নিরবেই এই নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে মহান প্রভুর অনন্ত সান্নিধ্যে চলে গেলেন নিভৃতচারী বুযূর্গ মাওলানা আবূ বকর নোমান। তিনি মিরপুর-১৩ নং সেকশনস্থ দারুল উলূম ঢাকার দীর্ঘদিনের ভাইস প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সবার কাছে একজন নিরাহংকর নির্মোহ ও সজ্জন ব্যক্তি বলে সমধিক পরিচিত ছিলেন। সমাজে এমন মানুষের সংখ্যা হাতেগোনো কয়েকজন। জনসমুদ্রে প্রকৃত মানুষের অভাব বোধ করে কবি ফররুখ আহমদের মানবতাবাদী মন থেকে উৎসারিত হাহাকারমূলক পংক্তি-
‘মানুষ খুঁজিয়া ফিরি জনতায়, মানুষ কই?’ কবি জনতার ভিড়ে যে মানবিকতা ও মনুষ্যত্বের গুণাবলীসম্পন্ন মানুষ খুঁজেছেন মাওলানা আবূ বকর নোমান ছিলেন তেমনি বিরল প্রকৃতির মানুষ।
তিনি জন্মগ্রহণ করেন কিশোরগঞ্জ জেলার হোসেনপুর থানাধীন গনমান পুরুরা গ্রামে। জাতীয় পরিচয় পত্রের তথ্য অনুযায়ী তার জন্ম ১৯৬০ সালের ১ জানুয়ারি।
‘প্রথম যেদিন তুমি এসেছিলে ভবে
কেঁদেছিলে তুমি হেসেছিল সবে
এমনো জীবন তুমি করিবে গঠন,
মরণে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন’- আমাদের প্রতীতি মাওলানা আবূ বকর নোমান আক্ষরিক অর্থেই এমন জীবনের অধিকারী ছিলেন। সত্যিই তিনি সবাইকে কাঁদিয়ে ২৭ রামাদান ১৪৪৭ হিজরী মোতাবেক ১৭ মার্চ ২০২৬ ইং মঙ্গলবার অপরাহ্নে পরপারে চলে যান। প্রথাগতভাবেই তখন মাদরাসাগুলো বন্ধ। তথাপি ইফতার ও মাগরিব নামাযের পর তড়িৎ অনুষ্ঠিত তার জানাযায় বিপুল সংখ্যক সাধারণ মুসল্লি, উলামায়ে কিয়াম ও শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি তার ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ বহন করে।
দ্বীনের পথে দায়ী আলেমগণ দুই শ্রেণীর হয়ে থাকেন। এক শ্রেণী তাদের কর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্যাপক সুখ্যাতি অর্জন করেন ও সুবিদিত হন। অপর শ্রেণী মহাভারতের কাঠবিড়ালীর মতো সারা জীবন জাতির কল্যাণে একনিষ্ঠভাবে নিরবে নিভৃতে কাজ করে যান যশ ও খ্যাতি লাভ করতে পারেন না বা হয় না। মাওলানা আবূ বকর নোমান ছিলেন আল্লাহর প্রতি নিবেদিত প্রাণ এই দ্বিতীয় শ্রেণীর বুযূর্গ আলেম।
মাওলানা আবূ বকর নোমান ব্রেইন স্ট্রোক করে দীর্ঘদিন যাবত পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থায় ছিলেন। কিছুদিন আগে রোগের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় প্রথমে মিরপুর ১০ নং সেকশনস্থ আলোক হাসপাতালে পরবর্তীতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে আগারগাঁও নিউরো সাইন্স হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই চিকিৎসারত অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন।
ময়মনসিংহের নান্দাইল থানাধীন জামিয়া আহাদিয়া মাদরাসায় তার পড়ালেখার হাতেখড়ি। পরবর্তীতে লুলিকান্দি উচ্চ বিদ্যালয় হতে অষ্টম শ্রেণী পাস করে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামের হাটহাজারীর মুহিউস সুন্নাহ মেখল মাদরাসায় ভর্তি হন এবং ফারসি থেকে শরহেজামী জামাত পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। হেদায়া জামাতে ভর্তি হন জামিয়া আহলিয়া মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারীতে। এখান থেকেই কৃতিত্বের সাথে দাওরায়ে হাদীস সম্পন্ন করেন।