যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ বায়োমেডিক্যাল ক্যাম্পাসের রয়্যাল পেপওয়র্থ হাসপাতালের ড. স্টিফেন পেটিট (পিএইচডি, এফআরসিপি, এফআইসিএম) একজন কনসালট্যান্ট হার্ট ট্রান্সপ্ল্যানটেশন (হৃৎপিন্ড প্রতিস্থাপন) সার্জন। এটি যুক্তরাজ্যের ডেডিকেটেড কার্ডিওথোরাসিক ট্রান্সপ্ল্যান্ট হাসপাতাল। ৫০ বছর আগে যুক্তরাজ্যের প্রথম সফল হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্টটি এই হাসপাতালেই করা হয়েছিল। এ ছাড়া এটা এখন ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট হাসপাতাল হিসেবেও পরিচিত। ড. স্টিফেন পেটিট তার হাসপাতালের একটি ট্রান্সপ্ল্যান্ট ইউনিটের প্রধান সার্জন। হাসপাতালটিতে প্রতি বছর ৪০ থেকে ৫০টি হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট হয়ে থাকে। এ ছাড়া হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা যায় যুক্তরাজ্যে ৬টি হাসপাতাল। এই ৬টি হাসপাতালে বছরে গড়ে প্রায় ২০০ হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট হয়ে থাকে। ড. স্টেফেন পেটিট গত ২৫ ও ২৬ মার্চ বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) হার্ট ফেইলিউর বিভাগের ‘আন্তর্জাতিক হার্ট ফেইলিউর সম্মেলনে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। সম্মেলনের প্রথম দিন বিএমইউর সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে নয়া দিগন্তকে একটি সাক্ষাৎকার প্রদান করেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নয়া দিগন্তের বিশেষ সংবাদদাতা হামিম উল কবির।
নয়া দিগন্ত : শুধু যুক্তরাজ্যেই বছরে মিলিয়ন (১০ লাখ) মানুষের হার্ট ফেইলিউর হয়। একটি উন্নত দেশ হিসেবে যুক্তরাজ্যে বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে কেন হার্ট ফেইলিউরের রোগী? যুক্তরাজ্যের হার্ট ফেইলিউরের কারণ কী?
স্টিফেন পেটিট : করোনারি আর্টারি ডিজিজই যুক্তরাজ্যে হার্ট ফেইলিউরের প্রধান কারণ। তরুণদের মধ্যে হার্ট ফেইলিউরের রোগী অপেক্ষাকৃত বেশি দেখা যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ কার্ডিয়াক মায়োপ্যাথি। এটা বেশির ভাগই জেনেটিক কারণে ঘটে থাকে। তরুণ সমাজের মধ্যে যাদের হার্ট ফেইলিউরের ঘটনা ঘটছে এরা এটা বংশগতভাবেই পেয়ে থাকে। আমরা এখন এটা বুঝতে পারছি যে কার্ডিয়াক মায়োপ্যাথি তরুণদের মধ্যে হার্ট ফেইলিউরের প্রধান সমস্যা। সবচেয়ে ভালো মেডিক্যাল থেরাপি অথবা ডিভাইস থেরাপি থাকা সত্ত্বেও কিছু কিছু রোগীর অবস্থার অবনতিও ঘটে যুক্তরাজ্যে। হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্টের রোগীদের জন্য যুক্তরাজ্য একটি নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য দেশ হওয়া সত্ত্বেও হার্টফেইলিউরের রোগীদের বাঁচানো যায় না হার্টের সাপ্লাই ও ডিমান্ডের ভারসাম্যহীনতার কারণে। আমরা এখনো একটি হার্টদাতা গ্রুপ তৈরি করতে পারিনি। ফলে ট্রান্সপ্ল্যান্টের জন্য অপেক্ষা করার সময়টা অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে। এই অপেক্ষার বিষয়টা শুধু হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্টের ক্ষেত্রেই ঘটে না, এটা কিডনি কিংবা লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের ব্যাপারেও একই রকমভাবে অনেক দিন অপেক্ষা করতে হয়।
নয়া দিগন্ত : বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশে কিভাবে হার্ট ফেইলিউর রোগী কিংবা হার্টের রোগীদের সমস্যার সমাধান করতে পারে ?
