আসন সমঝোতা নিয়ে দেরি হওয়ায় ইসলামী দলগুলোর মধ্যে অসন্তোষ

প্রত্যাহারের আগেই সমাধানের প্রত্যাশা জামায়াতের

আসন সমঝোতা নিয়ে ইসলামী দলগুলোর মধ্যে অসন্তোষ অব্যাহত রয়েছে। দ্রুতই সমাধান না হলে বিকল্প ভাবনাও রয়েছে দলগুলোর। তবে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে চান না তারা। সমাধানের প্রত্যাশায় আলোচনা অব্যাহত রাখার আশা দলগুলোর। আর জামায়াত বলছে মনোনয়ন প্রত্যাহারের আগেই সমাধান হয়ে যাবে।

খালিদ সাইফুল্লাহ
Printed Edition

আসন সমঝোতা নিয়ে ইসলামী দলগুলোর মধ্যে অসন্তোষ অব্যাহত রয়েছে। দ্রুতই সমাধান না হলে বিকল্প ভাবনাও রয়েছে দলগুলোর। তবে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে চান না তারা। সমাধানের প্রত্যাশায় আলোচনা অব্যাহত রাখার আশা দলগুলোর। আর জামায়াত বলছে মনোনয়ন প্রত্যাহারের আগেই সমাধান হয়ে যাবে। সে পর্যন্ত সবাইকে ধর্য্য ধরার পরামর্শ দলটির।

গত ২৯ ডিসেম্বর ছিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়ন ফরম জমাদানের শেষ দিন। কিন্তু এখনো প্রার্থী তালিকা চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করতে পারেনি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ৮ দল। জানা যায়, আসন সমঝোতা প্রায় সম্পন্ন হলেও তা এখনো মেনে নিতে পারেনি সব দল। এর মধ্যে এনসিপি, এলডিপি ও এবি পার্টি এ জোটে যুক্ত হয়েছে। তাদের আসনও এখনো চূড়ান্তভাবে ঘোষণা হয়নি। মনোনয়ন ফরম দাখিলের আগে আসন সমঝোতার চূড়ান্ত ঘোষণা না হওয়ায় অসন্তোষ বেড়েছে দলগুলোর মধ্যে। এ ছাড়া এনসিপিসহ অন্য দলগুলোকে আলোচনা ছাড়াই য্ক্তু করা হয়েছে বলে তাদের অভিযোগ। এসব দলের নেতারা বলছেন, আসন ছাড়তে হবে এ কারণে অনেক আসনে আগে থেকেই মনোনয়ন ফরম কেনেনি প্রার্থীরা। আর কিনলেও বেশিরভাগ প্রার্থীর মনোনয়ন দাখিলের প্রস্তুতি ছিল না। এ কারণে অনেক প্রার্থী শেষ সময়ে সব কাগজপত্র গুছিয়ে ফরম দাখিল করতে পারেনি বলে দলগুলোর অভিযোগ। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন আহমদ জানান, তাদের অন্তত ৩০ জন প্রার্থী মনোনয়ন ফরম জমা দিতে গিয়েও কিছু সময় পরে পৌঁছানোর কারণে জমা দিতে পারেননি। তারা মোট ৮৫টি আসনে মনোনয়ন ফরম জমা দিতে পেরেছেন। আসন সমঝোতা না হওয়ায় শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্তে জমা দেয়ার আহ্বান জানালেও সব কাগজপত্র গুছিয়ে প্রার্থীরা সময়মত জমা দিতে পারেননি।

খেলাফত আন্দোলন মাত্র ১০টি আসনে ফরম জমা দিতে পেরেছে। নেজামে ইসলাম পার্টির নিবন্ধন শেষ মুহূর্তে পাওয়ার কারণে মাত্র ১১টি আসনে জমা দিতে পেরেছে। এ ছাড়া খেলাফত মজলিসের ৬৭ জন প্রার্থী মনোনয়ন পত্র জমা দিয়েছেন। জামায়াতের আড়াই শতাধিক প্রার্থী ফরম জমা দিয়েছেন। জোটের প্রার্থীদের ছেড়ে দেয়ায় তাদের অনেক প্রার্থী কেন্দ্রীয় নির্দেশে মনোনয়ন ফরম জমা দেননি। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীরা ২৭২ আসনে মনোনয়ন দাখিল করেছেন।

দলগুলোর নেতারা বলছেন, আগেই সমঝোতা হয়ে গেলে জোটে থাকার পরও একই আসনে সব দলের প্রার্থীদের মনোনয়ন ফরম জমা দেয়ার ঘটনা ঘটত না। এতে সন্দেহ অবিশ^াস বা যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে তা থাকত না। মনোনয়ন ফরম কেনার আগেই আসন সমঝোতা চূড়ান্ত হওয়া উচিত ছিল। তবে জানা যায়, প্রায় সব আসনে সমঝোতা ইতোমধ্যে হয়ে গেছে। কিন্তু কিছু আসনে সব দলই প্রার্থী দিতে অনড় রয়েছে। এমনকি এমনও আসন রয়েছে যেখানে তিন-চার দল তাদের প্রার্থী রাখতে চাচ্ছে। এ কারণেই চূড়ান্ত সমঝোতায় দেরি হচ্ছে। এ ছাড়া এক দলের কেন্দ্রীয় নেতার আসনে অন্য দলের আসন চাওয়াকে কেন্দ্র করেও সঙ্কট দেখা দিয়েছে। একইভাবে দলগুলোর নিজেদের ভোট ব্যাংকের তুলনায় বেশি আসন দাবি করা নিয়েও সঙ্কট ও অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।

