ভারতীয় মাদক প্রবেশের হটস্পট দোয়ারাবাজার সীমান্ত, বেপরোয়া কিশোর গ্যাং

এই সীমান্ত নেই বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর দৃশ্যমান তৎপরতা। ফলে ইয়াবা, ফেনসিডিল, ডেন্ডি, ভারতীয় গাঁজা, দেশী-বিদেশি মদসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক প্রতিদিনই দেশে ঢুকছে অবাধে।

সোহেল মিয়া, দোয়ারাবাজার (সুনামগঞ্জ)

Location :

Dowarabazar
কিশোর গ্যাং
কিশোর গ্যাং |নয়া দিগন্ত

সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলা সীমান্ত যেনো মাদকের স্বর্গরাজ্য। এই উপজেলার সীমান্ত এলাকায় মাদককারবারিদের দাপটও চোখে পড়ার মতো। এ যেন ভারতীয় মাদক প্রবেশের হটস্পটে পরিণত হওয়া ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত উপজেলা।

সোমবার (১১ মে) সরেজমিনে গেলে স্থানীয়দের সাথে আলাপকালে জানা যায়, দোয়ারাবাজার উপজেলার সীমান্তবর্তী চারটি ইউনিয়ন, বাংলাবাজার, নরসিংপুর, বোগলাবাজার ও লক্ষিপুর ইউনিয়নের সীমান্তে অধিকাংশ এলাকায় অরক্ষিত। ফলে ভারত ও বাংলাদেশের কারবারিরা সহজেই কাঁটাতার টপকে চলে যেতে পারে এপারে থেকে ওপারে।

এই সীমান্ত নেই বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর দৃশ্যমান তৎপরতা। ফলে ইয়াবা, ফেনসিডিল, ডেন্ডি, ভারতীয় গাঁজা, দেশী-বিদেশি মদসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক প্রতিদিনই দেশে ঢুকছে অবাধে।

মাদকের এসব ব্যবসার সাথে জড়িয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে শিক্ষার্থী-যুবকদের সমন্বয়ে গঠিত কিশোর গ্যাং। এতে উদ্বেগে রয়েছেন স্থানীয় জনগণ। মাঝে মধ্যে বিজিবি'র অভিযানে মাদকের চালান আটকের সংবাদ পাওয়া গেলেও মাদকের বিরুদ্ধে উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় এমন অভিযান তেমনভাবে দৃশ্যমান নয় বলে অসন্তুষ্ট প্রকাশ করে স্থানীয়দের অভিযোগের তীর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দিকে।

ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয়রা জানায়, মাদকের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযানের তথ্য গোপনে ফাঁস হয়ে যায়, ফলে মূল কারবারিরা আগেভাগেই সতর্ক হয়ে যায়। আর এর মূল কারণই হচ্ছে প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের জড়িত থাকা।

জানা গেছে, উপজেলার শ্যামারগাঁও, শ্রীপুর, দ্বীনেরটুক, চাইরগাঁও, কলাউড়া-শিমুলতলা, ডালিয়া, বাঁশতলা, পেকপাড়া, মাঠগাঁও, রসরাই, কাঁঠালবাড়ি, বাগানবাড়ি, এলাকা দিয়ে মাদক আসছে অবাধে। এসব মাদক পরে ছড়িয়ে পড়ছে সিলেট, ঢাকা ও দেশের অন্যান্য জেলায়।

সরেজমিনে গেলে বাংলাদেশী সীমান্তের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক মাদককারবারিদের সাথে কথা হয়। প্রথমে রাজী না হলেও, অনেক চেষ্টার পর গলে বরফ। যাদের একেকজনের ওপর ঝুলছে সাত থেকে আটটি করে মামলা।

মাদককারবারিরা জানান, ভারতের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বিএসএফের সহযোগিতায় ওপারের মাদককারবারিরা খুব সহজেই মাদক পৌঁছে দেন, এপারের কারবারিদের হাতে। অধিকাংশ এলাকায় নেই তারকাঁটা বেড়া। দীর্ঘদিন ধরে অরক্ষিত থাকায় চাঙা হয়ে উঠেছে সীমান্ত ব্যবসা। মূলত বিএসএফ জড়িত থাকায় অরক্ষিত কাঁটাতারের বেড়া সংস্কার হয়না ভারতে।

বাংলাদেশে প্রবেশের পর মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছে সিএনজি, মোটরসাইকেল, ইজিবাইক এমনকি প্রাইভেটকারও। এসব যানবাহনের অধিকাংশেরই নেই বৈধ কাগজপত্র। প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তি এই ব্যবসার সাথে পরোক্ষভাবে জড়িত বলেও অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে মাদককারবারিদের সখ্যতা রয়েছে। রয়েছে কারবারিদের সঙ্ঘবদ্ধ কিশোরগ্যাং। যার কারনে, মাদকবিরোধী অবস্থান নিলে তারা হুমকি ও হয়রানির শিকার হন। কেউ কেউকে সাজানো মামলাতেও জড়ানো হয়েছে। ফলে অনেকেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে চুপ করে থাকেন।

এদিক সম্প্রতি মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর হুঁশিয়ারীর পর আঁটঘাট বেঁধে নেমেছে থানা পুলিশ। গতকাল দোয়ারাবাজার থানা পুলিশের ওসি তরিকুল ইসলাম তালুকদারের নেতৃত্বে থানা পুলিশের একটি বড় টিম সীমান্তবর্তী এলাকায় বিশেষ মহরা দিতে দেখা গেছে।

মাদক কারবারিরদের বিরুদ্ধে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়ে ওসি তরিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন, ‘মাদক ও চোরাচালান দমনে পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। মাদককারবারিদের আটকপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।’

সিলেট ব্যাটালিয়ন ৪৮ বিজিবি অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হক বলেন, ‘প্রতিটি সীমান্তে কঠোর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বিজিবি নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। আমাদের কোনো দুর্বলতা নেই। তবে মাদক নির্মূলে জনগণের অংশগ্রহণ অপরিহার্য।’