থনৈতিক সংস্কার করতে হবে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। দেশের তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। সীমান্তে পুশইন ও সীমান্ত হত্যা প্রতিরোধ করতে হবে। যদি সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইন প্রতিরোধ করতে না পারেন, তাহলে নিজেদের দল থেকে ‘জাতীয়তাবাদী’ শব্দটি কেটে ফেলে দিন। জাতীয়তাবাদের নামে ব্যবসা করবেন, নিজেদের দেশপ্রেমিক দেখাবেন, অথচ সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইন রোধ করতে পারবেন না—তাহলে দেশের জনগণ আপনাদের ক্ষমতায় থাকার ম্যান্ডেট দেবে না।’
সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির সভাপতি কর্নেল (অব.) ড. অলী আহমদ বীর বিক্রম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালাল উদ্দিন, নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির আল্লামা আবদুল কাইয়ুম সুবহানী, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা: মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র রাশেদ প্রধান এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম চাঁন।
এছাড়াও বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা মমতাজ উদ্দিন, রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল, রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানী, রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী, রংপুর মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির এ টি এম আজম খান, সেক্রেটারি কে এম আনোয়ারুল হক কাজল, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) রংপুর জেলা আহ্বায়ক আল মামুন, মহানগরের সদস্য সচিব আব্দুল মালেকসহ ১১ দলীয় ঐক্যের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
রংপুর বিভাগের আট জেলা থেকে লক্ষাধিক নেতাকর্মী সমাবেশে যোগ দেন। বৃষ্টির কারণে সমাবেশে বিঘ্ন ঘটলেও মাঠ ছাড়েননি নেতাকর্মীরা।



