রাজনৈতিক সহিংসতার নতুন ধরন মব সহিংসতা, গণপিটুনি, সাইবার ক্রাইম

সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ এর অপব্যবহার, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা, গণপিটুনি ও মব সন্ত্রাসের ঘটনা বন্ধ হয়নি

দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার নতুন ট্রেন্ড হিসেবে সরাসরি সংঘর্ষের চেয়ে মব সহিংসতা, গণপিটুনি এবং সাইবার বুলিংয়ের মাধ্যমে ভীতি প্রদর্শনের প্রবণতা বেড়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে গুজব ছড়ানো, টার্গেট কিলিং এবং স্থানীয় পর্যায়ে আধিপত্য বিস্তারে পুরনো নিপীড়নের ধরন নতুনরূপে আত্মপ্রকাশ করছে।

জিলানী মিলটন
Printed Edition

বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতার নতুন ট্রেন্ড হিসেবে সরাসরি সংঘর্ষের চেয়ে মব সহিংসতা, গণপিটুনি এবং সাইবার বুলিংয়ের মাধ্যমে ভীতি প্রদর্শনের প্রবণতা বেড়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে গুজব ছড়ানো, টার্গেট কিলিং এবং স্থানীয় পর্যায়ে আধিপত্য বিস্তারে পুরনো নিপীড়নের ধরন নতুনরূপে আত্মপ্রকাশ করছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন (ফেব্রুয়ারি ২০২৬) পরবর্তী সময়ে দেশের অন্তত ৩০টি জেলায় দুই শতাধিক রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ফরিদপুর, কিশোরগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, শেরপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা, ভাঙচুর ও সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। ভোটের পর এক সপ্তাহেই পাঁচজন নিহত ও ২২৬ জন আহত হয়েছেন। এসব ঘটনার বেশ কিছু মব সহিংসতার মাধ্যমে।

মব সহিংসতা বা গণপিটুনি হলো আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে উত্তেজিত জনতা কর্তৃভাজন কোনো ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে শারীরিক নির্যাতন। এটি মূলত ‘মব জাস্টিস’ বা উচ্ছৃঙ্খল গণবিচার হিসেবে পরিচিত, যা প্রচলিত বিচারব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তবে মব সহিংসতা আগের তুলনায় কমে এলেও সহিংসতার ধরণ পাল্টে যাচ্ছে দিনকে দিন। পরিকল্পিত হামলা, নির্যাতন এবং সাইবার বুলিং নিয়ে উদ্বেগ রয়েই গেছে।

তবে মব সহিংসতা বন্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছে বর্তমান সরকার। দেশে মবের মাধ্যমে দাবি-দাওয়া আদায়ের প্রবণতা বন্ধ করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। গত সপ্তাহে সংসদে এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দাবি আদায়ে সড়ক-মহাসড়ক অবরোধের যে প্রবণতা দেখা গিয়েছিল, সেটি আর চলতে দেয়া হবে না।

তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক উপায়ে দাবি-দাওয়া উপস্থাপনের সুযোগ থাকবে, তবে মবের মাধ্যমে কিছু আদায়ের প্রবণতা বন্ধ করা হবে। মন্ত্রী বলেন, সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর এখনো দেড় মাস হয়নি। এই সময়ের মধ্যে মবের মতো কিছু ঘটনা ঘটেছে, তবে সব ঘটনাকে একইভাবে দেখার সুযোগ নেই। এখানে সংজ্ঞা আলাদা করতে হবে। কোনটা মব হবে, কোনটা হবে না। কিছু ঘটনা সংঘটিত অপরাধ, যেগুলোর ক্ষেত্রে মামলা হয়, তদন্ত হয়, গ্রেফতার হয় এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় নেয়া হয়। বাংলাদেশে কোনো রকমের মব কালচার আর থাকবে না।

