- পার্বত্য অঞ্চলে ৭ পয়েন্ট দিয়ে সশস্ত্রগোষ্ঠীর কাছে ঢুকছে অস্ত্র
- সীমান্তে সক্রিয় প্রায় ১২৮টি শক্তিশালী সিন্ডিকেট
- সমতলেও বেড়েছে অস্ত্রের ব্যবহার
অস্ত্র চোরাচালানের আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক বর্তমানে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই নেটওয়ার্কগুলো মূলত সীমান্ত এলাকা, আঞ্চলিক সঙ্ঘাতপূর্ণ অঞ্চল এবং অপরাধী চক্রের সমন্বয়ে পরিচালিত হয়ে আসছে। গোয়েন্দাদের বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র পাচারের ঘটনা ঘটে। ধারণা করা হয়, প্রায় ৬৩ মিলিয়ন অবৈধ অস্ত্র এই অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে।
যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। এসব অস্ত্র ব্যবহার বেড়েছে সমতলের সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ এমন কি আন্ডারওয়ার্ল্ডের গডফাদার ও কিশোর গ্যাংয়ের হাতে। এর ফলে প্রায় গুলির ঘটনা ঘটছে। বাড়ছে মৃত্যু ও হতাহতের ঘটনা।
জুলাই অভ্যুত্থানের সময়ে বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া বিপুলসংখ্যক আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদের এখনো কোনো হদিস নেই। লুণ্ঠিত অস্ত্র-গোলাবারুদের মধ্যে বেশ কিছু উদ্ধার হলেও এখনো উল্লেখযোগ্য অংশ রয়ে গেছে অপরাধীদের হাতে। পাশাপাশি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র এবং পেশাদার অপরাধীদের অপতৎপরতাও বেড়েছে বলে মনে করেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। ফলে রাজনীতির মাঠে আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা বাড়াচ্ছে এসব অস্ত্র-গোলাবারুদ।
গোয়েন্দাদের তথ্য অনুযায়ী সারা দেশে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ১২৮টি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে অস্ত্র চোরাচালানের সাথে জড়িত। সম্প্রতি চোরাই পথে আসা অস্ত্রের মধ্যে বিদেশী পিস্তল, রিভলভার, ম্যাগাজিন এবং প্রচুর পরিমাণ গোলাবারুদ রয়েছে। সম্প্রতি ৭.৬৫ ক্যালিবারের মতো বিরল এবং অত্যাধুনিক অস্ত্রও জব্দ করা হয়েছে।
ওই সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের প্রধান নেটওয়ার্ক এবং কার্যক্রমের কারণে আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক শক্তিশালী হয়ে উঠায় বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ওপর মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গোয়েন্দাদের মতে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় করিডোর যেমন লাওস, মিয়ানমার এবং থাইল্যান্ডের মধ্যকার নেটওয়ার্কগুলো ক্রমে শক্তিশালী হচ্ছে। তারা সীমান্তবর্তী সিন্ডিকেটের সাথে রাতের অন্ধকার ও প্রতিকূল আবহাওয়া ব্যবহার করে অস্ত্র সরবরাহ করে। ওই সূত্র জানায়, মিয়ানমারের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বিদ্রোহী দলগুলো এই নেটওয়ার্কের প্রধান ব্যবহারকারী।
সীমান্তে অস্থিরতা ও অবৈধ অস্ত্রের প্রবেশ : গোয়েন্দাদের তথ্য বলছে, আঞ্চলিক সন্ত্রাস ও অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক দুর্বলতার পাশাপাশি বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলো বর্তমানে অস্থিতিশীলতা ও অবৈধ অস্ত্রের প্রধান করিডোর হিসেবে কাজ করছে, যা দেশের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জকে বহুমাত্রিক করে তুলেছে। দেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘকাল ধরে বিরাজমান সঙ্ঘাত এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যকার অভ্যন্তরীণ কোন্দল এক ধরনের অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করে রেখেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই দুর্গম পাহাড়ি এলাকাকে ব্যবহার করে আঞ্চলিক বা পাহাড়ি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর অনুপ্রবেশ ও তৎপরতা বাড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এই অঞ্চলের দুর্বল নিয়ন্ত্রণ চরমপন্থীদের জন্য একটি নিরাপদ আস্তানা বা প্রশিক্ষণের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে।
মিয়ানমার সীমান্তের অশান্তি ও চোরাচালানের সুযোগ : মিয়ানমারে চলমান সামরিক সঙ্ঘাত এবং রাখাইন রাজ্যের অস্থিতিশীল পরিবেশের সরাসরি প্রভাব বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় অনুভূত হচ্ছে। সীমান্ত-সংলগ্ন অঞ্চলগুলো থেকে আসা গোলাগুলি ও সঙ্ঘাতের শব্দ একদিকে যেমন স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করছে, তেমনি তা চোরাচালানের জন্য এক মোক্ষম সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মনোযোগ সঙ্ঘাতের দিকে কেন্দ্রীভূত থাকার কারণে বিভিন্ন অপরাধী চক্র এই সুযোগে অস্ত্র, মাদক ও মানব পাচারের মতো অবৈধ কার্যক্রমের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে।
অবৈধ অস্ত্রের চালান এবং অরাজকতার প্রস্তুতি : বিভিন্ন সময়ে দেশের সীমান্ত অঞ্চল ও অভ্যন্তরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে আসা অস্ত্র ও গোলাবারুদের চালান ধরা পড়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে দেশের অভ্যন্তরে অরাজক পরিস্থিতি তৈরির প্রস্তুতি চলছে। গোয়েন্দারা মনে করছেন, এই বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্রশস্ত্রের প্রধান লক্ষ্য হতে পারে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণসহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে। এই চোরাচালানের পথটি অভ্যন্তরীণ সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদের রসদ জোগাচ্ছে, যা পুলিশের অস্ত্রাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের হুমকির সাথে মিশে এক মারাত্মক বিস্ফোরক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশে অবস্থানরত পলাতক সন্ত্রাসী বা রাজনৈতিক নেতারা এই নেটওয়ার্কগুলোর নেপথ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করে।
অস্ত্র প্রবেশের আরো কয়েকটি রুট : আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী অস্ত্রের বড় চালানগুলো দেশে ঢোকে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্ত দিয়ে। এ ছাড়া যশোরের চৌগাছা, ঝিকরগাছা, শার্শা, দর্শনা, শাহজাদপুর, হিজলা, আন্দুলিয়া, মান্দারতলা, বেনাপোল সীমান্তের গোগা, কায়বা, শিকারপুর, দৌলতপুর, দিনাজপুরের হিলি সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্র দেশে ঢুকছে। সীমান্ত এলাকার ঘাটমালিকরা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ঘাট চালান। সাধারণ অস্ত্রের পাশাপাশি অত্যাধুনিক অস্ত্রও তাদের মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করানো হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন থানা থেকে যেসব অস্ত্র লুট হয়েছে, তার ২৫ শতাংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। পাশাপাশি সীমান্ত দিয়েও অবৈধ অস্ত্র দেশে আসছে সেই দাবিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী করছে। একটা সমাজে যত বেশি অবৈধ অস্ত্র থাকবে, তত বেশি অপরাধের ঝুঁকি থাকবে। বিশেষ করে সঙ্ঘাত-সহিংসতা, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তারে আমাদের দেশে অবৈধ অস্ত্র বেশি ব্যবহার হয়। অস্ত্র চোরাচালানের আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক বর্তমানে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তার জন্য। চোরাচালান ঠেকাতে আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর আরো তৎপরতা বৃদ্ধি করতে হবে।
বিজিবির তথ্য : বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ২০২৪ হতে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত এসএমজি-২টি, রাইফেল-১৬টি, রিভলবার-৫টি, পিস্তল- ৯০টি, অন্যান্য ক্যাটাগরির অস্ত্র-১০২টি, গোলাবারুদ-২৩১১টি, ম্যাগজিন-৮১টি, মর্টার শেল-১৩টি, গান পাউডার-২০ কেজি ৫ গ্রাম, গ্রেনেড-২৩টি, ককটেল-১৯৫টি, মাইন-৪টি। এসব ঘটনায় আসামি গ্রেফতার হয়েছেন ৩২ জন। এ ছাড়াও ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত (৫ বছরের) অস্ত্র ও গোলাবারুদ আটকের মধ্যে রয়েছে ২০২১ সালে এসএমজি-১টি, রিভলবার-৪টি, পিস্তল/ওয়ান শুটার-৪৭টি, অন্যান্য ক্যাটাগরির অস্ত্র-৬৪টি, গোলাবারুদ-২২০টি, ম্যাগজিন-৩৮টি, আর্টিলারি মর্টার-৮৬টি, ককটেল-১১টি, গানপাউডার-৪.২ কেজি, সিসা গুলি/সিসা বল-২৫টি।
২০২২ সালে রাইফেল-৯টি, রিভলবার-৫টি, পিস্তল ওয়ান শুটার-৪৩টি, অন্যান্য ক্যাটাগরির অস্ত্র-৭৯টি, গোলাবারুদ-৫৩৫৭টি, ম্যাগজিন-২৯টি, আর্টিলারি মর্টার রকেট সেল-২৬টি, ককটেল-২০টি, গান পাউডার-৬৯৯.৪ কেজি, সিসা গুলি/সিসা বল-৪৫টি। ২০২৩ সালে রিভলবার-১টি, পিস্তল ওয়ান শুটার-৪৮টি, অন্যান্য ক্যাটাগরির অস্ত্র-৫২টি, গোলাবারুদ-১০৭৬টি, ম্যাগজিন-৫৫টি, গ্রেনেড-১টি, আর্টিলারি মর্টার রকেট সেল-৬টি, ককটেল-৯টি, গান পাউডার-৩৭.৪৫০ কেজি, সিসা গুলি/সিসা বল-১০০টি। ২০২৪ সালে এসএমজি-৫টি, রাইফেল-৮টি, রিভলবার-৬টি, পিস্তল ওয়ান শুটার-৩৮টি, অন্যান্য ক্যাটাগরির অস্ত্র-৫২টি, গোলাবারুদ-৮৮৫৯টি, ম্যাগজিন-৪৫টি, গ্রেনেড-১৮টি, আর্টিলারি/মর্টার/রকেট শেল-৪টি, ককটেল-৪১টি, গান পাউডার-১০.৪৪ কেজি।
২০২৫ সালে এসএমজি-২টি, রাইফেল-১০টি, রিভলবার-৩টি, পিস্তল/ওয়ান শুটার-৬৪টি, অন্যান্য ক্যাটাগরির অস্ত্র-৫৬টি, গোলাবারুদ-১৫০৯টি, ম্যাগজিন-৫৭টি, গ্রেনেড-১৯টি, আর্টিলারি/মর্টার/রকেট শেল-৮টি, ককটেল-১৭৮টি, প্রেট্রোল বোম-৪০টি, হাত বোমা-৭৯টি, গান পাউডার-২০.০৫ কেজি, মাইন-৪টি, সিসা গুলি/সিসা বল-৭৩ হাজার ১০০টি।