স্টিফেন পেটিট : যুক্তরাজ্য কিংবা বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের মানুষেরও হার্টের সমস্যা একই রকম। হার্ট ফেইলিউরের রোগী কমিয়ে আনতে কিংবা হার্টের অন্যান্য রোগ কমিয়ে আনতে চাইলে প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে জোরদার করতে হবে। এই কথাটি বাংলাদেশসহ সব দেশের জন্যই প্রযোজ্য। পৃথিবীর সর্বত্রই হার্ট ডিজিজ কিংবা হার্ট ফেইলিউরের অন্যতম প্রধান কারণ ধূমপান, খাদ্যাভ্যাস। এ ব্যাপারে যুক্তরাজ্যের সাথে বাংলাদেশের কোনো পার্থক্য নেই। জনস্বাস্থ্যের দিক থেকে বলতে পারি যে, বাংলাদেশের মানুষ শরীর চর্চা করেন না বললেই চলে। ধূমপান করা এবং শরীর চর্চা না করাই বাংলাদেশ কিংবা পৃথিবীর অন্যান্য দেশে হার্ট ডিজিজের মূল কারণ। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে উচ্চ কলেস্টেরল, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপের রোগী বেশি। এগুলো দ্রুততার সাথে চিহ্নিত করে তাদের চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে। ব্রাজিল হার্ট ফেইলিউরের রোগীদের জন্য একটি ভালো প্রোগ্রাম নিয়ে কাজ করছে। ইন্ডিয়ানরাও আমাদের হাসপাতালে শিখতে আসছে। তারা ধীরে ধীরে উন্নতি করছে। আমাদের হাসপাতাল থেকে শিখে ফিলিপিন্সের চিকিৎসকরাও হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্টের প্রোগ্রাম নিয়েছে। আমার বিশ্বাস তারা ভালো করবে। এটা যে খুব বেশি উচ্চ মূল্যের চিকিৎসা তা নয়, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কলেস্টেরলের সমস্যা সমাধান করা কঠিন কিছু না, এটা সহজেই করা যায়। হার্ট ডিজিজের জন্য ওবেসিটি (স্থূলতা, মোটা হয়ে যাওয়া) অন্যতম আরেকটি সমস্যা। ইউরোপ আমেরিকার মানুষ প্রতিদিন হাঁটে কিন্তু বাংলাদেশে এই অভ্যাসটি খুবই কম। হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। হাঁটা, ব্যায়াম করা হার্ট ডিজিজের প্রকোপ কমিয়ে আনে। আমি লক্ষ্য করেছি, ঢাকা অনেক বেশি ব্যস্ত শহর, এখানে উন্মুক্ত স্থান খুবই কম যেখানে মানুষ হাঁটতে পারে, ব্যায়াম করতে পারে। ঢাকার রাস্তায় এতো বেশি গাড়ি চলে যে মানুষ হাঁটতে পারে না ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও। অন্য দিকে ঢাকার বায়ুদূষণ আরেকটা সমস্যা। বায়ুদূষণ ও করোনারি হার্ট ডিজিজের মধ্যে একটি নিবিড় সম্পর্ক আছে।
নয়া দিগন্ত : যুক্তরাষ্ট্রে পিগহার্ট (শূকরের হৃৎপিণ্ড) দিয়ে মানুষের হার্ট প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্টে পিগহার্ট কী ভূমিকা রাখছে, এ ব্যাপারে চিকিৎসার সর্বশেষ আপডেট কী?
স্টিফেন পেটিট : যুক্তরাষ্ট্রে জেনিটিকেলি মোডিফায়েড পিগহার্ট দিয়ে ট্রান্সপ্ল্যান্ট হয়েছে। কিন্তু যাদের হার্ট, পিগহার্ট দিয়ে ট্রান্সপ্ল্যান্ট করানো হয়েছিল তারা বেশি দিন বেঁচে থাকতে পারেননি। মানুষের দেহ পিগহার্ট গ্রহণ করতে পারেনি, মানুষের শরীর তা প্রত্যাখ্যান করেছে। যাদের এ ধরনের হার্ট প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল তারা ব্রেইন ডেথ পেশেন্ট ছিল। প্রাণী থেকে অঙ্গ নিয়ে মানুষের শরীরে প্রতিস্থাপন করার অনেক সমস্যা থাকে। আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা খুবই দ্রুত পিগ হার্টকে চিনে ফেলে এবং সেটা রিজেক্ট করে দেয়। কারণ মানুষের শরীরের রয়েছে খুবই শক্তিশালী ইমিউন সাপ্রেশন। তা না হলে ইনফেকশনের শিকার হয়ে যায় ওই অঙ্গটি। যাদের পিগহার্ট দিয়ে ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা হয়েছিল তাদের ব্যাপারে বৈজ্ঞানিক জার্নালে বলা হয়েছে, তারা ট্রান্সপ্ল্যান্টের পরপরই ইনফেকশনে আক্রান্ত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে যে কোম্পানি জেনিটিকেল মোডিফয়েড পিগহার্ট (এটা সাধারণ কোনো শূকর নয়) তৈরি করেছিল তারা এ ব্যাপারে যথেষ্ট বিনিয়োগ করেছিল। পিগহার্ট যদি সফলও হতো তাহলেও এটা সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকত না। কারণ তারা যে বিনিয়োগ করেছিল তা উঠিয়ে এনে মুনাফা করার জন্য চেষ্টা করত অথবা করবে। এটা সবার জন্য কল্যাণকর কিছু নয় বা হতো না। এই সুবিধাটা কেবল বিশ্বের ধনী দেশের মানুষের নাগালেই থাকত।
নয়া দিগন্ত : আর্টিফিসিয়াল হার্টের (কৃত্রিম হৃৎপিণ্ড) সর্বশেষ খবর কী ?
স্টিফেন পেটিট : এ ব্যাপারে বলতে পারি যে, অনেক ডিভাইস আছে যেটা মেকানিকেল পাম্পস হিসেবে পরিচিত। মানুষের রক্ত সঞ্চালনের জন্য অনেক অস্থায়ী পাম্প রয়েছে এটা হার্টের রোগীরা ব্যবহার করতে পারেন। যেটা সপ্তাহ বা মাসব্যাপী ব্যবহার করা যায় হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট হওয়া পর্যন্ত। এ ছাড়া টেকসই অনেক পাম্পও আছে রক্ত সঞ্চালনের জন্য। এসব দিয়ে হার্টের রোগী অনেক বছর বেঁচে থাকতে পারেন। যাদের হার্ট আছে (তবে খুব বেশি কার্যকর নয়) এদের ব্যাপারে এসব পাম্প কাজ করে রক্ত সঞ্চালন করে। যারা এসব তৈরি করছে সেসব কোম্পানি টোটাল আর্টিফিসিয়াল হার্টে উন্নীত করতে বিভিন্ন কোম্পানি কাজ করছে। এগুলোও যুক্তরাজ্যের মতো দেশেও অনেক বেশি দামি, সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
নয়া দিগন্ত : নয়া দিগন্তকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
স্টিফেন পেটিট : আপনার মাধ্যমে নয়া দিগন্ত এবং এর পাঠকদের ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাচ্ছি।



