সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে কাজের মান অক্ষুণ্ণ রেখে বরাদ্দের উদ্বৃত্ত ৫১ লাখ ৬৯ হাজার ৯৬৭ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিয়ে বিরল সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার নজির স্থাপন করেছে রাঙ্গামাটি সদর উপজেলা প্রশাসন। একইসাথে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ খাল খনন প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে বছরের পর বছর ধরে বন্যা, জলাবদ্ধতা, পানিশূন্যতা ও নৌ-যোগাযোগ সংকটে ভোগা সদর উপজেলার চারটি ইউনিয়নের হাজারো মানুষের জীবনযাত্রায় এসেছে দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন।
সবচেয়ে প্রশংসনীয় বিষয় হলো, কোনো ধরনের নিম্নমানের কাজ বা অনিয়ম ছাড়াই উদ্বৃত্ত থাকা ৫১ লাখ ৬৯ হাজার ৯৬৭ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেয়া হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পে সরকারি অর্থ সাশ্রয় করে তা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফিরিয়ে দেয়ার এমন ঘটনা সচরাচর দেখা যায় না। ফলে প্রশাসনের এই উদ্যোগ জেলা জুড়ে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, এই প্রকল্প শুধু একটি উন্নয়ন উদ্যোগ নয়, বরং পাহাড়ি জনপদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে মুক্তির বাস্তব সমাধান। পাহাড় ও কাপ্তাই হ্রদবেষ্টিত রাঙ্গামাটির বিস্তৃর্ণ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে পলি জমে অসংখ্য খাল ভরাট হয়ে পড়েছিল। ফলে বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হতো আকস্মিক বন্যা ও জলাবদ্ধতা। কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে যেত, ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হতো, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ত। আবার শুষ্ক মৌসুমে একই এলাকাগুলো পানির অভাবে চরম সংকটে পড়ত। হ্রদের পানি সরে গিয়ে নৌ-চলাচল ব্যাহত হতো, কৃষিকাজে দেখা দিত তীব্র সেচ সংকট এবং স্থানীয় অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ত। এই দীর্ঘদিনের বাস্তব সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতেই প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উদ্যোগে হাতে নেয়া হয় বৃহৎ পরিসরের খাল খনন প্রকল্প।
রাঙ্গামাটি সদর উপজেলা প্রশাসন ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ২২ এপ্রিল প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক কাজ শুরু হয়। বর্ষা শুরুর আগেই কাজ শেষ করার কঠিন লক্ষ্য সামনে রেখে মাঠে নামে প্রশাসন। মাত্র ৪৩টি শ্রমদিবসে সদর উপজেলার চারটি ইউনিয়নের মোট ৩৩ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন সম্পন্ন করা হয়। এ কাজে ১ হাজার ৯৬৩ জন শ্রমিক নিরলস পরিশ্রম করেন এবং ৬৬ দিনেরও বেশি সময় এক্সক্যাভেটর ব্যবহার করে ব্যাপক খননকাজ পরিচালিত হয়।
প্রকল্পটির জন্য মোট ৮ কোটি ৪৯ লাখ ৬৯ হাজার ৯৬৭ টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও অত্যন্ত পরিকল্পিত ব্যয় ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ৭ কোটি ৯৮ লাখ টাকায় পুরো কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।
বর্তমানে প্রকল্পের সুফল ইতোমধ্যেই চোখে পড়তে শুরু করেছে। চলতি বর্ষায় যেখানে আগে অল্প বৃষ্টিতেই পানি উপচে পড়ে কৃষিজমি প্লাবিত হতো, সেখানে এখন দ্রুত পানি নিষ্কাশন হওয়ায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে না।
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, কয়েক ঘণ্টার টানা বৃষ্টির পরও খাল দিয়ে দ্রুত পানি নেমে যাওয়ায় এবার তাদের জমি নিরাপদ রয়েছে। ফলে ফসল নষ্ট হওয়ার শঙ্কা কমেছে এবং কৃষকেরা এখন প্রয়োজন অনুযায়ী সময় নিয়ে উৎপাদিত ফসল বিক্রি করতে পারছেন।
