রংপুরের শিক্ষক পরিবারের ৪ লাশ উদ্ধার : আটক ৩

প্রত্যেকটি লাশের গলায় আঘাতের চিহ্ন আছে। পুলিশ প্রাথমিকভাবে মনে করছে, সবাইকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছে। সবার মুখের মধ্যে গামছা বা নাইলনের দড়ি পেঁচানো ছিল।

সরকার মাজহারুল মান্নান, রংপুর ব্যুরো

Location :

Rangpur
অ্যাম্বুলেন্সে নেয়া হচ্ছে উদ্ধার করা লাশ
অ্যাম্বুলেন্সে নেয়া হচ্ছে উদ্ধার করা লাশ |নয়া দিগন্ত

রংপুর মহানগরীর মাছুয়া পাড়ায় প্রধান ফটক তালাবদ্ধ নিজ বাড়ির থেকে জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ময়নাতদন্তের জন্য রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে চারটি লাশ। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে তিনজনকে।

শনিবার (২২ আগস্ট) দিবাগত রাত ১১টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে মাছুয়া পাড়ার মন্দিরের পাশে রংপুর জেলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর তালাবদ্ধ দোতলা বাড়ি থেকে তাদের লাশ উদ্ধার করা হয়।

এ সময় গণপতি চক্রবর্তীর (৬৫) লাশ দোতলার ছাদ, সিঁড়ির চিলেকোঠার নিচ থেকে স্ত্রী প্রীতিলতা বোলা চক্রবর্তী (৫৫), মেয়ে কারমাইকেল কলেজ থেকে সদ্য মাস্টার্স পাস করা প্রার্থী ওরফে আগামী চক্রবর্তী (২৫) এবং ঘরের খাটের নিচ থেকে পুত্র রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী প্রিয়ম চক্রবর্তীর (১২) লাশ উদ্ধার করা হয়। তাদের গ্রামের বাড়ি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর এলাকায়।

নিহত প্রীতিলতার বোন পূজা চক্রবর্তি বলেন, ‘সবশেষে বৃহস্পতিবার রাত দেড়টার দিকে বড় বোন প্রিতিলতা চক্রবর্তির সাথে ফোনে কথা হয়েছিল তার। কিন্তু শনিবার রাত পৌনে ৯টার দিকে দিকে ফোন দিলে বন্ধ পাই। পরপর জামাই বাবু, ভাগ্নি ও ভাগ্নেকে ফোন দেই। কিন্তু সবার ফোন বন্ধ থাকায় স্বামীকে নিয়ে রাত সাড়ে ১০ টার দিকে মাছুয়াপাড়ার দিদির বাড়িতে যাই।’

তিনি বলেন, ‘সেখানে গিয়ে দেখি প্রধান ফটক তালাবদ্ধ। আশেপাশের লোকজনকে জিজ্ঞাসা করি। তারা কিছুই বলতে পারে না। পরে পাশের তিনতলা দেবুদার বাসায় নক করি। তারা গেট খুলে দিলে ভেতর দিয়ে দিদির বাড়িতে ঢুকে দেখি সব এলোমেলো। আলমিরাসহ সব আসবাবপত্র খোলা। মেঝেতে ছড়ানো ছিটানো সব কিছু। সাথে সাথে আমার স্বামী বিপুল আচার্য্যকে থানায় পাঠাই।’

নিহত গনিপতি চক্রবর্তির ভায়রা বিপুল আচার্য্য বলেন, ‘প্রথমে আমি ট্রিপল নাইনে ফোন করি। তারা আমাকে পরামর্শ দেন কোতয়ালী থানায় যাওয়ার। পরে কোতয়ালী থানায় গেলে পুলিশ, সিআইডি, পিবিআইসহ আইনশৃঙখলা বাহিনীর বিভিন্ন শাখার সদস্যরা আসেন। তারা কর্ডন করে ফেলেন পুরো বাড়ি। এরপর বাসায় ছাদে ওঠার সিড়ির চিলে কোঠার নিচে মা প্রিতিলতা আর মেয়ে প্রার্থী ওরফে আগামী চক্রবর্তি, ছাদে উঠার দরজার বা পাশে গণপতি চক্রবর্তি এবং দোতলার খাটের নিচে প্রিয়মের লাশ সনাক্ত করেন। এসময় মশারি টানানো ছিল গণপতির বিছানায়। হয়তো শোয়ার প্রস্তুতি ছিল তার। পাশের টেবিলে ছিল প্রিয়মের স্কুলের আইডিকার্ড।’

পুলিশের ধারণা বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত আড়াইটার পর ঘটে এই ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ড।

রাতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত রংপুর সিআইডির এসপি (ভারপ্রাপ্ত) সুমিত চৌধুরী বলেন, ‘আমি এখানে ছাদের ওপরে একজন পুরুষ মানুষের ডেডবডি পেয়েছি, মানে ডিকম্পোজ হয়ে গেছে, তিন-চার দিন আগের লাশ হবে সম্ভবত। এটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলা যাবে কতদিন আগের। তবে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে ডিকম্পোজিশন তিন-চার দিন আগের। সেখানে যাওয়ার আগে চিলেকোঠায়, সেখানে মা এবং মেয়ের দেহও পড়ে আছে, সেটাও ডিকম্পোজ। এবং শোবার ঘরে, একটা শোবার ঘরে দেখলাম ওনার ছেলের লাশটা একদম দেয়াল এবং খাটের সাথে লাগানো অবস্থায় একদম ভেতরে ফেলে রাখা। আপাতদৃষ্টিতে আমি যেটা পেলাম এখানে তাদের বৈদ্যুতিক সংযোগটা বিচ্ছিন্ন। এবং পারিপার্শ্বিকতা, ভেতরের যে অবস্থা, তাতে আমার মনে হয় যে এটা ডাকাতির ঘটনা। তবে তদন্ত না করে শেষ কথা বলা যাচ্ছে না। তাদের সমস্ত আসবাবপত্র যেগুলোতে আমরা সাধারণত টাকা-পয়সা বা গহনা-পত্র রাখি, সমস্ত কিছু ড্রয়ার ভাঙা ছিল। তাতে করে আমার মনে হচ্ছে এটা ডাকাতির ঘটনা হতে পারে। আমরা এখন পর্যন্ত যে তথ্য পেয়েছি তাতে এটা শুক্রবার ভোরের দিকে অর্থাৎ বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে, শুক্রবার ভোরের দিকে কোনো এক সময় এই ঘটনাটা ঘটেছে ‘

ঘটনাস্থলে উপস্থিত রংপুর মহানগর পুলিশের উপ পুলিশ কমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তি বলেন, ‘আমরা এই চারটা যে লাশ উদ্ধার করেছি, প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয় যে এটা খুন। এদের সবাইকেই হচ্ছে শ্বাসরুদ্ধ করে খুন করা হয়েছে। এবং এই খুনের পিছনে মোটিভ, ইনটেনশন এখনও ক্লিয়ার না। তবে বাড়িটা যেভাবে তছনছ করা হয়েছে, সেখান থেকে টাকা-পয়সা বা অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র লুটপাট হয়েছে বলে আমরা মনে করছি। আমরা অনেকগুলো বিষয় নিয়ে চিন্তাভাবনা করে এগোচ্ছি। এবং আমরা আশা করছি যে খুব দ্রুতই এই ঘটনার সাথে যারা জড়িত আছে, এটা বের করে ফেলতে পারব।’

সনাতন চক্রবর্তি বলেনন, ‘প্রত্যেকটি লাশের গলায় আঘাতের চিহ্ন আছে, এটা আসলে সুরতহাল রিপোর্ট পুরোপুরি আসলে তখন বোঝা যাবে। তবে আমরা প্রাথমিকভাবে যেটা দেখেছি যে সবাইকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছে। সবার মুখের মধ্যে গামছা বা নাইলনের দড়ি পেঁচানো ছিল।’

এদিকে রংপুর মহানগর পুলিশের মিডিয়া সেল থেকে জানানো হয়েছে, পুরো ঘটাটি নিয়ে বেলা ১২টায় কমিশনার কার্যালয়ের ব্রিফিং করবেন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ।

এছাড়ার জিলা স্কুল কারমাইকেল কলেজ এবং বাসদ এ ঘটনার প্রতিবাদে মানববন্ধন কর্মসুচি ঘোষণা করেছে।

কয়েকদিন থেকেই বাড়িটির প্রধান ফটক তালাবদ্ধ ছিল। ভেতর থেকে গন্ধ বেরুচ্ছিল। কিন্তু প্রতিবেশি কেউই সেটা টের না পাওয়ার বিষয়টি খুবই রহস্যতৈরি করেছে। ভোর ৫টায় লাশের সুরুতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর ময়নাতদন্তের জন্য রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

মহানগর কোতয়ালী থানার ওসি নাজমুল কাদির জানান, এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় এখনো মামলা হয়নি। তবে এলাকা থেকে সন্দেভাজক সিদ্ধার্থ, মুগ্ধসহ তিনজনকে আটক করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ন তথ্য পাওয়া গেছে।