সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণ একটি বর্ণিল আর আকর্ষণীয় মহাজাগতিক ঘটনা। সে কারণেই গ্রহণকে ঘিরে রয়েছে মানুষের গভীর আগ্রহ। আজ মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) হচ্ছে বছরের প্রথম সূর্যগ্রহণ। আজ সূর্যের বলয়গ্রাস গ্রহণ, যা দেখার জন্য উদগ্রীব বিশ্বের বহু মানুষ। আর এই গ্রহণকে ঘিরে পৃথিবীব্যাপী গড়ে উঠেছে নানা ধরনের পর্যটন আকর্ষণ। এ সময়ে কী করা যাবে আর কী করা যাবে না, তা নিয়ে দুনিয়া জুড়ে রয়েছে নানা মিথ আর প্রচলিত আচার।
বাংলাদেশের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় বিকেল ৫টা ৫৬ মিনিট ৩৬ সেকেন্ডে এ গ্রহণ শুরু হবে এবং রাত ৮টা ২৭ মিনিট ৩৬ সেকেন্ডে গ্রহণটি শেষ হবে।
তবে, বাংলাদেশ থেকে গ্রহণটি দেখা যাবে না। সূর্যগ্রহণটি দেখা যাবে আর্জেন্টিনা, চিলি, দক্ষিণ আফ্রিকা ও অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশে। গ্রহণ শুরু হবে অ্যান্টার্কটিকার চিলির অ্যান্টার্কটিক গবেষণার ইয়েলেচো ঘাঁটি থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে দক্ষিণ মহাসাগরে এবং শেষ হবে মরিশাসের ভিংট-সিনক দ্বীপ থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ভারত মহাসাগরে। কিন্তু মহাজগতে যত রকমের গ্রহণ হয়, তার মধ্যে একটি হলো সূর্যের পূর্ণগ্রাস গ্রহণ। এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের গ্রহণ আছে।
চিলের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী হুয়ান কার্লোস বিমিন তার সাম্প্রতিক বই ‘ইলাসট্রেটেড অ্যাস্ট্রোনমি’তে লিখেছেন, ‘সাধারণত আমরা দুই ধরনের গ্রহণের কথা জানি, চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণ।’
কিন্তু এরপরই তিনি লিখছেন, ‘তৃতীয় আরেক ধরনের গ্রহণ রয়েছে, যেটি ঘটে অনেক দূরের দু’টি তারার মধ্যে।’
তিন ধরনের গ্রহণ এবং সেগুলোরও কিছু ভিন্নতা নিচে তুলে ধরা হলো:
সূর্যগ্রহণ
চাঁদ যখন পৃথিবীর কক্ষপথে ঘোরে, তখন তার প্রদক্ষিণ পথে কখনো কখনো চাঁদ এসে পড়ে সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখানে। তখন তারা থেকে আলোর বিচ্ছুরণ বাধাগ্রস্ত হয় এবং সূর্যের গ্রহণ ঘটে। অন্যভাবে বললে বলা যায়, চাঁদ এই সময় পৃথিবীকে তার ছায়ায় ঢেকে ফেলে।
সূর্যগ্রহণ হয় তিন ধরনের। আর এই ধরনগুলো নির্ভর করে চাঁদ সূর্যকে কতটা ঢেকে ফেলছে তার ওপর।
পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ
সূর্যের পূর্ণগ্রাস গ্রহণ ঘটে যখন সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদ এমন অবস্থানে আসে যখন চাঁদ সূর্যের আলোকে পুরোপুরিভাবে ঢেকে দেয়। তখন কয়েক সেকেন্ডের জন্য (কখনো কখনো এমনকি কয়েক মিনিটের জন্যও) আকাশ এতই অন্ধকার হয়ে যায় যে, মনে হয় সেটা রাতের আকাশ।
