সিলেটে ভয়াবহ আকার নিচ্ছে হাম পরিস্থিতি, মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ২৩

গত ৬ এপ্রিল সিলেটে প্রথম হাম আক্রান্ত শিশুর মৃত্যু হয়। ওইদিন ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দুই বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু ঘটে। সর্বশেষ শুক্রবার (৮ মে) আরো তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

আবদুল কাদের তাপাদার, সিলেট ব্যুরো

Location :

Sylhet

সিলেটজুড়ে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে হামের প্রকোপ। দিন দিন পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এ পর্যন্ত সিলেটে হাম ও হামের উপসর্গে ২৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। রোগীর চাপ সামাল দিতে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চালু করা হচ্ছে হামের জন্য ডেডিকেটেড শিশু ওয়ার্ড।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শনিবার (৯ মে) থেকে ওসমানী হাসপাতালের ৩২ নম্বর ওয়ার্ড হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য বিশেষায়িত ওয়ার্ড হিসেবে চালু হবে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এ উদ্যোগে আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত হবে এবং মৃত্যুহার কমে আসবে।

তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ এপ্রিল সিলেটে প্রথম হাম আক্রান্ত শিশুর মৃত্যু হয়। ওইদিন ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দুই বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু ঘটে। সর্বশেষ শুক্রবার (৮ মে) আরো তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তারা হলো—সিলেট নগরের আখালিয়া সুরমা আবাসিক এলাকার আব্দুল মুমিন ও সুমি বেগম দম্পতির আট মাস বয়সী সন্তান মাহদি হাসান, দক্ষিণ সুনামগঞ্জের আসামপুর গ্রামের সুনু মিয়ার ছয় মাস বয়সী সন্তান মুস্তাকিন এবং সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সাত মাস বয়সী শিশু জারা।

এ নিয়ে সিলেটে হাম ও হামের উপসর্গে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩। বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ২৩৩ জন সন্দেহজনক হাম রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৯২ জন ভর্তি আছেন শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরো ৬৬ জন সন্দেহজনক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল উমর মুনীর রাশেদ জানান, রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় অতিরিক্ত শিশু ইউনিট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে শহীদ ডা. শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালকে হাম চিকিৎসার জন্য ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখানে ১০০ শয্যার ব্যবস্থা রয়েছে।

চিকিৎসকের আবেগঘন স্ট্যাটাস ভাইরাল
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা: হেদায়েত হোসেন সারোয়ার হাম রোগ নিয়ে একটি আবেগঘন স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তার লেখাটি হুবহু তুলে ধরে হলো, " হাম আক্রান্ত হয়ে সিলেটে এখন পর্যন্ত ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। যার বেশির ভাগ আমার কর্মস্থল হাম পিআইসিইউ, সিলেট ওসমানী মেডিক্যালে। হামের সাথে নিউমোনিয়া ও নানা জটিলতায় এই বাচ্চাগুলোর শ্বাস নিতে না পেরে যখন ছটফট করতে থাকে, সে দৃশ্য দেখে সহ্য করা কঠিন, এদের বাঁচাতে অক্লান্ত পরিশ্রম করা ডাক্তার, নার্সদের ও অনেক কষ্ট হয়, চোখে জল আসে, তা দেখা যায় না। এই রোগীগুলো কেউই হামের টিকা দেয়নি। বিগত ২ বছর হাম এ টিকা না দেয়ার ফল ভোগ করছে বাংলাদেশ। হামের রোগী ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।একমাত্র টিকা দেয়া ছাড়া এটার বিস্তার রোধে আপাতত আর কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান সরকার এই মহামারী মোকাবেলা করার জন্য টিকার ব্যবস্থা করেছে। অথচ অনেকের মধ্যে এখনো এটা নিয়ে অনীহা দেখা যাচ্ছে!

মনে রাখবেন, সরকারের এই প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আপনার অবহেলায় টিকা না দিয়ে যদি হামে শিশু মারা যায়, এর দায় আপনার। এখনো সময় আছে ১০ তারিখ পর্যন্ত সবখানে, ২০ তারিখ পর্যন্ত সিলেট সিটি করপোরেশনে টিকা দেয়া হবে। দেরি না করে কাজটি সেরে ফেলুন। বেশি বুঝে বা না বুঝে নিজ বাচ্চার খুনি হবেন না । ৬ মাস থেকে ৫ বছর পর্যন্ত সকল শিশুকে টিকা দিন, শুধু নিজের পরিবারের নয়, আত্মীয়, প্রতিবেশী কেউ না দিয়ে থাকলে তাদেরকে বোঝান। বিগত ২৮ দিনের মাঝে হামের টিকা না দেয়া হয়ে থাকলে তাদের সবাইকে টিকা দিতে হবে। আগে ২ টা বা ১ টা টিকা দেয়া থাকলেও টিকা দিতে হবে। সকলে মিলে আসুন আমাদের ফুলগুলোকে অকালে ঝরে যাওয়া থেকে বাঁচাই।"

সিলেটে টিকাদান সম্পন্ন ৯৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ
হাম-রুবেলা জরুরি টিকাদান কর্মসূচি উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (৭ মে) সিলেট বিভাগীয় পরিচালকের (স্বাস্থ্য) কার্যালয়ে এক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় সভাপতিত্ব করেন সিলেট বিভাগের ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. মোহাম্মদ নূরে আলম শামীম। তিনি জানান, সিলেট বিভাগে হাম-রুবেলা জরুরি টিকাদান কর্মসূচির আওতায় লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৩ লাখ ২৩ হাজার ৯৬৬ জন। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ১২ লাখ ৪৭ হাজার ৮৩৫ জনকে টিকা দেওয়া হয়েছে, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার ৯৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ।

তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টায় আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে।