বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংগঠিত গুমের ঘটনাবলি তদন্ত ও প্রতিকারের লক্ষ্যে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক জারি করা ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ’ সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বাতিল করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের সংশোধনীর মাধ্যমেই গুমের বিচার সম্ভব, তাই পৃথক অধ্যাদেশের প্রয়োজন নেই। তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে জনমনে এবং আইনি মহলে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। অধ্যাদেশটি কি সত্যিই অপ্রয়োজনীয় ছিল, নাকি এর বাতিলের ফলে গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারগুলো নতুন কোনো আইনি অনিশ্চয়তায় পড়ল? এই স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিজেদের আইনি বিশ্লেষণ ও ভিন্নধর্মী মতামত তুলে ধরেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম এবং সুপ্রিম কোর্টের দুই বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া ও শিশির মনির। নিচে তাদের বিস্তারিত সাক্ষাৎকারগুলো তুলে ধরা হলো:
গুম অধ্যাদেশটি বাতিল হওয়া প্রসঙ্গে নিজের আইনি বিশ্লেষণ ও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনির।
তার মতে, এই অধ্যাদেশটি অপ্রয়োজনীয় বলার কোনো সুযোগ নেই এবং এর বাতিল গুমের মতো গুরুতর বিষয়কে হালকা করে দেখার শামিল।
প্রশ্ন : সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনেই গুমের বিচারের সুযোগ আছে, তাই আলাদা অধ্যাদেশের প্রয়োজন নেই। এই যুক্তিটি আইনিভাবে কতটা সঠিক?
শিশির মনির : এখানে আইনের একটি বড় ধরনের ভুল ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে। যারা বলছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনেই গুমের বিচারের যথেষ্ট এখতিয়ার আছে এবং অতিরিক্ত আইনের প্রয়োজন নেই- তাদের এই বক্তব্য সঠিক নয়। কারণ, আন্তর্জাতিক আইনে কেবল সেই গুমগুলোরই বিচার করা সম্ভব, যেগুলো পদ্ধতিগতভাবে এবং ব্যাপক মাত্রায় সংগঠিত হয়েছে। অর্থাৎ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের সংজ্ঞায় পড়ে এমন গুমগুলোই কেবল সেখানে বিচার্য।
প্রশ্ন : তাহলে বিচ্ছিন্ন বা এককভাবে ঘটা গুমের ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে বিচার পাওয়ার পথ কী?
শিশির মনির : ঠিক এই জায়গাটির জন্যই ‘গুম অধ্যাদেশ’-এর বাস্তবায়ন জরুরি ছিল। আন্তর্জাতিক আইনে তো সব ধরনের গুমের বিচার করা যাবে না। তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়- ব্যক্তিগত বা বিচ্ছিন্নভাবে যেসব গুমের ঘটনা ঘটে, সেগুলোর বিচার কিভাবে সংগঠিত হবে? সাধারণ ফৌজদারি আইনের সীমাবদ্ধতা দূর করতে এবং একক প্রতিটি গুমের ঘটনার তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতেই এই বিশেষ অধ্যাদেশের প্রয়োজনীয়তা ছিল।
প্রশ্ন : এই অধ্যাদেশটি বাতিল করার ফলে বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কি?
শিশির মনির : অবশ্যই পড়বে। এই আইনটিকে ইগনোর করা বা বাতিল করার মানে হলো পুরো গুমের বিষয়টিকে অত্যন্ত হালকাভাবে দেখা। এর ফলে একটি আইনি সুরক্ষা কবচ হারিয়ে গেল। প্রতিটি গুমের ঘটনার জন্য সুনির্দিষ্ট বিচারের যে সুযোগ এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে তৈরি হয়েছিল, সেটি এখন বাধাগ্রস্ত হবে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের যে আকাক্সক্ষা নিয়ে আমরা এগোচ্ছি, এমন সিদ্ধান্ত সেই প্রক্রিয়ার জন্য মোটেও ইতিবাচক নয়।



