ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় ফরহাদ হোসেন জনি (৩৫) নামে এক যুবককে পেট্রল ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। মাদকবিরোধী আন্দোলন ও বেকারদের কর্মসংস্থানের দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকার কারণে বেশ কিছুদিন ধরে তিনি হুমকি পেয়ে আসছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন তার স্বজন ও সহকর্মীরা।
ঘটনার আগের দিনও রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে একটি মানববন্ধনে অংশ নিয়ে বক্তব্য দেন ফরহাদ। এর পরদিন বুধবার রাতে মুক্তাগাছা পৌর শহরের মধ্যহিস্যা এলাকায় ভাড়া বাসার সামনে দুই ব্যক্তি তাকে ডেকে নিয়ে শরীরে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় বলে পুলিশের কাছে মৃত্যুর আগে জানান তিনি। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করার পর বৃহস্পতিবার (১১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।
ফরহাদ মুক্তাগাছার মধ্যহিস্যা এলাকার আব্দুস সাত্তারের ছেলে। সবজি বিক্রির পাশাপাশি একটি মুদি দোকান পরিচালনা করতেন তিনি। ‘বেকার মুক্তি কর্মসংস্থান’ নামে একটি সংগঠনের কেন্দ্রীয় সংগঠক ও ময়মনসিংহ শাখার সভাপতি ছিলেন। সামাজিক বিভিন্ন ইস্যুতেও তিনি সোচ্চার ছিলেন।
যেভাবে হামলা
পরিবার সূত্রে জানা যায়, বুধবার রাতে বাসার বারান্দায় বসে মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন ফরহাদ। এ সময় গেটের বাইরে থেকে দুই ব্যক্তি তাকে ডাকেন। বাইরে বের হওয়ার পরপরই তার শরীরে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয় বলে অভিযোগ।
আগুনে দগ্ধ অবস্থায় প্রাণ বাঁচাতে চিৎকার করতে করতে পাশের একটি সেলুনে ছুটে যান ফরহাদ। সেলুন মালিক চান মোহন বলেন, ‘আমার সেলুনের সামনে দৌড়ে এসে ভাই আমাকে বাঁচাও বলে চিৎকার করছিল ফরহাদ। তখন তার শরীরে কোনো কাপড় ছিল না। সে একটি লুঙ্গি চাচ্ছিল। আমি তাকে একটি তোয়ালে দেই। পরে লোকজন এসে তাকে হাসপাতালে নেয়ার ব্যবস্থা করে।’
ঘটনার সময় কাছেই একটি দোকানে বসে চা খাচ্ছিলেন ফরহাদের বাবা আব্দুস সাত্তার। তিনি বলেন, ‘হঠাৎ লোকজনের চিৎকার শুনে গিয়ে ছেলেকে দগ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখি। পরে লোকজনের সহায়তায় তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হয়। সেখান থেকে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।’
ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার দুপুরে মারা যান ফরহাদ।
ঘটনার সময়ের একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, শরীরে আগুন নিয়ে ফরহাদ দৌড়ে আসছেন। একপর্যায়ে শরীরের জ্বলন্ত কাপড় খুলে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। কিছুদূর যাওয়ার পর মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তার পেছনে পড়ে থাকা কাপড়েও তখন আগুন জ্বলছিল।
‘প্রতিবাদ বন্ধ করতে হুমকি দেয়া হচ্ছিল’
ফরহাদের বাবা আব্দুস সাত্তারের দাবি, মাদকবিরোধী অবস্থান ও বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনে সক্রিয় থাকার কারণে বেশ কিছুদিন ধরে তার ছেলেকে হুমকি দেয়া হচ্ছিল।
