অনলাইনে ক্লাসের পক্ষে নেই অধিকাংশ শিক্ষক অভিভাবক। যদিও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে অনলাইনে ক্লাস চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। আজ রোববার এ বিষয়ে বৈঠকের পর ঘোষণাও আসতে পারে। বিশ^ব্যাপী জ¦ালানি সঙ্কটের কারণেই মূলত দেশের অভ্যন্তরে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের চিন্তা থেকে স্কুল কলেজে সশরীরের পাশাপাশি অনলাইন ক্লাসের বিষয়ে পরিকল্পনা নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি পর্যবেক্ষণ এবং তদারকির কারণে এই বিষয়ে আজ একটি সিদ্ধান্ত আসতে পারে। তবে শিক্ষাবিদ অভিভাবক এবং শ্রেণিশিক্ষকদের মতামত হলো অনলাইনে ক্লাস চালু হলেও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের ধারণা ভুল প্রমাণিত হবে। আবার করোনাকালীন অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে সরাসরি মোবাইলে কিংবা ডিভাইজের সহজলভ্যতা শিক্ষার্থীদের অনেক ক্ষেত্রে বিপদগামীও করতে পারে।
শিক্ষক অভিভাবকদের অধিকাংশই মনে করেন, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্যই যদি অনলাইন ক্লাস চালুর চিন্তা থাকে তাহলে স্কুলের ক্লাস টাইমে পরিবর্তন এনে সব স্কুলে/ কলেজে মর্নিং শিফট চালু করা যেতে পারে। এতে সকাল ৮টা থেকে শুরু হয়ে বেলা ১টার মধ্যেই স্কুল টাইম শেষ করতে পারলে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পরিকল্পনার অনেকটাই সফল হবে। প্রয়োজনে প্রতিটি ক্লাসের পাঠদানের সময়ও সমন্বয় করে স্কুলের টাইমিংয়ে আরো কাটছাঁট করার সুযোগ রয়েছে।
এসব বিষয়ে গত বৃহম্পতিবার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনলাইনে ক্লাস চালু করার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের কর্মকর্তা এবং শিক্ষক প্রতিনিধিদের সাথে মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় শিক্ষকদের অভিব্যক্তি ছিল গ্রামাঞ্চলে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৯৬ শতাংশ শিক্ষার্থী এখনো অনলাইনে ক্লাস বা মোবাইল ডিভাইজের ব্যবহার করতে পারবে না। ফলে প্রাথমিকের জন্য অনলাইন ক্লাস এখনো উপযোগী নয়। আবার দরিদ্র অঞ্চলে কৃষক পরিবারে ৯০ শতাংশ বাবা/মায়েরই তাদের সন্তানদের অনলাইন ক্লাসের ডিভাইসই নেই। ফলে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে অনলাইন ক্লাসের উপকারিতা কতটুকু হবে তা শুরুর আগেই ভেবে দেখা দরকার।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষক-কর্মচারী ফোরামের সভাপতি এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোটের সদস্যসচিব প্রিন্সিপাল দেলোয়ার হোসাইন আজিজী গতকাল নয়া দিগন্তকে জানান, মাত্র কয়েক বছর আগেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে করোনার ক্ষত থেকে আমরা যে শিক্ষা লাভ করেছি তা এখনো সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনতে পারিনি। এখন জ¦ালানি সাশ্রয়ের নামে যদি শিক্ষার্থীদের হাতে আবারো মোবাইল ডিভাইজ তুলে দেয়া হয় তাহলে এর ক্ষতির পরিমাণ হবে আরো ভয়াবহ। আমরা শিক্ষকরা কেউই অনলাইনে ক্লাসের পক্ষে নই। তবে প্রয়োজনে মর্নিং শিফট চালু করে স্কুলের টাইমিংয়ে পরিবর্তন আনা যেতে পারে। এতে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শিখন লাভেও কোনো ক্ষতির প্রভাব পড়বে না। যদিও আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকার্যক্রম পরিচালনা নিয়ে আজ রোববার নির্দেশনা জারি করবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। করোনাকালীন তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে আমরা অনলাইন ক্লাসে ফিরে যেতে চাই না। যেকোনো মূল্যে অফলাইন ক্লাস অব্যাহত রাখার জন্য সরকারকে আহ্বান জানাচ্ছি। প্রয়োজনে মর্নিং ক্লাস চালু করা যেতে পারে বলেও তিনি তার মতামত ব্যক্ত করেন।