স্থানীয় গ্রামবাসীরা জানান, বহু বছর ধরে খালগুলো এতটাই ভরাট হয়ে গিয়েছিল যে সেগুলো আর খাল হিসেবে পরিচিত ছিল না; ছোট ছড়ায় পরিণত হয়েছিল। সামান্য বৃষ্টিতেই উপচে পড়া পানিতে কৃষিজমি ডুবে যেত। এখন খালগুলো পুনঃখননের ফলে পানি দ্রুত মূল খালে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে কৃষিজমি রক্ষা পাচ্ছে, ফসলের ক্ষয়ক্ষতি কমছে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে।
তারা এই উদ্যোগের জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
সাপছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রবীন চাকমা বলেন, কাপ্তাই হ্রদে পলি জমে যাওয়ায় কৃষক, জেলে ও সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। বর্ষায় ঘরবাড়ি ও ফসল ডুবে যেত, আর শুষ্ক মৌসুমে হ্রদ প্রায় শুকিয়ে যাওয়ায় নৌকা চলাচল ও কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতো। তার মতে, প্রধানমন্ত্রীর এই বিশেষ খাল খনন প্রকল্প পাহাড়ি জনপদের মানুষের জন্য যুগান্তকারী আশীর্বাদ হয়ে এসেছে।
বালুখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অমর চাকমা বলেন, ইউনিয়নের একাধিক খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় মানুষ দীর্ঘদিন নানা দুর্ভোগে ছিলেন। পুনঃখননের ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরে এসেছে। চলতি বর্ষায় এখন পর্যন্ত বড় ধরনের বন্যা হয়নি। মানুষ নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারছেন, জেলেরা স্বাভাবিকভাবে মাছ ধরছেন এবং কৃষকেরা আমন চাষের প্রস্তুতি নিতে পারছেন।
তিনি এ উদ্যোগের জন্য প্রধানমন্ত্রী ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো: রিয়াদ হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘প্রকল্প গ্রহণের পর তাদের সামনে সবচেয়ে বড় দুটি চ্যালেঞ্জ ছিল। বর্ষা শুরুর আগেই কাজ শেষ করা এবং শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। এজন্য শুরু থেকেই প্রতিটি ধাপে কঠোর মনিটরিং ও আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা হয়। শ্রমিক, যন্ত্রচালক, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করা সম্ভব হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘সরকারি অর্থ জনগণের আমানত। তাই প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় না করে অপচয় রোধের মাধ্যমে প্রকল্পটি সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে এবং উদ্বৃত্ত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেয়া হয়েছে। কোনো ধরনের অনিয়ম ছাড়াই বৃহৎ পরিসরের একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং সরকারি অর্থ সাশ্রয় করতে পারা পুরো প্রকল্পসংশ্লিষ্ট দলের জন্য গর্বের বিষয়।’
রাঙ্গামাটির পরিবেশবিদ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, এই প্রকল্পের সুফল কেবল তাৎক্ষণিক বন্যা নিয়ন্ত্রণ বা পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। খাল পুনঃখননের ফলে কাপ্তাই হ্রদের জীববৈচিত্র সংরক্ষণে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে, মাছের প্রজনন বৃদ্ধি পাবে, জলজ পরিবেশের ভারসাম্য ফিরে আসবে এবং স্থানীয় অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। কৃষি, মৎস্য ও নৌ-যোগাযোগ সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি সুফল মিলবে।
সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার, সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন, কাজের মান বজায় রাখা এবং উদ্বৃত্ত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেয়ার এই উদ্যোগ ইতোমধ্যেই একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে রাঙ্গামাটির এই অভিজ্ঞতা দেশের অন্যান্য সরকারি প্রকল্পের জন্যও অনুসরণযোগ্য একটি কার্যকর মডেল হয়ে উঠতে পারে।



