ঝালকাঠির রাজাপুরে ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় এর মধ্যে দু‘টি বিদ্যালয়ে এখনো জরাজীর্ণ ভবনেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কোমলমতি শিশুদের পাঠদান চলছে। যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
গত সোমবার (১৫ জুন) উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিফাত আরা মৌরি বিদ্যালয় তিনটি পরিদর্শন শেষে ভবনগুলো পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন।
পরিত্যক্ত ঘোষিত বিদ্যালয়গুলো হলো ৯৭ নম্বর দক্ষিণ-পূর্ব রাজাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৩ নম্বর পূর্ব সাতুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ৮৫ নম্বর উত্তর কাঠিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
সরেজমিনে ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ৯৭ নম্বর দক্ষিণ-পূর্ব রাজাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশেই 'ইউসুফ আলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়' এর একটি নতুন বহুতল ভবন থাকায়, ইউএনও’র নির্দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান সাময়িকভাবে সেখানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।
তবে অন্য দু’টি বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়েই পরিত্যক্ত ভবনে ক্লাস নিতে হচ্ছে শিক্ষকদের।
৮৫ নম্বর উত্তর কাঠিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সমীর কুমার দাস জানান, ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ে ১৯৯৩ সালে চার কক্ষ বিশিষ্ট একটি পাকা ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল। প্রায় ১০ বছর আগেই ভবনটির বিভিন্ন স্থানের পলেস্তরা খসে রড বেরিয়ে গেছে এবং দেওয়ালে ফাটল ধরেছে। কক্ষ সঙ্কটের কারণে ২০২৪ সালে এলজিইডির অর্থায়নে সোয়া দুই লাখ টাকা ব্যয়ে তিন কক্ষের একটি কাঠ-টিনের ঘর করে দেয়া হলেও সেটির মেঝে কাঁচা।
সেখানে পাঠদান অত্যন্ত কষ্টকর। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা একাধিকবার পরিদর্শন করে নতুন ভবনের আশ্বাস দিলে ও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এখন ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হলেও বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়েই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে ক্লাস নিতে হচ্ছে।
৩ নম্বর পূর্ব সাতুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো: সিদ্দিকুর রহমান জানান, ১৯৪৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ে ২০০১ এবং ২০০৬ সালে পৃথক দুটি ভবন নির্মিত হয়। ইউএনও পরিদর্শনের পর ২০০৬ সালের ভবনটি বাদে বাকি পুরোনো কক্ষগুলো পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষক মিলনায়তনসহ আটটি কক্ষের প্রয়োজন থাকলেও ব্যবহারোপযোগী আছে মাত্র দু’টি কক্ষ।
প্রয়োজনের তুলনায় কক্ষ অনেক কম। বিকল্প কোনো উপায় না থাকায় নিরুপায় হয়ে আমরা পরিত্যক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখতে বাধ্য হচ্ছি।
৯৭ নম্বর দক্ষিণ-পূর্ব রাজাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ইরানী আক্তার জানান, ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ের চারটি কক্ষই সম্পূর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। বর্ষার দিনে ছাদ চুইয়ে ভেতরে পানি পড়ে। নতুন ভবন না পাওয়া পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় পাশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস নেয়া হচ্ছে। দফায় দফায় চিঠি, মিলছেনা সমাধান।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ দিন ধরেই এই ভবন গুলোর জরাজীর্ণ অবস্থার কথা জানিয়ে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য একাধিক বার লিখিত আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু আমলা তান্ত্রিক জটিলতায় বছরের পর বছর পার হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো: আকতার হোসেন বলেন, ‘আমরা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমে এর আগেও একাধিকবার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য লিখিত ভাবে জানিয়েছি, কিন্তু কোনো ফল আসেনি। ইউএনও মহোদয় ভবনগুলো পরিত্যক্ত ঘোষণার পর আমরা আবারো নতুন করে আবেদনের প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিফাত আরা মৌরি ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে ভবনগুলোর অতিঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা দেখে আমি সেগুলো পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছি। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা আমাদের অগ্রাধিকার। নতুন দ্রুত ভবন পাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জরুরি ভিত্তিতে আবেদন পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। ‘
এদিকে, যেকোনো মুহূর্তে ছাদ ধসে বা দেওয়াল ভেঙে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন অভিভাবকরা। তাদের কোমলমতি সন্তানদের নিরাপদে পড়াশোনার পরিবেশ নিশ্চিত করতে এবং অতি দ্রুত নতুন বিদ্যালয় ভবন নির্মাণে সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের জরুরি ও সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ক্ষুব্ধ ও আতঙ্কিত অভিভাবক মহল।