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপন করে ১৯৮৮ ইং নরসিংদী জেলার বিখ্যাত দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পূর্ব দত্তপাড়া মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৯২ ইং এক বছর ময়মনসিংহ জেলার কাজীগ্রাম ইমদাদুল উলূম মাদরাসার মুহাদ্দিস ছিলেন। ১৯৯৩ ইং তিনি মিরপুর-১৩নং সেকশনস্থ দারুল উলূম মাদরাসার প্রধান মুদাররিস নিযুক্ত হন। অকাল বার্ধক্যজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে দুর্বল হয়ে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি তৎকালীন দারুল উলূম মাদরাসার জটিল শাস্ত্রীয় দুর্বোধ্য কিতাবসমূহের (যেমন মুখতাসারুল মায়ানী, শরহে জামী, কাফিয়া ইত্যাদি) দরস দিয়েছেন। ১৯৯৭ইং দারুল উলূম মাদরাসার ভাইস প্রিন্সিপাল মনোনীত হন এবং মৃত্যুর অব্যবহিত পূর্ব পর্যন্ত এই দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করেছেন।
তিনি ছাত্রদের শিক্ষার সাথে দীক্ষার প্রতি খুব গুরুত্বারোপ করতেন। দরস দানের ফাঁকে ফাঁকে তিনি ছাত্রদের নৈতিক চরিত্র গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় উপদেশ দিতেন। তার দরস ও ওয়াজ ছিল শ্রুতিমধুর ও মনোজ্ঞ। তিনি প্রচুর ফার্সি ও উর্দু শে’র জানতেন। ছন্দ ও সুরের মূর্ছনায় দরস ও ওয়াজের শ্রোতাদের মুগ্ধ করে রাখতেন তিনি। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে তার আলোচনা শুনে কেউ বিরক্তি বা ক্লান্তি অনুভব করতেন না।
তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ দুনিয়া বিমুখ সরলমনা ও আত্মভোলা মানুষ। সাদাসিধে সহজ সরল জীবনযাপন ছিল তার অনন্য বৈশিষ্ট্য। চলনে-বলনে, পোশাকে-আশাকে, চিন্তায় ও কর্মে তার দুনিয়া ত্যাগী মনোবৃত্তির স্পষ্ট ছাপ ছিল। তিনি প্রতিনিয়ত তার ঔরশজাত সন্তান এবং রূহানী সন্তান অর্থাৎ তার ছাত্রদের দুনিয়ার চাকচিক্য পরিহার করার জন্য উপদেশ দিতেন। দুনিয়ার ধোঁকা ও প্রতারণায় জড়িয়ে না পড়ার ব্যাপারে সতর্ক করতেন।
তিনি দেহান্তরিত হয়েছেন মাত্র। তার স্মৃতি রয়েছে সবার মননে। অজাতশত্রু নিরীহ নির্ঝঞ্ঝাট এই মানুষটি শ্রেষ্ঠ গুণের অধিকারী ছিলেন বলেই অনেকের হৃদয়ে ঠাঁই করে নিয়েছেন। কাজের মধ্য দিয়েই তিনি সবার মাঝে বেঁচে থাকবেন যুগান্তরে।
শিক্ষক জাতির নির্মাণের কারিগর। একজন শিক্ষক সমাজের দর্পণ, জাতির মননের দার্শনিক। তিনি অনুসরণীয়, শ্রদ্ধেয়। সমাজে তাই শিক্ষকের মর্যাদা সবার ওপরে। আবূ বকর নোমান প্রথাবদ্ধ শিক্ষক ছিলেন না, তিনি ছিলেন শিক্ষার্থীদের অকৃত্রিম অভিভাবক আস্থার প্রতীক। তাইতো পিতৃতুল্য এই শিক্ষক সকল শিক্ষার্থীদের নিকট খ্যাতিমান হয়েছিলেন ‘বাবা হুজুর’ অভিধায়।
ফলবান বৃক্ষ যে নিচের দিকে নুইয়ে পড়ে তা তাকে দেখলে মনে হতো। বড়মাপের পণ্ডিত আলেম হয়েও তিনি কখনও গর্ববোধ করতেন না। তিনি বয়সে জ্ঞানে প্রজ্ঞায় সর্বদিক বিবেচনায় আমার চেয়ে বড়ো ও উচ্চতর হওয়া সত্ত্বেও যেকোনো পরামর্শ নির্দ্বিধায় মেনে নিতেন। আমার বিশ্বাস এমন বিশ্বস্ত সহকর্মী কেউ কোনোদিন পায়নি আর পাবেও না।
তাকে নিয়ে শিক্ষার্থীরা গর্ববোধ করেন। তিনি ছিলেন সাদামাটা নির্ভেজাল একজন সদালাপী মানুষ। দুঃখভারাক্রান্ত মন ভালো হয়ে যেতো তার সাথে কথা বললে। জীবনানন্দ দাশের ‘মানুষের মৃত্যু হলে’ কবিতায় আছে- মানুষ মরে গেলেও মানব থেকে যায়। আবূ বকর নোমান সাহেবের মৃত্যু হলেও সমাজের দিশাবাহী কর্মকান্ডের মৃত্যু হবে না। তিনি ইতিবাচক আদর্শবান শিক্ষকের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে আমরা তার মাগফিরাত ও জান্নাতুল ফিরদাউস প্রার্থণা করি।



