হজরত শাহজালাল রহ.-এর মাজারের ৭০০ বছরের ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো দানবাক্সের টাকা গণনা সম্পন্ন হয়েছে। দ্বিতীয় দফার গত ১৯ দিনে মাজারের দানবাক্স ও ডেকগুলোতে মোট ৪৭ লাখ ১০ হাজার ১৫৩ টাকা নগদ জমা হয়েছে।
এছাড়াও দানের তালিকায় রয়েছে স্বর্ণ, রুপা, গরু, ছাগলসহ বিদেশী বিভিন্ন মুদ্রা। এর মধ্যে রয়েছে স্বর্ণ ৯ গ্রাম, রোপা ৩৯.৪ গ্রাম, সৌদি রিয়াল ১৩৫, ডলার ২০, আমিরাতের রিয়াল ৫৪২০, ২৫টি ছাগল ও একটি গরুসহ পাকিস্তান ও সিঙ্গাপুরের কিছু মুদ্রা।
শনিবার (১১ জুলাই) দিনভর গণনা শেষে মাজার ব্যবস্থাপনা কমিটি ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
সকাল সাড়ে ১১টার দিকে দরগাহ মসজিদের বারান্দায় জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে সিলগালা করা তিনটি ডেক ও নতুন চারটি দানবাক্স থেকে চার বস্তা টাকা বের করে গণনা শুরু হয়।
শাহজালাল রহ. মাজার মাদরাসার শিক্ষার্থীরা এই টাকা গণনা কার্যক্রমে অংশ নেয়। টাকা গণনার সময় সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী ও সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদীসহ জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং মাজার আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে, গত ২২ জুন তৎকালীন জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রথমবারের মতো মাজারের দানবাক্স খোলা হয়েছিল। সে সময় মাত্র চার দিনে ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা জমা হয়েছিল।
প্রথমবার ১০০০ ও ৫০০ টাকার নোটের আধিক্য বেশি থাকলেও, এবার ১৯ দিনের মাথায় সংগৃহীত চার বস্তা টাকার মধ্যে সংখ্যার দিক থেকে ১০ ও ৫০ টাকার মতো ছোট নোটের পরিমাণই সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে।
মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে গঠিত বিশেষ কমিটির অধীনে এই অর্থ সোনালী ব্যাংকে মাজারের নামে খোলা নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্টে জমা রাখা হবে বলে জানিয়েছেন কমিটির সদস্যরা।
এদিকে, দানবাক্সের ভেতরে বেশকিছু চিঠিও পাওয়া গেছে। একটি চিঠিতে পাওয়া গেছে, যাতে মাজারের টাকা আত্মসাতকারী হিসেবে অভিযুক্ত এক ব্যক্তিকে বাটপার অভিহিত করে তার বিচার চাওয়া হয়েছে। চিঠিতে সিলেটের সাড়া জাগানো ডিসি ‘সারওয়ার আলম ফিরে আসুক’ লেখা হয়েছে।
এর আগে গত ১২ জুন তৎকালীন জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম শাহজালালের মাজার পরিদর্শনে যান এবং মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে তার উদ্যোগে গত ১৮ জুন নতুন চারটি দানবাক্স স্থাপন ও ঐতিহাসিক তিনটি ডেক সিলগালা করা হয়েছিল। শাহজালাল মাজারের ৭০০ বছরের ইতিহাসে এটা ছিল একটি সাহসী ও মহান উদ্যোগ।
এরপর ২২ জুন প্রথম দফায় চার দিনে সংগৃহীত ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা গণনা করে সোনালী ব্যাংকের বিশেষ অ্যাকাউন্টে জমা রাখা হয়, যেখানে প্রথমবার ১০০০ ও ৫০০ টাকার নোটের আধিক্য বেশি ছিল।
বিদায়ী জেলা প্রশাসক এরপর মাজারে আনসার সদস্যদের মোতায়েন করেন এবং তখন থেকে আনসার সদস্যরা মাজারের দানবাক্স ও ডেক পাহারায় রয়েছে।
এছাড়া, জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে মাজারের ডেক ও দানবাক্সে সার্বক্ষণিক নজরদারির জন্যে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, প্রথমবার দানবাক্স খোলার পর জেলা প্রশাসকের এই উদ্যোগ নিয়ে সিলেটে ব্যাপক প্রশংসিত হন ডিসি সারওয়ার আলম। তার এই কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা-সমালোচনাও তৈরি হয় এবং এর মধ্যেই সাবেক জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করা হয়।
পরে গত ২৬ জুন মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্য বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরকে প্রধান করে ১১ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে সরকার।
এ কমিটিকে এক মাসের মধ্যে মাজারের আর্থিক কাঠামোর জন্য আধুনিক সুপারিশ প্রণয়নের দায়িত্ব দেয়া হয়।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরকে প্রধান করে গঠিত কমিটির অপর সদস্যরা হলেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রশাসক রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মশিউর রহমান, জেলা পরিষদের প্রশাসক আবুল কাহের শামীম, সিলেটের ডিআইজি, মহানগর পুলিশ কমিশনার, মাজারের মোতওয়াল্লি পরিবারের দুই সদস্য, মাজার মাদরাসা ও মসজিদের দুই প্রতিনিধি। এই কমিটির সচিবের দায়িত্ব পালন করছেন জেলা প্রশাসক।
আগামী বৃহস্পতিবার মাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির পরবর্তী বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।