নাসার কথায়, ‘মহাজাগতিক একটা সমন্বয় ঘটলেই একমাত্র সূর্যের পূর্ণগ্রহণ সম্ভব হয়’। সূর্য চাঁদের তুলনায় ৪০০ গুণ চওড়া এবং চাঁদ পৃথিবী থেকে যত দূরে, সূর্য তার চেয়ে আরো ৪০০ গুণ বেশি দূরে।
নাসা বলছে, ‘এই ভৌগোলিক অবস্থানের অর্থ হলো- চাঁদ, সূর্য ও পৃথিবী যখন একই লাইনে একেবারে সঠিক জায়গায় এসে পৌঁছায়, তখন সূর্য পুরোপুরি ঢেকে যায় এবং সূর্যের পূর্ণগ্রাস গ্রহণ হয়।’
পৃথিবী পৃষ্ঠে যে লাইন বরাবর চাঁদের ছায়া পড়ে তাকে বলা হয় ‘পূর্ণ গ্রাসের পথ’। আর এই ছোট পথের মধ্যেই পুরো অন্ধকার নেমে আসার চোখ ধাঁধানো প্রক্রিয়াটি দেখা যায়। যে অংশে আলোর উৎস পুরো ঢেকে যায়, ছায়ার সেই ঘন অন্ধকারাচ্ছন্ন অংশকে লাতিন ভাষায় বলে ‘আমব্রা’।
এই পথের দু’পাশে কয়েক হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত গ্রহণ দেখা যায় আংশিকভাবে। পুরো অন্ধকারে ঢেকে যাবার এই পথ থেকে পৃথিবীতে আপনার অবস্থান যত দূরে হবে, তত আপনি দেখবেন সূর্যের অপেক্ষাকৃত ছোট অংশ চাঁদে ঢাকা পড়েছে। আর গ্রহণ কতক্ষণ থাকবে ‘সেটা নির্ভর করে, সূর্য থেকে পৃথিবীর অবস্থান, পৃথিবী থেকে চাঁদের অবস্থান আর পৃথিবীর কোন অংশ অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে তার ওপর’ বলে জানিয়েছেন মি: বিমিন।
চিলের এই জ্যোতির্বিজ্ঞানী বলেছেন, ‘তত্ত্বগতভাবে সূর্যের গ্রহণ সর্বোচ্চ ৭ মিনিট ৩২ সেকেন্ড পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।’
আমরা অনেক সময় ভাবি সূর্যগ্রহণ বেশ বিরল একটা প্রক্রিয়া। তা কিন্তু নয়। প্রতি প্রায় ১৮ মাস অন্তর সূর্যগ্রহণ হয়। যেটা আসলে খুবই বিরল সেটা হলো একই স্থান থেকে সূর্যের পূর্ণগ্রাস গ্রহণ দেখতে পাওয়া। ঠিক একই জায়গা থেকে সূর্যের পূর্ণ গ্রহণ দেখা যায় গড় হিসেবে প্রতি ৩৭৫ বছরে একবার।
বলয়গ্রাস গ্রহণ
চাঁদ যখন পৃথিবী থেকে দূরে থাকে এবং তাকে ‘ছোট’ দেখায়, তখন ছোট চাঁদ বড় সূর্যকে সম্পূর্ণ ঢাকতে পারে না। ফলে সূর্যের ঢাকা না পড়া বহিঃসীমাকে একটা বলয় বা আংটির মতো দেখা যায়, মাঝখানে অন্ধকার আর চারপাশে আলোর বলয়। একেই বলে বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ।
সূর্যের পূর্ণগ্রাস গ্রহণের মতোই বলয়গ্রাসের সময়ও একটা ‘ছায়া ফেলা পথ’ তৈরি হয়। এই পথের মধ্যে পৃথিবীর যেসব অঞ্চল, সেখান থেকে বলয়গ্রাস গ্রহণ দেখা যায়। একইভাবে পথের দু’পাশ থাকে আরো বেশি আলোকিত।
নাসা বলছে, বলয়গ্রাস সাধারণত সবচেয়ে বেশি সময় স্থায়ী হয়। আংটির মতো আলোর বলয় ১০ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে দেখা যেতে পারে। তবে সাধারণত ৫ থেকে ৬ মিনিটের বেশি বলয়গ্রাস স্থায়ী হয় না। এরপর সূর্যের বলয়গ্রাস গ্রহণ হবে ১৪ অক্টোবর তারিখে, যা দেখা যাবে উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার কিছু কিছু জায়গা থেকে।
মিশ্র গ্রহণ
