রেকর্ড মুসল্লির অপেক্ষায় শোলাকিয়া

শোলাকিয়া ঈদগাহে বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় অনুষ্ঠিত হবে দেশের সবচেয়ে বড় ঈদ জামাত, যেখানে এবার রেকর্ডসংখ্যক মুসল্লির সমাগমের আশা করা হচ্ছে। মুসল্লিদের নিরাপত্তায় পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা বলয়, ড্রোন নজরদারি, ওয়াচ টাওয়ার, র‍্যাব-পুলিশ-বিজিবি মোতায়েনসহ ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে; আর ইমামতি করবেন পুনর্বহাল হওয়া মুফতি আবুল খায়ের মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহ।

মো: আল আমিন, কিশোরগঞ্জ
রেকর্ড মুসল্লির অপেক্ষায় শোলাকিয়া
রেকর্ড মুসল্লির অপেক্ষায় শোলাকিয়া |নয়া দিগন্ত

দেশের সবচেয়ে বড় ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয় কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায়। জেলা শহরের নরসুন্দা নদীর তীরে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী এ ঈদগাহ। বৃহস্পতিবার (২৮ মে) সকাল ৯টায় জামাত শুরু হবে সেখানে।

গতকাল সোমবার দৈনিক নয়া দিগন্তকে এসব তথ্য জানান ঈদগাহ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন।

তিনি জানান, দেশ-বিদেশ থেকে মুসল্লিরা ঈদের নামাজ আদায়ের জন্য শোলাকিয়ায় আসেন। যারা এক থেকে দু’দিন আগে আসেন, তাদের জন্য তিনটি স্থানে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে- আজিমউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়, শোলাকিয়া কুমুদিনী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বাগে জান্নাত নূরানি মাদরাসা। তাদের জন্য বিনামূল্যে খাবারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

ঐতিহ্য অনুযায়ী, জামাত শুরুর আগে পরপর তিনবার বন্দুকের ফাঁকা গুলি ছোড়া হবে। এবার শোলাকিয়ায় ১৯৯তম ঈদুল আজহার জামাত অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এতে ইমামতি করবেন মুফতি আবুল খায়ের মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহ।

ঈদ জামাতকে কেন্দ্র করে কিশোরগঞ্জে নেয়া হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ঈদের দিন ঈদগাহে প্রবেশের প্রতিটি পথে তল্লাশি চৌকি বসানো হবে। মোতায়েন থাকবে প্রচুর সংখ্যক র‍্যাব, পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও আনসার সদস্য। পাশাপাশি সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালন করবেন বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। টহলে থাকবে সেনাবাহিনীও।

নিরাপত্তা জোরদারে ঈদগাহ মাঠে স্থাপন করা হয়েছে ছয়টি ওয়াচ টাওয়ার। এছাড়া ঈদ জামাতের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চারটি ড্রোন সার্বক্ষণিক নজরদারিতে থাকবে। তিনটি আর্চওয়ের মাধ্যমে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে তল্লাশি করে মুসল্লিদের মাঠে প্রবেশ করানো হবে।

ঈদগাহে মুসল্লিরা শুধু জায়নামাজ ও জরুরি প্রয়োজনে মোবাইল ফোন নিয়ে ঢুকতে পারবেন। ছাতা, ব্যাগ ও অন্য ইলেকট্রনিক সামগ্রী বহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

নিরাপত্তার স্বার্থে ঈদগাহে ছাতা নিয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলে জানান জেলা প্রশাসক।

তিনি বলেন, ‘মুসল্লিরা জায়নামাজ ও মোবাইল ফোন ছাড়া অন্য কোনো সামগ্রী সাথে আনতে পারবেন না। মাঠের সার্বিক নিরাপত্তায় সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, র‍্যাব, আনসার এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা দায়িত্ব পালন করবেন। ফায়ার সার্ভিস ও মেডিক্যাল টিমও প্রস্তুত থাকবে।’