তিনি বলেন, দাবি-দাওয়া জানাতে গণতান্ত্রিক পথ খোলা থাকবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা দফতরে স্মারকলিপি দেয়া যাবে, জনমত গঠনে সেমিনার-সিম্পোজিয়াম করা যাবে, এমনকি জনসমাবেশও করা যাবে। রাইট টু অ্যাসোসিয়েশন, রাইট টু স্পিচ এগুলো আমরা নিশ্চিত করব। কিন্তু মবের মাধ্যমে যেন আমরা সবাই দাবি আদায়ের প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসি।

বেড়েই চলেছে সাইবার বুলিং :

অপরদিকে দেশে উদ্বেগজনক হারে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন মানুষ। মন্ত্রী, এমপি, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সুশীল সমাজের ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে সমাজের নানা পেশার মানুষ সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন।

সাইবার বুলিং ও গুজব বর্তমানে অত্যন্ত উদ্বেগজনক প্রবণতা, যা ডিজিটাল প্রযুক্তি (সোশ্যাল মিডিয়া, মেসেজিং অ্যাপ) ব্যবহার করে কাউকে হয়রানি, ভীতি প্রদর্শন বা অপমান করার জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি কেবল ভার্চুয়াল জগত নয়, বরং একজন ব্যক্তির বাস্তব সামাজিক জীবন ও মানসিক স্বাস্থ্যকে দুর্বিষহ করে তুলছে। সাইবার বুলিং থেকে রক্ষা পাচ্ছে না স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও।

বিনোদন থেকে শুরু করে পড়াশোনার জন্যও শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনকার সময়ের একটা বড় অংশ কাটে ইন্টারনেটে। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে ইন্টারনেটের পরিসরও এখন অনেক বড়। কৌতুক করার নামে ট্রল, আক্রমণাত্মক মিম, বডিশেমিং, মিথ্যাচার, অনলাইনের দুনিয়ায় দল বেঁধে চেহারা ও অন্যান্য শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে কটু কথা বলা এমন সব ঘটনা বেড়েই চলেছে।

সাইবার ক্রাইম নিয়ে কাজ করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাইবার বুলিং এমন ব্যাপক আকার ধারণ করার পেছনে রয়েছে সামাজিক আর মনস্তাত্ত্বিক কারণ। এ ধরনের হয়রানির সবচেয়ে ভয়ানক ফল হলো মানসিক বিপর্যয়। হতাশা, মানসিক চাপ, হীনম্মন্যতা, আত্মবিশ্বাসহীনতা ও একাকিত্বসহ বিভিন্ন মানসিক রোগে ভোগেন ভুক্তভোগীরা। নিজের ওপর আত্মবিশ্বাসও কমে যায়। যে কারণে তাদের সামাজিক আচরণও বদলে যায়। এগুলো কখনো কখনো প্রতিহিংসার মনোভাব তৈরি করে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক হলো, সাইবার বুলিংয়ের কারণে আত্মহননের পথও বেছে নেন কেউ কেউ।

দেশের সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাইবার অপরাধ রোধে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে কাজ করছে পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট। কিছু আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

এদিকে মব সহিংসতা, গণপিটুনি, সাইবার ক্রাইমসহ বিভিন্ন ঘটনা কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সহিংসতায় দেশে মার্চ মাসে ১৪ জন নিহত হয়েছেন।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) জানিয়েছে, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়েছে। বেশির ভাগ সহিংসতার ঘটনায় সরকারি দল বিএনপির অন্তর্দ্বন্দ্ব ও আধিপত্য বিস্তারের প্রভাব ছিল, যা জনমনে আতঙ্ক তৈরি করছে। সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫-এর অপব্যবহার, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন-পরবর্তী গ্রেফতার, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা, সীমান্তে হত্যা, গণপিটুনি ও মব সন্ত্রাসের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।

সংস্থাটির মতে, জননিরাপত্তায় সরকারের কার্যকর ভূমিকার অভাবে নাগরিকদের মধ্যে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক চর্চা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সমমর্যাদা ও নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।