জ্যোতির্বিজ্ঞানী হুয়ান কার্লোস বিমিন ব্যাখ্যা করেছেন যে, মিশ্র গ্রহণ এমন একটা প্রক্রিয়া, যেটা ঘটে ‘যখন চাঁদ এমন একটা দূরত্বে আসে যেখান থেকে সে সূর্যকে সম্পূর্ণ ঢেকে ফেলতে পারে। কিন্তু প্রদক্ষিণ পথে ক্রমশ চাঁদ পৃথিবী থেকে সামান্য সরে যায় এবং সূর্যকে পুরো ঢাকতে পারে না, ফলে পূর্ণগ্রাস গ্রহণ দিয়ে শুরু হলেও সেটা বলয়গ্রাস গ্রহণে রূপ নেয়। আবার অনেক সময় সেটা শুরু হয় বলয়গ্রাস গ্রহণ দিয়ে, যার পর চাঁদ আরেকটু কাছে সরে গেলে পূর্ণগ্রাস হয়ে যায়।’
মিশ্র গ্রহণ বা হাইব্রিড এক্লিপ্স খুবই বিরল বলে জানিয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞানবিষয়ক সংস্থা আইএসি। সংস্থাটি বলছে, সব সূর্যগ্রহণের মাত্র ৪ শতাংশ হয় মিশ্র ধরনের।
নাসার তথ্য-উপাত্ত থেকে জানা গেছে, এ ধরনের মিশ্র গ্রহণ হয়েছিল ২০১৩ সালে এবং এর পরেরটা ২০২৩ সালের ২০ এপ্রিল, যেটা ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া আর পাপুয়া নিউ গিনি থেকে দেখা গেছে।
চন্দ্রগ্রহণ
চন্দ্রগ্রহণ হয় যখন চাঁদ আর সূর্যের মাঝখানে থাকে পৃথিবীর অবস্থান। পৃথিবী তখন আলোর উৎস বন্ধ করে দেয়। চন্দ্রগ্রহণের সময় আমরা দেখি চাঁদের পিঠে পৃথিবীর ছায়া।
আইএসির একটি প্রশিক্ষণ পুস্তিকায় বলা হয়েছে, ‘সূর্যগ্রহণ কেমন দেখা যাবে, সেটা নির্ভর করছে যে দেখছে তার ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর। কিন্তু চন্দ্রগ্রহণের ক্ষেত্রে ঘটে উল্টোটা। পৃথিবীর যে কোনো জায়গা থেকে এই গ্রহণ দেখা যাবে, যদি গ্রহণের সময় চাঁদ দিগন্তের ওপরে উঠে আসে।’
এতে আরো বলা হয়েছে, ‘সূর্যগ্রহণে যেমন গ্রহণের বিভিন্ন পর্যায় নির্ভর করে, যে দেখছে তার ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী। চন্দ্রগ্রহণে কিন্তু আপনি কোথায় আছেন সেটা বিবেচ্য হয় না। সব জায়গা থেকে গ্রহণের পর্যায়গুলো একইভাবে দেখা যায়।’
চন্দ্রগ্রহণও আছে তিন রকম।
পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ
নাসা ব্যাখ্যা করছে, পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদ ও সূর্য পৃথিবীর দুই পাশে ঠিক এক লাইনে অবস্থান করে।
‘যদিও পৃথিবীর ছায়া চাঁদকে ঢেকে ফেলে, নাসা বলছে চাঁদের ওপর সূর্যরশ্মির কিছুটা গিয়ে পড়ে।’
চাঁদে পৌঁছানোর জন্য ওই সূর্যরশ্মিকে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। এই যাবার পথে সূর্যের নীল রশ্মির বেশিটাই বায়ুমণ্ডলে শোষিত হয়ে যায়। ফলে এই প্রক্রিয়ার সময় চাঁদকে দেখায় লাল এবং এই রক্তিম চাঁদকে অনেকসময় নাম দেয়া হয় ‘ব্লাড মুন’।
আইএসি বলছে, ‘চাঁদের ব্যাসের চেয়ে আমাদের গ্রহের ব্যাস চারগুণ বড়, ফলে পৃথিবীর ছায়ার পরিধিও অনেক বেশি। তাই পুরো চন্দ্রগ্রহণের প্রক্রিয়া অনেক লম্বা সময় ধরে চলে। ১০৪ মিনিট পর্যন্ত এটা চলতে পারে।’