মুসল্লিদের সুবিধার্থে ঈদগাহ মাঠ পরিষ্কার করা এবং সারির দাগ কাটা হয়েছে। স্থায়ী অজুখানার পাশাপাশি নির্মাণ করা হয়েছে অতিরিক্ত অজুখানা। সুপেয় পানির জন্য মাঠের বিভিন্ন স্থানে টিউবওয়েল ও পানির ট্যাংক স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া প্রয়োজন মেটাতে রাখা হয়েছে পর্যাপ্ত অস্থায়ী টয়লেট।

স্পেশাল ট্রেন সম্পর্কে তিনি জানান, শোলাকিয়া এক্সপ্রেস-১ ভৈরব থেকে সকাল ৬টায় ছেড়ে কিশোরগঞ্জ পৌঁছাবে সকাল ৮টায় এবং দুপুর ১২টায় কিশোরগঞ্জ থেকে ছেড়ে বেলা ২টায় ভৈরব পৌঁছাবে। শোলাকিয়া এক্সপ্রেস-২ ময়মনসিংহ থেকে সকাল পৌনে ৬টায় ছেড়ে কিশোরগঞ্জ পৌঁছাবে সকাল সাড়ে ৮টায় এবং দুপুর ১২টায় কিশোরগঞ্জ থেকে ছেড়ে বেলা ৩টায় ময়মনসিংহ পৌঁছাবে।

সোমবার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, মুসল্লিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এক হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য ইউনিফর্ম ও সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালন করবেন। গোয়েন্দা নজরদারি ইতোমধ্যেই জোরদার করা হয়েছে। ঈদের দিন জামাতের আগে থেকেই ঈদগাহের আশেপাশে পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হবে।

মুসল্লিদের নিরাপত্তায় র‌্যাব সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করবেন জানিয়ে র‍্যাব-১৪-এর অধিনায়ক নয়মুল হাসান দৈনিক নয়া দিগন্তকে জানান, নাশকতা প্রতিরোধে র‍্যাব সদস্যরা পোশাক ও সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালন করবেন। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হবে। ওয়াচ টাওয়ার, ড্রোন ও বাইনোকুলারের মাধ্যমে নজরদারি চালানো হবে। এছাড়া শহরের বিভিন্ন স্থানে টহল জোরদার করা হবে এবং ভৈরব ও কিশোরগঞ্জ রেলস্টেশনেও র‍্যাব মোতায়েন থাকবে।

উল্লেখ্য, প্রায় ১৫ বছর পর ২০২৫ সালে শোলাকিয়া ঈদগাহের স্থায়ী ইমাম হিসেবে পুনর্বহাল করা হয়েছে মুফতি আবুল খায়ের মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহকে। এ বছর ইদগাহ কমিটির সভায় তা রেজুলেশন করা হয়।

মুফতি আবুল খায়ের মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহ ২০০৪ সাল থেকে ঈদগাহ কমিটি ও মোতাওয়াল্লির নিয়োগে স্থায়ী ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাকে সরিয়ে দিয়ে বিতর্কিত মাওলানা ও শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ফরীদ উদদীন মাসউদকে ইমাম হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ থাকায় তাকে অবৈধভাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। ওই সময় ওয়াকফ দলিলের শর্ত এবং মোতাওয়াল্লির মতামত অগ্রাহ্য করে বৈধ ইমাম ছাইফুল্লাহকে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল। এ ঘটনায় স্থানীয় মুসল্লিদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং ঈদগাহের ঐতিহ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঈদগাহে মুসল্লির সংখ্যা কমতে থাকে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ফরীদ উদদীন মাসউদ জনরোষের ভয়ে আত্মগোপন করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ ছাইফুল্লাহকে ইমাম হিসেবে পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

মুফতি ছাইফুল্লাহর পুনর্বহালের ফলে গত বছর ঈদজামাতে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় লক্ষাধিক মুসল্লির উপস্থিতি বেশি ছিল। গত ঈদুল ফিতরের জামাতেও ব্যাপক মুসল্লির উপস্থিতি ছিল। এবার ঈদুল আজহার জামাতেও রেকর্ড সংখ্যক মুসল্লির অংশ নিবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।