খেলাফত আন্দোলনের নায়েবে আমির মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী মনোনয়ন ফরম কিনেও পরে জমা দেননি। তিনি বলেন, আসন সমঝোতায় দেরি হওয়ার কারণে দলগুলোর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। আমাদের আমির ঢাকা-৭ আসনে প্রার্থী হতে মনোনয়ন ফরম দাখিল করেছেন। কিন্তু সেখানে অন্য দলের প্রার্থীও জমা দিয়েছেন। কেন্দ্রীয় নেতাদের জন্য আসন ছাড়ার যে ঘোষণা ছিল এখানে তা মানা হয়নি। তবে এখনো আসন সমঝোতা হওয়ার প্রত্যাশায় রয়েছি আমরা। কারণ ইসলামী দলগুলোর এবার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে তা যেন কোনো কারণে নষ্ট না হওয়ায় সেটি সবার খেয়াল রাখা উচিত।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন আহমদ বলেন, আমার আসনে অন্য দলের প্রার্থীর মনোনয়ন ফরম জমা দেয়ার কথা ছিল না। কিন্তু সেখানেও অন্য দলের প্রার্থীরা জমা দিয়েছেন। এ ছাড়া আমরা সম্মানজনক আসন চাই। কিন্তু আমাদের যে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে তা সন্তোষজনক নয়। এ কারণে দলের মধ্যে অসন্তোষ আছে। তবে আমরা এখনো আশাবাদি ১১ দলের যে সমঝোতার চেষ্টা আছে তা যেন অটুট থাকে। এজন্য বড় দল হিসেবে জামায়াতকে ভূমিকা নিতে হবে। আর না হলে তখন ভিন্ন চিন্তা করতে হবে আমাদের।

ঢাকা-১১ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা শেখ ফজলে বারী মাসউদ মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন। ওই আসনে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে ছেড়ে দিয়েছে জামায়াত। তাদের প্রার্থী অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান মনোনয়ন ফরম জমা দেননি। মাওলানা শেখ ফজলে বারী মাসউদ বলেন, সমঝোতা হলে প্রয়োজনে আমরাও এনসিপিকে ছেড়ে দেব। তবে ইসলামী আন্দোলনের আরেক নেতা জানিয়েছেন, এনসিপিকে অর্ন্তভুক্তির বিষয়ে তাদের কাছে আগে মতামত না নেয়ায় নেতারা অসন্তুষ্ট। খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টির কেন্দ্রীয় নেতারাও আসন সমঝোতায় দেরি হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এ ব্যাপারে জামায়াতকে দ্রুত উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখালেখি করছেন। তারা সমঝোতায় দেরির জন্য জামায়াত নেতাদের দায়ি করছেন। গত পরশু তাদের অসন্তোষের কথা জানাতে সংবাদ সম্মেলনেরও ডাক দেয়া হয়। পরে বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করে ইসলামী আন্দোলন। তবে দলটির নায়েবে আমির মুফতি ফয়জুল করিম গণমাধ্যমে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় আসন সমঝোতায় দেরি হওয়ায় তার অসন্তোষের কথা বলেন। অন্য একটি প্রতিক্রিয়ায় তিনি জানান, সারা দেশে তারা ১৪৩ আসনকে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে রেখেছে। অর্থাৎ ১৪৩ আসনে নিজেদের অবস্থান ভালো দেখছে দলটি। তবে জামায়াতের পক্ষ থেকে কম আসন প্রস্তাব করায় দলটির নেতারা অসন্তুষ্ট। এ ছাড়া যেসব এলাকায় চরমোনাই পীরের ভক্ত-অনুরাগী কিংবা সমর্থন বেশি সেসব আসনেও জামায়াত তাদের ছাড় দিচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন তারা। তবে জামায়াতের কর্মী-সমর্থকরাও ইসলামী আন্দোলনের এতবেশি সংখ্যক আসন চাওয়াকে বাস্তব সম্মত নয় বলে মনে করছেন। তারা বলছেন, অতীতে ইসলামী আন্দোলনের কোনো সংসদ সদস্য ছিল না। তাছাড়া তারা জামায়াতের এমন আসন চাচ্ছে যেখানে জামায়াতের বিজয়ী হওয়ার মত প্রার্থী রয়েছে। এ ছাড়া জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতাদের আসনও তারা দাবি করছে। যা জটিলতা আরো বাড়িয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও আন্দোলনরত ৮ দলের সমন্বয়ক সাবেক এমপি হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, সব দলের সাথে আলোচনা চলমান রয়েছে। সমঝোতায় কিছু স্বাভাবিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে মনোনয়ন প্রত্যাহার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, আশা করি এর মধ্যেই সমাধান হয়ে যাবে। সে পর্যন্ত সবাইকে ধর্য ধরার আহ্বান জানান তিনি।