এই পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ আমরা দেখেছি ২০২১ সালের ২৬ মে, দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চলে, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া বা আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চলে। সেদিন যাদের আকাশ পরিষ্কার ছিল, তাদের মে মাসের পূর্ণিমার অতিকায় চাঁদ যার নাম ‘সুপার ফ্লাওয়ার ফুল মুন’ প্রায় ১৪ মিনিট স্থায়ী সেটির পূর্ণগ্রাস গ্রহণ দেখার সুযোগ হয়েছিল।
এর পরের ‘ব্লাড মুন’ বা অতিকায় লাল চাঁদ দেখা গেছে ২০২২ সালের ১৫ থেকে ১৬ মে। এটা সবচেয়ে ভালো দেখা গেছে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং কুমেরু অঞ্চল থেকে।
খণ্ডগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ
চাঁদের খণ্ডগ্রাস গ্রহণ হয় যখন চাঁদের একটা অংশ পৃথিবীর ছায়ায় ঢেকে যায়। পৃথিবী চাঁদকে কতটা গ্রাস করে নিচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে হয় গাঢ় লাল, কখনো আবার মরচে রং বা কাঠকয়লার রংয়ের ছায়া পড়ে চাঁদের ছায়ায় ঢাকা অংশে। চাঁদের বুকে পৃথিবীর ছায়া কোথাও হালকা, কোথাও গাঢ় হবার কারণে এ রকম দেখায়।
নাসা বলছে, পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ বিরল, কিন্তু খণ্ডগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ ঘটে কমপক্ষে বছরে দু’বার।
আশা করা হচ্ছে, পরবর্তী খণ্ডগ্রাস চন্দ্রগ্রহণটি দেখা যায় ২০২২ সালের ২৮ থেকে ২৯ অক্টোবর এবং তা দেখা যায় পৃথিবীর বেশিরভাগ জায়গা থেকে। পুরো এশিয়ায়, আফ্রিকা ও ইউরোপে এবং অস্ট্রেলিয়া এবং উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার কিছু কিছু জায়গা থেকে।
পেনাম্ব্রা চন্দ্রগ্রহণ
এই চন্দ্রগ্রহণ হয় যখন পৃথিবীর হালকা ছায়াচ্ছন্ন অংশ লাতিন ভাষায় যাকে বলা হয় পেনাম্ব্রা সেই অংশের মধ্যে দিয়ে চাঁদ প্রদক্ষিণ করে। এই ছায়া গাঢ় নয়, অনেকটাই হালকা। ফলে এই গ্রহণ সাধারণ মানুষের চোখে সেভাবে ধরা পড়ে না। এই ছায়াচ্ছন্ন অংশ যদি খুবই ছোট হয় তাহলে চাঁদের গ্রাস হচ্ছে কি-না, তা বোঝা কঠিন। এ কারণে দিনপঞ্জিতে এই গ্রহণের কোনো উল্লেখ থাকে না। এই ধরনের গ্রহণের খবর রাখেন একমাত্র জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।
তারা বা নক্ষত্রের গ্রহণ
সব গ্রহণ আমরা যেমনটা জানি শুধু সূর্য আর চাঁদের ক্ষেত্রে হয় না। অনেক দূরের তারা বা নক্ষত্রমণ্ডলিতেও গ্রহণ হয়।
মি. বিমিন বলেছেন, ‘মহাজগতে ৫০ শতাংশ তারার অবস্থান দুই বা তার বেশিসংখ্যক তারার মাঝখানে।’
চিলের জ্যোতির্বিজ্ঞানী হুয়ান কার্লোস বিমিন ব্যাখ্যা করেছেন, ‘ছায়াপথে অসংখ্য তারা বা নক্ষত্র রয়েছে। এদের মধ্যে কিছু আছে, যেখানে দু’টি তারা একটা ভরকে ঘিরে প্রদক্ষিণ করছে এবং তাদের কক্ষপথের সাথে পৃথিবীর কক্ষপথের খুবই সংযোগ রয়েছে। ফলে কক্ষপথে ঘোরা সময় একটা নক্ষত্র আরেকটা নক্ষত্রের সামনে এসে অন্যটির আলোকে ঢেকে দেয়। এটাই নক্ষত্রমণ্ডলির গ্রহণ প্রক্রিয়া।’
সূত্র: বিবিসি



