রাজশাহী ব্যুরো ও বাঘা সংবাদদাতা
একদিন যে জায়গায় ছিল স্কুল, পরদিন সেখানে শুধু পদ্মার পানি। শিক্ষার্থীদের কোলাহল, শ্রেণিকক্ষ আর শিক্ষকদের ব্যস্ততার সেই চেনা পরিবেশ এখন নদীর বুকে। রাজশাহীর বাঘা উপজেলার চকরাজাপুর ইউনিয়নে পদ্মার ভাঙনে পলাশি ফতেপুর, আতারপাড়া ও চৌমাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের আশঙ্কায় বিদ্যালয়গুলোর কিছু মালামাল সরিয়ে নেয়া সম্ভব হলেও বন্ধ রয়েছে পাঠদান।
শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, পদ্মার পানি বৃদ্ধি ও ভাঙনে ইউনিয়নের ১৫টি চরজুড়ে নেমে এসেছে দুর্ভোগ। স্থানীয়দের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব চরে প্রায় ১ হাজার পরিবারের ৪ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। ভাঙনে শতাধিক বাড়িঘর ও মসজিদ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বসতভিটা হারিয়ে অনেক পরিবার অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। গবাদিপশু, প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও শিশুদের নিয়ে অনিশ্চিত অবস্থায় দিন কাটছে চরাঞ্চলের মানুষের।
গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে পদ্মায় পানি বাড়তে শুরু করার পর ভাঙনও তীব্র হয়ে ওঠে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। চকরাজাপুর, কালিদাসখালী, লক্ষ্মীনগর, দাদপুর, নিচ পলাশি, পলাশি ফতেপুর, আতারপাড়া, চৌমাদিয়া ও দিয়ারকাদিরপুরসহ ১৫টি চরে এর প্রভাব পড়েছে। নদীর পানি বাড়ার সাথে ভাঙন এগিয়ে আসায় অনেক পরিবারকে দ্রুত বসতভিটা ছাড়তে হয়েছে।
চকরাজাপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন চর ঘুরে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ভাঙনের মুখে পড়া বাড়িঘরের বাসিন্দাদের কেউ আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে, কেউ উঁচু স্থানে আবার কেউ অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। একইসাথে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বহু পরিবার। পানির মধ্যে বসবাসের কারণে রান্না, খাবার পানি, চলাচল ও গবাদিপশু রাখার ক্ষেত্রেও নানা সমস্যা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, আতারপাড়া, চৌমাদিয়া ও পলাশি ফতেপুর এলাকায় ভাঙনে প্রায় ১০০টি বাড়ি এবং কয়েকটি মসজিদ নদীগর্ভে চলে গেছে। একই ভাঙনে তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনও রক্ষা করা যায়নি।
আতারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম বলেন, পদ্মা ভাঙতে ভাঙতে বিদ্যালয়ের একেবারে কাছে চলে আসে। পরিস্থিতি বুঝে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে বিদ্যালয়ের মালামাল সরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু মালামাল সরানোর মধ্যেই ১০ সেপ্টেম্বর দুপুরে বিদ্যালয়টি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।
তিনি বলেন, বিদ্যালয়টিতে ৮৫ জন শিক্ষার্থী ও তিনজন শিক্ষক রয়েছেন। বিদ্যালয়টি নদীতে চলে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান কিভাবে চালু রাখা হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
চৌমাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সোহেল রানা বলেন, বিদ্যালয়ে যাওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি নেই। এ কারণে পাঠদান বন্ধ রাখা হয়েছে। এ বিদ্যালয়ে ৯১ জন শিক্ষার্থী ও তিনজন শিক্ষক রয়েছেন।
চৌমাদিয়া চরের বাসিন্দা সোলেমান মোল্লা বলেন, পদ্মায় পানি বাড়ার সাথে সাথে ভাঙনও বাড়ছে। পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগের পাশাপাশি গবাদিপশু নিয়েও বিপাকে পড়েছেন তারা। অনেকেই ঘরবাড়ি হারিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন।
চকরাজাপুর ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য আবদুর রহমান বলেন, ভাঙনে চরাঞ্চলের মানুষের বসতভিটা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক পরিবারকে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে হয়েছে। পানি ও ভাঙনের কারণে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তকী ফয়সাল তালুকদার বলেন, নদীভাঙন ও বিদ্যালয়গুলোর পরিস্থিতি পরিদর্শন করা হয়েছে। আতারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মালামাল সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। বিদ্যালয়টি শেষ পর্যন্ত নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। পানিবন্দি মানুষের সহযোগিতায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
পদ্মার ভাঙনে শুধু ঘরবাড়ি নয়, চরাঞ্চলের মানুষের শিক্ষা, যোগাযোগ ও সামাজিক অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনটি বিদ্যালয় নদীগর্ভে চলে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে বসতভিটা হারানো পরিবারগুলোর সামনে নতুন করে বাসস্থান ও জীবিকা নিশ্চিত করার প্রশ্নও দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, ভাঙন অব্যাহত থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়তে পারে। তাই নদীভাঙন রোধে কার্যকর উদ্যোগের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর আশ্রয়, খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং বিলীন হয়ে যাওয়া বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের পাঠদান দ্রুত স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন তারা।



