ঐতিহাসিক সফর শেষে পৃথিবীর পথে আর্টেমিস-২ এর নভোচারীরা

আর্টেমিস-২ মিশনের নভোচারীরা বর্তমানে পৃথিবীর পথে দ্রুতগতিতে ছুটে আসছেন। ঐতিহাসিক চন্দ্র সফরের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার পাশাপাশি তারা বিভিন্ন ছবি ও স্মৃতি বিনিময় করছেন।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
নভোচারীদের তোলা ছবি
নভোচারীদের তোলা ছবি |সংগৃহীত

আর্টেমিস-২ মিশনের নভোচারীরা বর্তমানে পৃথিবীর পথে দ্রুতগতিতে ছুটে আসছেন। ঐতিহাসিক চন্দ্র সফরের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার পাশাপাশি তারা বিভিন্ন ছবি ও স্মৃতি বিনিময় করছেন। তাদের বর্ণনায় উচ্ছ্বসিত মহাকাশ গবেষণার সাথে যুক্ত বিজ্ঞানী ও সহকর্মীরা।

হিউস্টন থেকে বার্তাসংস্থা এএফপি জানায়, বিশেষ নজর কেড়েছে নভোচারীদের তোলা একটি ‘আর্থসেট’ বা পৃথিবী-অস্তের ছবি। এবড়োখেবড়ো চন্দ্র দিগন্তের নিচে পৃথিবী যখন তলিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তটি তারা ক্যামেরাবন্দি করেন। ১৯৬৮ সালের অ্যাপোলো-৮ মিশনে তোলা আইকনিক ‘আর্থরাইজ’ বা পৃথিবী-উদয়ের ছবির আদলেই সচেতনভাবে এ ছবিটি তোলা হয়েছে।

নাসা ও হোয়াইট হাউসের প্রকাশ করা নতুন ছবিতে দেখা যায়, একদিকে নীল পানির পৃথিবী, অন্যদিকে চাঁদের রুক্ষ বাঁক, মাঝখানে অন্ধকার মহাকাশের বিস্তার।

মঙ্গলবার দুপুরে নভোচারীরা হিউস্টন মিশন কন্ট্রোলের বিজ্ঞানীদের সাথে কথা বলেন। সেখানে তারা চাঁদের চারপাশে প্রায় সাত ঘণ্টার পর্যবেক্ষণকালীন অভিজ্ঞতার বিস্তারিত বিবরণ দেন।

আর্টেমিস-২ মিশনের প্রধান কেলসি ইয়াং নভোচারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমাদের পুরো চন্দ্র বিজ্ঞানী দল এবং বৃহত্তর বৈজ্ঞানিক সমাজ আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে। গতকাল আপনারা যা করেছেন, তা বিজ্ঞানের ইতিহাসে সত্যিই অনেক বড় অর্জন।’

পরে এক ব্রিফিংয়ে ইয়াং জানান, বর্তমানে সবার মনোবল খুব চাঙ্গা এবং তারা লক্ষ্য অনুযায়ী কাজ শেষ করেছেন।

চার সদস্যের এই দলে রয়েছেন মার্কিন নভোচারী রিড ওয়াইজম্যান, ক্রিস্টিনা কোচ, ভিক্টর গ্লোভার ও কানাডার জেরেমি হ্যানসেন। ২০২৮ সালে চাঁদে পুনরায় মানুষ নামানোর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তারা পৃথিবীর এ উপগ্রহটি প্রদক্ষিণ করেন।

চাঁদ প্রদক্ষিণের সময় তারা পৃথিবী থেকে দূরতম পথ পাড়ি দেয়ার নতুন রেকর্ডও গড়েছেন। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী শুক্রবার রাতে ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরে তারা অবতরণ করবেন। পথিমধ্যে তারা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) অবস্থানরত সহকর্মীদের সাথেও কথা বলেন। এছাড়া আজ রাতে তারা পরিবারের সাথে কথা বলার সুযোগ পাবেন বলে জানিয়েছে নাসা।

‘আনন্দের চিৎকার’

নভোচারীরা চাঁদের পৃষ্ঠের অত্যন্ত নিখুঁত বর্ণনা দিয়েছেন। তারা সূর্যগ্রহণেরও সাক্ষী হয়েছেন। চন্দ্রপৃষ্ঠে উল্কাপাত বা আলোর ঝলকানি দেখার কথাও জানিয়েছেন তারা।

নভোচারী ভিক্টর গ্লোভার বলেন, ‘সম্ভবত মানুষ যা দেখার জন্য বিবর্তিত হয়নি, আমরা আজ তা-ই দেখছি। এর বর্ণনা দেয়া কঠিন, এটি অভাবনীয়।’

কেলসি ইয়াং জানান, নভোচারীদের বর্ণনা শুনে নাসার সায়েন্স ইভ্যালুয়েশন রুমে বিজ্ঞানীরা খুশিতে চিৎকার করে ওঠেন।

সোমবার নভোচারীদের অভিনন্দন জানান নাসা প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ট্রাম্প নভোচারীদের ‘আধুনিক যুগের অগ্রদূত’ এবং ‘সাহসী’ বলে অভিহিত করেন। তিনি তাদের সবচেয়ে ভালো লাগার মুহূর্ত এবং প্রায় ৪০ মিনিটের ব্ল্যাকআউট বা পৃথিবী থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার সময়ের অভিজ্ঞতা জানতে চান।

কথোপকথনে নিজেই একটু সংযোগ সমস্যায় পড়েন ট্রাম্প। নভোচারীরা তার কথা শুনতে পাচ্ছেন না বলে মনে হওয়ায় পুরো এক মিনিট অপেক্ষা করেন তিনি।

পরে ট্রাম্প বলেন, ‘মনে হয় সংযোগ কেটে গিয়েছিল। দূরত্বটা তো আর কম নয়।’

ঐতিহাসিক যাত্রা

আর্টেমিস-২ মিশন ১৯৭০ সালের অ্যাপোলো-১৩ এর দূরত্বের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। পৃথিবী থেকে প্রায় দুই লাখ ৫২ হাজার ৭৫৬ মাইল (চার লাখ ছয় হাজার ৭৭১ কিলোমিটার) দূরে পৌঁছান তারা, যা আগের রেকর্ডের চেয়ে চার হাজার মাইলেরও (ছয় হাজার কিলোমিটারের) বেশি।

এই অভিযানে ভিক্টর গ্লোভার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ, ক্রিস্টিনা কোচ প্রথম নারী এবং জেরেমি হ্যানসেন প্রথম অ-মার্কিন হিসেবে চাঁদ প্রদক্ষিণ করে ইতিহাস গড়েছেন।

নভোচারীদের বহনকারী ওরিয়ন ক্যাপসুল এখন ‘ফ্রি-রিটার্ন ট্র্যাজেক্টরি’তে পৃথিবীর দিকে ফিরে আসছে। সমুদ্রে অবতরণের আগে এটি এই পথেই এগোবে।

নাসা প্রশাসক আইজ্যাকম্যান জানিয়েছেন, নভোচারীদের উদ্ধারকারী জাহাজটি ইতোমধ্যে বন্দর ছেড়ে নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে রওনা দিয়েছে।

সূত্র: বাসস