বিদায় নিচ্ছে ২০২৫ সাল। তবে বিদায় নিলেও ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় এই বছরটি হয়ে থাকবে অনন্য। দারুণ সব কীর্তি যেমন দেখা মেলেছে বছর জুড়ে, তেমনি দেখা মিলেছে ‘নতুন’ বিশ্বচ্যাম্পিয়নের।
ব্যাটে-বলে রেকর্ডের ফুলঝুরি ছুটলেও ক্রিকেট বিশ্বের বড় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল কূটনীতি আর ‘অদৃশ্য ট্রফি’। ভারত-পাকিস্তান রাজনৈতিক বৈরিতা এই বছর পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা। চলুন ছোট করে জেনে নেয়া যাক ব্যতিক্রমী সে সব ঘটনা।
১. প্রোটিয়াদের প্রথম বিশ্বজয় :
ক্রিকেটে মন খারাপের গল্প কম লেখেনি প্রোটিয়ারা। খুব কাছে গিয়েও বারবার হতে হয়েছে হতাশ, হাত ফসকেছে শিরোপা। তবে এবার আর অপূর্ণতা থাকেনি। রঙিন পোশাকের আক্ষেপ সাদা পোশাকে হয়েছে দূর।
জ্যাক ক্যালিস, গ্রায়েম স্মিথ, ডি ভিলিয়ার্স, হাশিম আমলারা যা পারেননি, তাই করে দেখালেন টেম্বা বাভুমা। ১৯৯৮ আইসিসি নক-আউট ট্রফির সাথে প্রোটিয়াদের শোকেজে উঠে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ শিরোপা।
জুনে লর্ডসের ঐতিহাসিক মাঠে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে এই বৈশ্বিক শিরোপা জেতে প্রোটিয়ারা। অধিনায়ক টেম্বা বাভুমার হাতে টেস্ট ক্রিকেটের রাজদণ্ড ‘গদা’ ওঠার মুহূর্তটি ছিল বছরের অন্যতম সেরা দৃশ্য।
২. ভারতের ‘ট্রিপল ক্রাউন’ :
২০২৫ সালে ভারতের ক্রিকেটেও বয়েছে সুবাতাস। বছর জুড়ে মাঠে দাপট ছিল তাদের। ম্যান ইন ব্লুরা জিতেছে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি ও এশিয়া কাপ। পাশাপাশি নভেম্বরে ঘরের মাঠে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো নারী ওয়নডে বিশ্বকাপ জিতে ইতিহাস গড়ে ভারত।
৩. ভারত-পাকিস্তান বৈরিতায় ‘অদৃশ্য ট্রফি’:
২০২৫ সালে ক্রিকেট অভিধানে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নেয় ‘হাইব্রিড মডেল’। ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বে যে শব্দের উত্থান। রাজনৈতিক বিরোধ অবশ্য দুই দেশের মাঝে আগেই ছিল, কিন্তু এপ্রিলে কাশ্মিরের পেহেলগাম ট্রাজেডির পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
যার বড় প্রভাব পড়ে এশিয়া কাপ ক্রিকেটে। সব শঙ্কা দূর করে দুই দলের খেলা মাঠে গড়ালেও ভারতীয়রা কোনো ম্যাচেই পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের সাথে হাত মেলাননি। এমনকি এশিয়া কাপের ফাইনালে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর এসিসি চেয়ারম্যান থেকে ট্রফিও গ্রহণ করেনি।
মূলর এসিসি সভাপতি মহসিন নাকভি পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডেরও চেয়ারম্যান। ফলে তার হাত থেকে ট্রফি নিতে অস্বীকার করে ভারত অধিনায়ক শুবমান গিল। এদিকে নাকভিও নিজ হাতেই ট্রফি তুলে দেয়ার ব্যাপারে থাকেন অনড়। ফলে ট্রফি ছাড়াই শিরোপা উদযাপন করে ভারত দল।
