ময়মনসিংহে ৬ মাসে ১০৩ ধর্ষণ মামলা, বিচার শেষ মাত্র একটির

ধর্ষণের শিকার ৬৪ জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে। বাকি ৩৯ জন প্রাপ্তবয়স্ক নারী। দুই শিশু ও তিন নারী সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণ ও এ ধরনের অপরাধে সহযোগিতার অভিযোগে ৮১ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

মো: সাজ্জাতুল ইসলাম, ময়মনসিংহ

Location :

Mymensingh
ফাইল ছবি

ময়মনসিংহে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ধর্ষণের ঘটনা। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই জেলার ১৪টি থানায় ধর্ষণের ঘটনায় ১০৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৪ জনই শিশু ও কিশোরী। অথচ শতাধিক মামলার বিপরীতে বিচার শেষ হয়েছে মাত্র একটির। অধিকাংশ মামলাই তদন্তের ধীরগতি, মেডিক্যাল ও ডিএনএ রিপোর্টের দীর্ঘসূত্রতায় ঝুলে আছে। ফলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের আরো বেপরোয়া করে তুলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্প্রতি জেলার বিভিন্ন উপজেলায় একের পর এক নৃশংস ধর্ষণের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ধোবাউড়ায় পাঁচ বছরের এক শিশুকে দলবদ্ধ ধর্ষণের পর পানিতে চুবিয়ে হত্যা, গফরগাঁওয়ে স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ভালুকায় বিস্কুটের প্রলোভন দেখিয়ে শিশুকে ধর্ষণ এবং ত্রিশালে মসজিদে পড়তে যাওয়া শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ জনমনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।

জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ জুন পর্যন্ত হওয়া ১০৩টি মামলার মধ্যে মাত্র ১১টির অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয়া হয়েছে। দু’টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে। বিচার শেষ হয়েছে মাত্র একটি মামলার।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ধর্ষণের শিকার ৬৪ জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে। বাকি ৩৯ জন প্রাপ্তবয়স্ক নারী। দুই শিশু ও তিন নারী সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণ ও এ ধরনের অপরাধে সহযোগিতার অভিযোগে ৮১ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। একটি ছেলে শিশু ধর্ষণের ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।

গত বছরের একই সময়ের তুলনায় শিশু ধর্ষণের ঘটনা ২২টি বেড়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে ১০৬টি ধর্ষণ মামলার মধ্যে শিশু ভুক্তভোগী ছিল ৪২ জন। এবার সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৪-এ।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ময়মনসিংহ জেলা সভাপতি মনিরা বেগম বলেন, ‘সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, অপরাধীদের দ্রুত শাস্তি না হওয়া এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে। মামলা হলেও অনেক ক্ষেত্রে বিচার দৃশ্যমান হয় না।’

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুনের মতে, নৈতিক অবক্ষয়, মাদকাসক্তি, পারিবারিক নজরদারির অভাব এবং বিকৃত পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা ধর্ষণের প্রবণতা বাড়াচ্ছে।

এদিকে জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম বলেন, ‘মেডিক্যাল ও ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন পেতে দীর্ঘ সময় লাগায় অভিযোগপত্র দিতে বিলম্ব হচ্ছে। চিকিৎসকের বদলি, ছুটি এবং সিআইডির ডিএনএ রিপোর্টে দীর্ঘসূত্রতা এ বিলম্বের অন্যতম কারণ।’

তবে ধোবাউড়ায় পাঁচ বছরের শিশুকে দলবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যার মামলায় ব্যতিক্রমী নজির সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার মাত্র ২৫ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করে তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং এক কিশোরকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

জেলা নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো: নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আলোচিত কয়েকটি ঘটনার দ্রুত বিচার হলেও বেশির ভাগ ধর্ষণ মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। প্রতিটি ধর্ষণ মামলাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা না গেলে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে এ ভয়াবহ অপরাধ থামানো সম্ভব হবে না।’