গতকাল শনিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায় বৈশ্বিক জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় দেশের মহানগরীর স্কুল-কলেজগুলোতে অনলাইন ক্লাসের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে সপ্তাহে একদিন অনলাইন ক্লাসের প্রস্তাব মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র আরো জানায়, অনলাইন ক্লাসের পরিকল্পনা এবং নানা প্রস্তাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে একটি প্রস্তাবও করা হয়েছে। তবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রস্তাবনার ওপর চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত এখনো জানানো হয়নি। মন্ত্রিপরিষদ থেকে সিদ্ধান্ত জানানোর পর অনলাইন ক্লাস নিয়ে নির্দেশনা জারি করবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
বাংলাদেশ আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশনের সহকারী জেনারেল সেক্রেটারি এবং আদর্শ কলেজ শিক্ষক পরিষদের সহসভাপতি অধ্যক্ষ রবিউল ইসলাম এই প্রতিবেদককে জানান, অনলাইনে ক্লাস চালু হলেও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে কার্যকর কোনো উন্নতি হবে না। কেননা একটি ক্লাসরুমে যেখানে দুই থেকে তিনটি লাইট, ফ্যান চালিয়ে ৫০/৬০ জন শিক্ষার্থী অফলাইনে ক্লাসে উপস্থিত থাকতে পারবে সেখানে বাসায় বসে অনলাইনে ক্লাসে অংশ নিতে হলে ৫০ থেকে ৬০টি ফ্যান, লাইট ব্যবহৃত হবে। আবার মোবাইল বা অন্য কোনো ডিভাইস ব্যবহার করা হলেও এগুলোর চার্জ কিংবা অন্য কোনোভাবে বিদ্যুতের ব্যবহার আরো বাড়বে। এ ছাড়া অনলাইন ক্লাসের ফিডব্যাক কতটুকু আসবে সে বিষয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তবে আমার বিবেচনায় প্রয়োজনে সপ্তাহে পাঁচ কর্মদিবসের পরিবর্তে একদিন কমিয়ে চারদিন শ্রেণী শিক্ষাকার্যক্রম সশরীরেই অব্যাহত রাখা যেতে পারে।
গত দুই দিনে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে টেলিফোনেও অনেক অভিভাবক এই প্রতিবেদককে জানান তারাও অনলাইন ক্লাসের পক্ষে নন। অভিভাবকরা জানান, করোনার সময়ে অনলাইন ক্লাসের সুযোগে অনেক শিক্ষার্থী বিপদগামী হয়েছে। অনলাইন জুয়া কিংবা বিভিন্ন গেমের আড়ালে শিক্ষার্থীদের ক্লাস বহির্ভূত কাজে নিজেদের ব্যস্ত রেখেছে। তাই তারা তাদের সন্তানদের অনলাইনে ফেরাতে রাজি নন। ঢাকার এক অভিভাবক বলেন, শিক্ষার্থীদের যেখানে স্কুল কলেজে মোবাইল ফোন নেয়ার ব্যাপারেই নিষেধাজ্ঞা রয়েছে সেখানে আবারো তাদেরকে মোবাইলে ক্লাসে ফেরানো হলে হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা রয়েই যাচ্ছে।
এর আগে গত ৩১ মার্চ মন্ত্রণালয়ে এক আলোচনা সভায় প্রতিটি অলটারনেটিভ (বিকল্প) দিনে অনলাইন-অফলাইন ক্লাসের বিষয়ে আলোচনা করা হয়। ওই আলোচনায় একদিন অনলাইন এবং পরদিন অফলাইন ক্লাসের পরিকল্পনার কথা জানান শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। ওই পরিকল্পনার পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের শীর্ষ এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় আপাতত সপ্তাহে একদিন অনলাইন ক্লাসের প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিস্থিতি খারাপের দিকে গেলে অনলাইন ক্লাসের পরিধি বাড়ানো হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সম্প্রতি ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের শিক্ষক, বোর্ড কর্মকর্তা এবং মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে সপ্তাহে ছয় দিনই ক্লাসের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনদিন অনলাইন ও তিন দিন হবে অফলাইনে। তারা বলছেন, যদি কোনো সমস্যা সামনে আসে সংশোধন করা হবে। শিক্ষকরা স্কুলে এসে ক্লাস নেবেন। জোড়-বিজোড় দিন ভাগ করে হবে অনলাইন ও অফলাইন ক্লাস।



