মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি জুলাই সনদে স্বাক্ষর করলেও বেশ কিছু বিষয়ে তাদের নোট অব ডিসেন্ট দেয়া আছে। এতে জুলাই সনদ ও তার বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখছেন অনেকেই। যদিও সরকার গঠনের পর বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, তার সরকার জুলাই সনদের বাস্তবায়নযোগ্য বিষয়ে উদ্যোগ নেবে। এর আগে ৩০ জানুয়ারি রংপুরের ঐতিহাসিক কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠে বিএনপি আয়োজিত বিভাগীয় জনসভায় তিনি সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেয়ার পাশাপাশি সংস্কারের পক্ষে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-তে রায় দেয়ারও আহ্বান জানিয়েছিলেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বতী সরকার দায়িত্ব নেয়। তারা সংবিধান সংস্কার কমিশনসহ কয়েকটি কমিশন করে। তাদের কাজ শেষ হওয়ার পর করা হয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এর প্রধান ছিলেন ড. ইউনূস নিজে এবং সহসভাপতি করা হয় অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজকে। কমিশন ৩৩টি রাজনৈতিক দলের সাথে বৈঠক করে জুলাই সনদ চূড়ান্ত করে। ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর জুলাই সনদ আদেশ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করে সরকার। আর ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জুলাই সনদ নিয়ে ৪টি প্রশ্নের মাধ্যমে গণভোটও হয়। গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হয়। তবে নির্বাচনের পরপরই দেশের সর্বোচ্চ আদালতে গণভোটের বিরুদ্ধে রিট হয়েছে। জুলাই সনদের কার্যকারিতা স্থগিত চেয়েও আরেকটি রিট হয়েছে। ফলে দেশে জুলাই সনদ ও তার বাস্তবায়ন এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। সংসদের অধিবেশনে এটা নিয়ে আরো বিতর্ক বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক সঙ্কটের শুরু মূলত ত্রয়োদশ সংসদের শপথ গ্রহণের দিন থেকেই। জামায়াত ও এনসিপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও বিএনপির সংসদ সদস্যরা তা করেননি। বিএনপি বলছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার কোনো বিধান সংবিধানে নেই। গণভোটে যে চারটি প্রশ্ন করা হয়েছে, তা নিয়ে অস্পষ্টতারও অভিযোগ আছে। আবার বিএনপি জুলাই সনদে সই করলেও বেশ কিছু বিষয়ে তাদের নোট অব ডিসেন্ট আছে।
জানা গেছে, জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের ঐকমত্যের ভিত্তিতে ৪৭টি সাংবিধানিক সংশোধনী এবং ৩৭টি প্রশাসনিক/আইনি পরিবর্তন বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত ছিল। তবে এর পক্ষে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে এখনো আসেনি। তবে বিরোধী দলগুলো বলছে, তারা আংশিকভাবে জুলাইসনদ বাস্তবায়ন মেনে নিবে না। কারণ ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনগণ গণভোটে হ্যা বিজয়ী করেছে। তাই জন রায় মেনে জুলাই সনদের পুরোটাই বাস্তবায়ন করতে হবে বলে দাবি তাদের।
জানা গেছে, রাষ্ট্রীয় মূলকাঠামো অক্ষুণœ রেখে জুলাই সনদের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে বেশ কিছু সংস্কার করতে চায় বিএনপি সরকার। মূলত রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ, প্রধানমন্ত্রীর দুই মেয়াদের সীমা নির্ধারণ, বিচারক নিয়োগে নতুন নীতি, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা এবং স্বায়ত্তশাসন প্রদান, মৌলিক অধিকারের পরিধি বাড়ানোসহ কিছু প্রস্তাব বাস্তবায়নে আগ্রহী। তবে উচ্চকক্ষ গঠন, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব প্রথা প্রধানমন্ত্রী ও দলের প্রধানের পদ পৃথক করা এবং সংবিধানের কিছু মৌলিক সংশোধনী নিয়ে বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে। রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতার বিধানের বিষয়েও অধিকাংশ দল একমত, তবে এতে বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। সংসদের নারী প্রতিনিধিত্ব পর্যায়ক্রমে ১০০-তে উন্নীত করার বিষয়ে সব দল ঐকমত্যে পৌঁছেছে। সংবিধান বিলুপ্তি ও স্থগিত করার বিষয়ে ২৯টি রাজনৈতিক দল একমত হলেও ভিন্নমত তিনটি দলের। সংসদের সংখ্যানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠনে ভিন্নমত বিএনপিসহ সাতটি রাজনৈতিক দল ও জোটের।