‘বেকার মুক্তি কর্মসংস্থান’ সংগঠনের প্রধান মো: হানিফও একই ধরনের দাবি করেছেন। ‘হানিফ বাংলাদেশী’ নামে পরিচিত হানিফ জানান, গত মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সাভারে পুলিশ সদস্য হত্যার প্রতিবাদ ও বিচার দাবিতে আয়োজিত মানববন্ধনে ফরহাদ অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে তাকে বক্তব্যও দিতে দেখা যায়।
হানিফ বলেন, ‘এলাকায় বিভিন্ন হুমকি পাচ্ছে বলে আমাকে ইদানীং বলছিল ফরহাদ। সরকারবিরোধী কার্যক্রম আখ্যা দিয়ে এসব বন্ধ করতে বলা হচ্ছিল তাকে। কারা এসব বলছে জানতে চাইলে নির্দিষ্ট করে কারো নাম বলেনি। তবে তারা এলাকারই লোকজন বলে জানিয়েছিল।’
তার দাবি, প্রতিবাদী কর্মকাণ্ডের কারণেই ফরহাদকে পরিকল্পিতভাবে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।
হানিফ আরো বলেন, কিছুদিন আগে এলাকায় সবজির দোকান দিয়েছিলেন ফরহাদ। হুমকি-ধমকির কারণে সেটিও বন্ধ করে দিতে হয়েছে বলে তাকে জানিয়েছিলেন তিনি।
ভূমি অফিসের নথি চুরির ভিডিও নিয়েও বিরোধ
ফরহাদের বাবা আব্দুস সাত্তার জানান, কয়েক মাস আগে মুক্তাগাছা ভূমি অফিস থেকে বস্তাভর্তি সরকারি কাগজপত্র চুরির অভিযোগের বিষয়ে একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন তার ছেলে।
সাত্তার বলেন, ‘রুবেলের ভাতিজা মোমেন প্রায় ২০ দিন আগে বাসায় এসে ফরহাদকে মারধরের হুমকি দিয়ে যায়।’
এ ছাড়া পাশের একটি বাসায় মাদকের আড্ডা বসা নিয়ে একজনের সঙ্গে ফরহাদের বিরোধ ছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
ভূমি অফিসের ওই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া গেছে। সেখানে ফরহাদকে কিছু নথি হাতে নিয়ে সাংবাদিকদের ডেকে বিষয়টি প্রকাশ করার কথা বলতে দেখা যায়।
তবে এসব বিরোধের কোনোটিই হত্যাকাণ্ডের সরাসরি কারণ কি না, তা নিশ্চিত করতে পারেননি ফরহাদের বাবা।
মৃত্যুর আগে পুলিশের কাছে যা বলেছিলেন
মুক্তাগাছা থানার এসআই নাজমুল হোসেন জানান, দগ্ধ ও মুমূর্ষু অবস্থায় অ্যাম্বুলেন্সে হাসপাতালে নেওয়ার সময় ফরহাদের সাথে কথা বলেছিল পুলিশ।
তিনি বলেন, ‘ফরহাদ জানিয়েছিলেন, দুজন ব্যক্তি পেছন থেকে তার ওপর হামলা করে। একজন তার শরীরে পেট্রল ঢেলে দেয় এবং অন্যজন দিয়াশলাই দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। তবে তাদের মুখে মাস্ক থাকায় তিনি কাউকে চিনতে পারেননি।’
কী কারণে তার ওপর হামলা করা হয়েছে, সে বিষয়েও তখন আর বিস্তারিত বলতে পারেননি ফরহাদ। গুরুতর অসুস্থ থাকায় তার সাথে বেশি কথা বলা সম্ভব হয়নি বলে জানান ওই পুলিশ কর্মকর্তা।
তদন্ত শুরু, পরিচয় শনাক্ত হয়নি
মুক্তাগাছা থানার ওসি কামরুল ইসলাম বলেন, ‘মৃত্যুর আগে ফরহাদ পুলিশের কাছে হামলার বিবরণ দিয়েছেন। তবে হামলাকারীদের নাম-পরিচয় তিনি বলতে পারেননি।’
আন্দোলন-প্রতিবাদে যুক্ত থাকার কারণেই হামলাটি হয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয় বলে জানান ওসি। তিনি বলেন, ‘হত্যার কারণ উদঘাটন ও হামলাকারীদের শনাক্ত করতে পুলিশ কাজ শুরু করেছে।’
এ ঘটনায় ফরহাদের পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে কারা জড়িত এবং কী কারণে ফরহাদকে এভাবে পুড়িয়ে হত্যা করা হলো—তা নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত হামলাকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্বজন ও স্থানীয়রা।



