ফেনীবাসীর দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবী মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প একনেকে অনুমোদন পাওয়ায় এলাকার জনমনে স্বস্তি বিরাজ করছে। মুহুরী-কহুয়া সিলোনীয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধটি অত্যধিক ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ভারি বর্ষণ বা ভারতীয় পাহাড়ি ঢলের পানিতে প্রতি বছর ফেনীসহ আশপাশের জনপদ বন্যা কবলিত হয়ে ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় বহু প্রতিক্ষিত প্রকল্প ‘মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়)’ গত মঙ্গলবার অনুমোদন পায়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকা। প্রকল্পটি চলতি বছরের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুনে কাজ শেষ হবে।
পরিকল্পনা কমিশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মুহুরী-কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীঘেরা ফেনী জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে নদী ভাঙন, বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে লাখো মানুষ দুর্ভোগের শিকার। বিশেষ করে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের ভয়াবহ বন্যার পর প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা আরো গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় আসে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের বন্যায় ফেনীর বিভিন্ন নদীতে অতিরিক্ত পলি জমে স্বাভাবিক পানির প্রবাহ কমিয়ে দেয়। এছাড়া বিভিন্ন নদীর বাঁধ ও তীর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে প্রতি বছর অতি ভারি বর্ষণ ও উজানে ত্রিপুরা রাজ্য থেকে নেমে আসা পানিতে বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। এসব ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ ও তীর শক্তিশালী করা এবং মুহুরী ও কহুয়া নদীতে পানির ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে প্রকল্প এলাকায় সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, নদী ভাঙন রোধ, জনসম্পদ রক্ষায় ১ হাজার ৫৪২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। প্রকল্প এলাকা জেলার ফুলগাজী, পরশুরাম, ছাগলনাইয়া, সোনাগাজী ও সদর উপজেলা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ফেনী সদর, ফুলগাজী, পরশুরাম, ছাগলনাইয়া ও সোনাগাজী উপজেলাসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যার ক্ষতি থেকে সুরক্ষা পাবে। একইসাথে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং নদী ভাঙন রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ফেনীবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে জেলার পানি ব্যবস্থাপনা ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।
ফেনীস্থ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ বলেন, ‘২০২৪ সালের বন্যায় ফেনীর নদীগুলোর বাঁধ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রায় বাঁধের অবস্থা দুর্বল। বাঁধ ও তীরগুলো শক্তিশালী করতে এই প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় বাঁধ সংস্কার, নদী পুন:খনন, এলিভেটেড ড্যাম নির্মাণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন হবে। এটি প্রকল্পের প্রথম ফেস-১-এর প্রথম ধাপ। এটি বাস্তবায়ন হলে ফেনীর মুহুরী-কহুয়া নদী সেচ ব্যবস্থা এ অঞ্চলের কৃষিতে বড় ভূমিকা রাখবে এবং বন্যায় জনসম্পদ রক্ষা পাবে। একইসাথে নদীকেন্দ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং স্থানীয় কৃষি ও মৎস্য সম্পদের উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও পরশুরাম পৌরসভার সাবেক মেয়র আবু তালেব নয়া দিগন্তকে বলেন, চার দলীয় জোট সরকার ক্ষমতাকালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া তার নিজ এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দূর্ভোগ লাঘবে ২০০৬ সালে মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করেন। পরে সরকার এই প্রকল্পের আর বরাদ্দ না দেয়ায় কাজটি অসমাপ্ত থেকে যায়।
দীর্ঘ ২০ বছর পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়ায় স্থানীয় জনগণের মাঝে স্বস্তি বিরাজ করছে। এই দাবি আদায়ে স্থানীয় এমপি মুন্সি রফিকুল আলম মজনু ছাড়াও ফেনী-৩ আসনের এমপি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু বিষয়ক মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, ফেনী-২ আসনের এমপি অধ্যাপক জয়নাল আবদিন ভিপি ও সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি রেহানা আক্তার রানুসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান তিনি।
ফেনী-১ (ফুলগাজী, পরশুরাম, ছাগলনাইয়া) আসনের এমপি মুন্সি রফিকুল আল মজনু নয়া দিগন্তকে বলেন, মুহুরী-কহুয়া, সিলোনিয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ ছিল এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এলাকাবাসীকে দেয়া প্রতিশ্রুতি স্বল্প সময়ের মধ্যে পূরণ হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে বিশেষ কৃতজ্ঞতা।
তিনি বলেন, এই বাঁধটি নির্মিত হলে শুধু ফেনী নয় বৃহত্তর নোয়াখালী ও আশপাশের এলাকার মানুষ বহুমুখী সুফল পাবে। শুধু বন্যা নিয়ন্ত্রণই নয়, এই বাঁধকে ঘিরে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ঘেরা এই এলাকাটি পর্যটনের সম্ভাবনার দ্বারও খুলে যাবে। আশা করছি খুব শিগগিরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই প্রকল্পের কাজ আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন।
সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি রেহানা আক্তার রানু জানান, বেগম খালেদা জিয়ার স্মৃতি বিজড়িত প্রকল্পটি তার যোগ্য উত্তরসূরী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত ধরে পূর্ণতা পাবে। যা এই জনপদের মানুষের দূর্ভোগ লাঘব ও উন্নয়নে মাইলফলক হয়ে থাকবে। ফ্যাসিস্ট আমলে এই প্রকল্পটি পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন না করে প্রতি বছর মেরামতের নামে কোটি কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। এতে করে বছরের পর বছর এই অঞ্চলের মানুষ দূর্ভোগের শিকার হয়েছেন।
স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী মো: মহিউদ্দিন বলেন, প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পাওয়ায় স্থানীয় জনগণের মাঝে আনন্দ-উচ্ছাস বিরাজ করছে। অতীতে বাঁধ মেরামতের নামে যেভাবে লুটপাট হয়েছে ভবিষ্যতে তা ঠেকাতে প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর তদারকিতে বৃহৎ এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন বলে স্থানীয়রা মনে করেন।



