জামালপুরের ইসলামপুরে মূল যমুনা নদী এখন মরা নদীতে পরিণত হয়েছে। তবে রেখে গেছে কয়েকটি শাখা নদী। শুষ্ক মৌসুমে নদীগুলোতে জেগে ওঠে দিগন্ত জোড়া ধূ ধূ বালুচর। আর বর্ষার সময় যতদূর চোখ যায় শুধু পানি পানি। তবে, এ সময় শুরু হয় ভয়াবহ নদী ভাঙন।
এদিকে এ বছর বর্ষার শুরুতেই যমুনার অন্তত তিনটি শাখা নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে ইসলামপুর উপজেলার মডেল ইউনিয়ন সাপধরীর মানচিত্র ও বেলগাছা ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী মুন্নিয়া গ্রামসহ বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ।
যমুনার নদীর পানি বৃদ্ধির পর একে একে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ঘোষিত মডেল ইউনিয়ন সাপধরীর বসতবাড়ি, রাস্তা-ঘাট ও শত শত একর ফসলি জমি।
অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় ইউনিয়নটির বিভিন্ন পয়েন্টে বালুর বস্তা ফেলা হলেও সেগুলো কোনো কাজে আসেনি। এলাকাবাসী জানান, সামান্য কিছু বালুর বস্তা ফেলা হলেও সেগুলো পানিতে ভেসে গেছে।
এছাড়া যমুনার শাখা নদীর কড়ালগ্রাসের সহায়-সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে বেলগাছা ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী গ্রাম মুন্নিয়ার চর। এই সেই মুন্নিয়ারচর যাকে বলা হয় ইসলামপুরের সেন্টমার্টিন।
প্রায় দুই শ’ বছর আগে যমুনার বুকে জেগে ওঠে মুন্নিয়ার চর। সময়ের পরিক্রমায় এখানে গড়ে ওঠে জনবসতি। স্থাপিত হয় স্কুল-কলেজ, মাদরাসা, হাট-বাজার ও সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্ট। কিন্তু যমুনা নদীর শাখা নদীগুলোর নাব্যতা সঙ্কটের কারণে পানি বৃদ্ধি পেলেই শুরু হয় তীব্র নদী ভাঙন।
ভাঙা-গড়ার এই খেলার মধ্যেই সুখবর জানালেন জামালপুর-২ আসনের আসনের সংসদ সদস্য সুলতান মাহমুদ বাবু।
তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘মূল যমুনা নদী ইসলামপুরের মানচিত্র ক্ষত-বিক্ষত করে উপজেলার পশ্চিম পাশে সরে গেছে। যে কারণে সৃষ্টি হয়েছে একাধিক শাখা ও চরাঞ্চল। চরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘবে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার ইতোমধ্যে যমুনার শাখা নদীর ওপর ৮০০ মিটার করে ১৬০০ মিটার দু’টি সেতু, ৪০ কিলোমিটার রাস্তা ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে ৩৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণের প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। দুর্যোগব্যবস্থপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, সেতু মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এই সকল প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে বলে জানান তিনি।
সাপধরী ইউনিয়নের বাসিন্দা আজিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘ইসলামপুরের যমুনার চর অঞ্চলের চারটি ইউনিয়ন জামালপুরের শস্যা ভান্ডার। কিন্তু এই অঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষ শুষ্ক মৌসুমে পায়ে হেঁটে এবং বর্ষা মৌসুমে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার দিয়ে চলাচল করে থাকে।’
তিনি বলেন, ‘প্রস্তাবিত সেতু, রাস্তা, নদী ভাঙন রোধ ও বেড়িবাঁধ নির্মাণ হলে বগুড়া জেলার শারিয়াকান্দি ও জামালপুর জেলার ইসলামপুর ও মেলান্দহ উপজেলার মধ্যে সংযোগ স্থাপন হবে। পাশাপাশি এই অঞ্চলের মানুষ তাদের উৎপাদিত কৃষি পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাওয়াসহ দীর্ঘ কয়েক যুগের দুর্ভোগের অবসান হবে।’
সাপধরী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান প্রবীণ শিক্ষক জয়নাল আবেদিন বলেন, ‘উল্লেখিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে সাপধরী মডেল ইউনিয়ন হবে একটি নতুন পর্যটন কেন্দ্র। যেখান থেকে সরকারের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয় হওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে।’
বেলগাছা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুর রৌফ দানু বলেন, ‘মুন্নিয়ার চর জামালপুরের সেন্টমার্টিন। যমুনার বুকে জেগে ওঠা এই চরটির বয়স এখন ২০০ বছরের ওপরে। শিক্ষা-দীক্ষা, স্কুল-কলেজ, হাট-বাজার, সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ সবই আছে ওই গ্রামে। বর্তমানে গ্রামটি যমুনার একটি শাখা নদী দ্বারা ভাঙনের কবলে পড়েছে। এতে নিঃস্ব হচ্ছে চরে বসবাসকারী ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বেশ কিছু স্মৃতিচিহ্ন ও স্থাপনা।’
তিনি আরো বলেন, ‘স্থানীয় মাননীয় সংসদ সদস্য সুলতান মাহমুদ বাবু যে সকল প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছেন সেগুলো যমুনার চরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহ্যবাহী মুন্নিয়ার চরসহ ভাঙন রোধ ও চরবাসীর দীর্ঘ দিনের কষ্ট লাঘবে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন এটাই প্রত্যাশা এই অঞ্চলের মানুষের।’