ট্রফি ছাড়াই ‘অদৃশ্য ট্রফি’ হাতে উল্লাসের সেই দৃশ্য ক্রিকেটের দীর্ঘ ইতিহাসের যেন এক বিচিত্র অধ্যায়। এমনকি সেই ট্রফি বিতর্ক এখনো সমাধান হয়নি। বছর পেরিয়ে গেলেও নাকভির থেকে ট্রফি বুঝে পায়নি ভারত।
৪. অ্যাশেজ ও ইংল্যান্ডের ব্যর্থতা :
ইংলিশ ক্রিকেটের জন্য বিদায়ী বছরটি ছিল হতাশার। অস্ট্রেলিয়ার কাছে মাত্র ১১ দিনের ব্যবধানে প্রথম তিন টেস্ট হেরে অ্যাশেজ খোয়ায় বেন স্টোকসের দল। যদিও বছরের শেষ মেলবোর্ন টেস্টে দুই দিনেই জয় পেয়ে কিছুটা সান্ত্বনা খুঁজেছে তারা।
৫. দুই শ’ ছক্কায় ‘নতুন’ বাংলাদেশ :
বাংলাদেশের জন্য বছরটি ছিল অম্ল-মধুর। টি-টোয়েন্টিতে টানা ৪ সিরিজ জয় বাংলাদেশকে যেমন এনে দিয়েছে আনন্দের উপলক্ষ, তেমনি আরব আমিরাতের কাছে সিরিজ হার ছিল চরম লজ্জার।
তবে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের ব্যাটিংয়ে বড় বদল দেখা গেছে। এ বছর টাইগাররা সম্মিলিতভাবে রেকর্ড ২০৬টি ছক্কা মেরেছেন, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের হয়ে ৪৪টি ছক্কা মেরেছেন তানজিদ তামিম। যা এক পঞ্জিকাবর্ষে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ।
৬. ছক্কায় বিশ্বরেকর্ড :
২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি ছক্কা দেখেছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট। ৭৭৬৬টি ছক্কা হয়েছে ৭৩৬ ম্যাচে। যেখানে ৫৭৯টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচেই হয়েছে ৬১০৬টি ছক্কা। সবচেয়ে বেশি ছক্কা মেরেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ৪৮ ম্যাচে ৩৭১টি ছক্কা মেরেছে দলটি।
৭. ছক্কার সেঞ্চুরি :
অস্ট্রিয়ার অখ্যাত করণবীর সিং ছক্কা হাঁকিয়ে বিখ্যাত হয়ে গেছেন চলতি বছর। ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই করণবীর সিং মাত্র ৩২ টি টি-টোয়েন্টিতে অবিশ্বাস্য ১২২টি ছক্কা মেরেছেন! যা এক পঞ্জিকাবর্ষে বিশ্বরেকর্ড।
২০২৫ সালে ইনিংসে সবচেয়ে বেশি ছক্কা স্পেনের মোহাম্মদ ইহসানের। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ১৭টি ছক্কা মারেন ইহসান। চলতি বছর দলীয় ভাবে এক দলের ইনিংসে সর্বোচ্চ ছক্কার বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে স্পেন।
ডিসেম্বরে ক্রোয়েশিয়ার সাথে একটি ম্যাচে ২৯টি ছক্কা মারে স্প্যানিশরা। তবে এক ম্যাচে সবচেয়ে বেশি ৪১ ছক্কা দেখেছে বুলগেরিয়া-জিব্রাল্টার ম্যাচ। ইতিহাসে এর চেয়ে বেশি ছক্কা হয়েছে আর মাত্র একটি ম্যাচে।
বোলিং ম্যাজিক :
ভুটানের স্পিনার সোনাম ইয়েশি মিয়ানমারের বিপক্ষে মাত্র ৭ রানে ৮ উইকেট নিয়ে টি-টোয়েন্টি ইতিহাসের সেরা বোলিং ফিগারের রেকর্ড গড়েন।
ব্যাটিং তাণ্ডব :
এই বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ওভারপ্রতি রান ছিল ৫.৯৮, যা গত ১৪৮ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এবার ম্যাচপ্রতি ১০.৬ ছক্কা হয়েছে। রেকর্ড এটিও। ইতিহাসে এই প্রথম ম্যাচপ্রতি ছক্কার সংখ্যা ১০ ছাড়াল।
স্টার্কের তোপ :
ওয়েস্ট ইন্ডিজকে মাত্র ২৭ রানে গুটিয়ে দিতে মিচেল স্টার্কের ৬ উইকেটের স্পেলটি ছিল বছরের অন্যতম বিধ্বংসী বোলিং।