বিএনপি জানিয়েছে, চূড়ান্ত হওয়া ৮৪টি সংস্কারের সবকিছু বাস্তবায়নযোগ্য নয় এবং অনেকগুলো প্রস্তাব সংবিধান পরিপন্থী। তাই সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হবে এমন কোনো মৌলিক সংস্কার তারা চায় না।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির বলেন, বিএনপি যে সংবিধানের দোহাই দিচ্ছে তাহলে প্রশ্ন গণভোট কি সংবিধানে ছিল, জুলাই অভ্যুত্থান কি সংবিধানে ছিল, অন্তর্বর্তী সরকার কি সংবিধানে ছিল, ২০২৬ সালের ১২ জুলাইর সংসদ নির্বাচন কি সংবিধানে ছিল? মূল প্রশ্ন সংবিধানের নয়, তারা মেজরিটির জোর দেখাচ্ছেন। তারা গায়ের জোরে আইন মানছেন না। তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী হ্যাঁ ভোটের প্রচার করেছেন। তাহলে তারা আইনের একাংশ মানছেন, আরেক অংশ মানছেন না। যে আইন তাদের পছন্দ হবে সেটা তারা মানবেন, যেটা পছন্দ হবে না সেটা তারা মানবে না- এটাই হলো তাদের অবস্থান ।
সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের লিগ্যাল অ্যাডভাইজার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেন, আমার মনে হয় ওনারা (বিএনপি) ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। তারা বলছেন এটা ওটা সংবিধানে নেই। কিন্তু সংবিধান তো দেশের জনগণের ওপরে না। জনগণ সব কিছুর ওপরে, জনগণ সংবিধানেরও ওপরে। জনগণ চাইলে সংবিধান বাতিল করে নতুন সংবিধান করতে পারে। এটা তো কোনো আসমানি কিতাব না যে পরিবর্তন করা যাবে না। পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ দেশে নতুন সংবিধান করা হয়েছে। তিনি বলেন, জনগণ সংবিধান সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। এখন যদি সংবিধানের দোহাই দেয়া হয় তাহলে তো তারা জন-আকাক্সক্ষার বিরুদ্ধে গেলেন। তিনি বলেন, এই অবস্থায় রাজনৈতিক সঙ্কট তৈরি হতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশ বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের দায়িত্ব সম্পূর্ণ নির্ভর করছে বিএনপির ওপর। যদিও ঐকমত্য কমিশনে সব দল প্রস্তাব বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে। তারা আরো বলছেন, জুলাই সনদে আছে ৭ দফা অঙ্গীকার। জুলাই সনদে স্বাক্ষর করায় বিএনপি এই অঙ্গীকারনামা মানতেও অঙ্গীকারবদ্ধ। জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে প্রথম অঙ্গীকারনামায়।
গত ১০ মার্চ সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতি অডিটোরিয়ামে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম আয়োজিত ইফতার মাহফিলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে বিএনপি অঙ্গীকারবদ্ধ এবং এটা রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল। যারা বিএনপির সমালোচনা করছে
তারাই পরে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছেন। বিরোধী দল সংবিধান নিয়ে গায়ের জোরে বক্তব্য দিচ্ছেন। বিএনপি সংবিধান মেনেই এ পর্যন্ত চলছে। আগামীতেও চলবে।
বিএনপির একাধিক নেতার সাথে আলাপকালে জানা গেছে, গণভোটে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে রায় এলেও বিএনপি চায় সনদ বাস্তবায়নে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংসদই নেবে। নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া দল বিএনপি মনে করে, সংসদের সিদ্ধান্তই সনদ বাস্তবায়নের আইনি ভিত্তি দিতে পারে। সনদে সন্নিবেশিত প্রত্যেকটি ইস্যু সংসদে আলোচনা করে জনগণকে জানিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার বিকল্প নেই বলে মনে করে বিএনপি। দলটির নেতারা বলছেন, জুলাই জাতীয় সনদের সবকিছু বাস্তবায়নের যৌক্তিকতা নেই। সনদে বেআইনি ও সংবিধান পরিপন্থী অনেক বিষয় সন্নিবেশিত করা হয়েছে। সংস্কার কমিশনের সংলাপে অনেক ইস্যুতে আপত্তি জানিয়ে বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। চূড়ান্ত করা জুলাই জাতীয় সনদে সব ‘নোট অব ডিসেন্ট’ তুলে দেয়া হয়েছে। তাই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নতুন সংসদই নেবে।


