নাসরিন সুলতানা
রমজান রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। এই মাসে প্রতিটি মুমিন নর-নারী আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সিয়াম, সালাত, তেলাওয়াত ও দান-সদকার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির পথে এগিয়ে যায়। তবে বাস্তব জীবনে রমজানের এক বিশেষ দিক হলো-নারীর নীরব ইবাদত, যা অনেক সময় দৃশ্যমান না হলেও আল্লাহর কাছে অত্যন্ত মূল্যবান।
ভোররাতের নিস্তব্ধতায় যখন অধিকাংশ মানুষ গভীর ঘুমে, তখন একজন নারী তার দিনের সূচনা করেন। সাহরির প্রস্তুতি, পরিবারের সবার খাবারের ব্যবস্থা- এসব দায়িত্ব তিনি আন্তরিকতার সাথে পালন করেন। অনেক নারী তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করে আল্লাহর কাছে নিজের ও পরিবারের জন্য দোয়া করেন। এরপর সাহরি তৈরি, সবাইকে ডাকা, খাওয়ানো সবই তার একান্ত দায়িত্বে পরিণত হয়। এই পরিশ্রমের মাঝেও তার নিয়ত থাকে ইবাদতের, কারণ ইসলামে প্রত্যেক সৎ কাজই নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।
পবিত্র কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি মানুষ ও জিনকে সৃষ্টি করেছি কেবল আমার ইবাদতের জন্য।’ (সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত : ৫৬)। এই ইবাদত শুধু নামাজ-রোজার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং পরিবারের জন্য ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ থেকে করা কাজও ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত, যদি তা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয়।
রমজানে দিনের বেলা একজন নারী রোজা রেখে ঘরের যাবতীয় কাজ করেন। রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সন্তানদের দেখাশোনা, সবকিছু তিনি ধৈর্যের সাথে সম্পন্ন করেন। হাদিসে রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।’ (সহিহ মুসলিম)। একজন রোজাদার নারীর জন্য এই ধৈর্যই তার বড় শক্তি।
ইফতারের সময় নারীর ব্যস্ততা আরো বেড়ে যায়। পরিবারের সবাই যেন পছন্দমতো খাবার পায়, সে জন্য তিনি নানা আয়োজন করেন। অনেক সময় নিজের ইবাদতের সময় কমে গেলেও পরিবারের খুশির জন্য তিনি তা মেনে নেন। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে এই ত্যাগ বৃথা যায় না। রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করায়, সে তার সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করে।’ (তিরমিজি)। সুতরাং একজন নারী যখন পরিবারের জন্য ইফতার প্রস্তুত করেন, তখন তিনিও এই সওয়াবের অংশীদার হন।
রমজানের রাতে তারাবিহ নামাজের প্রস্তুতি, সন্তানদের ঘুম পাড়ানো, পরদিনের কাজের পরিকল্পনা- সব মিলিয়ে নারীর জীবন যেন এক অবিরাম ইবাদতের চক্রে আবর্তিত হয়। তিনি নিজে রোজা রাখেন এবং পরিবারের অন্য সদস্যদেরও রোজা পালনে সহায়তা করেন। এভাবেই একজন নারী পরিবারকে দ্বীনের পথে পরিচালিত করেন।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী, তারা একে অপরের সহায়ক।’ (সূরা আত-তাওবা, আয়াত : ৭১)। এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, একজন নারী শুধু নিজের ইবাদতেই সীমাবদ্ধ নন; বরং তিনি পুরো পরিবারকে সৎ পথে পরিচালিত করার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
তবে এই ব্যস্ততার মাঝে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রায়ই উপেক্ষিত হয়- নারীর নিজের যত্ন। অনেক নারী সংসারের কাজ করতে গিয়ে নিজের শরীর ও মনের দিকে খেয়াল রাখতে ভুলে যান। অথচ ইসলাম ভারসাম্যের শিক্ষা দেয়। রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘তোমার শরীরেরও তোমার ওপর অধিকার রয়েছে।’ (সহিহ বুখারি)। তাই একজন নারীর জন্য নিজের স্বাস্থ্য ও মানসিক প্রশান্তির যত্ন নেয়াও একটি দায়িত্ব।
বিশেষ করে ৩০ বছর বয়সের পর নারীদের শরীরে নানা পরিবর্তন দেখা যায়। এ সময় পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং মানসিক প্রশান্তি খুবই জরুরি। রমজানে রোজা রাখার পাশাপাশি নিজের শরীরের প্রয়োজনের কথাও ভাবতে হবে। কারণ একজন সুস্থ নারীই একটি সুস্থ ও সুখী পরিবার গড়ে তুলতে পারে।
নিজের জন্য সময় বের করা কোনো স্বার্থপরতা নয়; বরং এটি আত্ম-সংরক্ষণ। অবসর সময়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়া, কোরআন তেলাওয়াত করা, দোয়া করা, বা নিজের পছন্দের কোনো কাজে সময় দেয়া—এসবই মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়। কেউ রান্না শিখতে ভালোবাসেন, কেউ লেখালেখি করেন, আবার কেউ ছোটখাটো ব্যবসা করেন- এসব কাজ নারীর আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।
ইসলাম নারীর মর্যাদাকে অত্যন্ত উচ্চ স্থানে অধিষ্ঠিত করেছে। একজন নারী মা, স্ত্রী, কন্যা-প্রতিটি ভূমিকায় গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘জান্নাত মায়ের পদতলে।’ (নাসাঈ)। এই হাদিস নারীর মর্যাদা ও গুরুত্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
রমজানে একজন নারীর প্রতিটি কাজ- সাহরি প্রস্তুত করা, ইফতার বানানো, পরিবারের যত্ন নেয়া সবই ইবাদতে পরিণত হতে পারে, যদি তার নিয়ত হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি। তাই নারীর এই নীরব ত্যাগকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত মহৎ আমল।
পরিশেষে বলা যায়, রমজানে নারীর জীবন এক অনন্য ইবাদতের প্রতিচ্ছবি। তিনি নিজের রোজা পালন করেন, আবার পরিবারের সবাইকে রোজা রাখতে সহায়তা করেন। তার ধৈর্য, দায়িত্ববোধ ও আত্মত্যাগ একটি আদর্শ পরিবারের ভিত্তি গড়ে তোলে। তবে এর পাশাপাশি নিজের প্রতি যত্নবান হওয়াও তার জন্য অপরিহার্য।
একজন সুস্থ, আত্মবিশ্বাসী ও সচেতন নারীই পারে একটি সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও দ্বীনদার পরিবার গড়ে তুলতে। তাই রমজানে নারীর এই নীরব ইবাদতকে স্বীকৃতি দেয়া এবং তাকে যথাযথ সম্মান করা আমাদের সবার দায়িত্ব।



