- নির্যাতনের শিকার ৬৭০ নারী ও কন্যাশিশু
- মব সহিংসতায় নিহত ৪৯ আহত ৮০
- নির্যাতন ও হয়রানির শিকার ১৮৩ সাংবাদিক
চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি থেকে মার্চ) সারা দেশে রাজনৈতিক ও নির্বাচন-পরবর্তী ৬১০টি সহিংসতার ঘটনায় ৩৬ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের চার হাজার ৭৮ জনের বেশি নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি’ (এইচআরএসএস) এ তথ্য জানিয়েছে।
সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, সহিংসতার ঘটনায় নিহত ৩৬ জনের মধ্যে বিএনপির ২৮ (৭৮%) জন, জামায়াতের চার (১১%) জন, আওয়ামী লীগের একজন ও অন্যান্য তিনজন। সহিংসতার ঘটনার ৫৭৩টিই (৯৪%) ঘটেছে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ও বিএনপির সাথে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে।
এদিকে গত তিন মাসে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ১৯৪টি ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত এক হাজার এক হাজার ৫৮৫ জন ও নিহত ২৪ জন। বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে ২৬০টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন এক হাজার ৬৫৪ জন ও নিহত হয়েছেন সাতজন। অন্য দিকে ৩৬টি বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় আহত হয়েছেন ২১৯ জন এবং নিহত হয়েছেন তিনজন। এ ছাড়া ২৩টি বিএনপি-এনসিপি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ২০৪ জন, আওয়ামী লীগ-এনসিপির মধ্যে তিনটি সংঘর্ষের ঘটনায় আহত ৫১ জন, ৬০টি বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১৬৯ জন। এ ছাড়া বিভিন্ন দলের মধ্যে ৩৪টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ১৯৬ জন এবং নিহত হয়েছেন দু’জন। এর পাশাপাশি দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অন্তত ৩৪টি ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় বিএনপির ১২ জন, আওয়ামী লীগের চারজন, জামায়াতের তিনজন ও অন্যান্য দলের তিনজনসহ মোট ২২ জন নিহত হয়েছেন।
প্রতিবেদনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্রিক সহিংসতার তথ্য উল্লেখ করে আরো বলা হয়, গত তিন মাসে নির্বাচনকেন্দ্রিক ৩৯৫টি সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১২ জন এবং আহত হয়েছেন দুই হাজার ৫৭৩ জন। এ ছাড়া নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ৬০০টিরও বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর ও নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
নিহত ১২ জনের মধ্যে বিএনপির আটজন, আওয়ামী লীগের একজন, জামায়াতের দু’জন এবং রাজনৈতিক পরিচয় অজানা একজনের।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ১১৯টি ঘটনায় অন্তত ৯০৫ জন আহত এবং আটজন নিহত হয়েছেন। বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে ২৩১টি ঘটনায় অন্তত এক হাজার ৪২৪ জন আহত এবং তিনজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া বিএনপি-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষে তিনটি ঘটনায় তিনজন আহত ও একজন নিহত হয়েছেন। বিএনপি-এনসিপি সংঘর্ষে ১৬টি ঘটনায় ১৪১ জন আহত হয়েছেন এবং বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে ১৭টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৬৩ জন। অন্যান্য দলের মধ্যে সংঘটিত ১০টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩৮ জন।
এ ছাড়া নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত ৩ মাসে অন্তত ১২টি ঘটনায় কমপক্ষে ১৮ জন নারী হেনস্তার শিকার হয়েছেন এবং ছয়জন নারী আহত হয়েছেন। হেনস্তার শিকারদের মধ্যে ১৭ জন জামায়াত সমর্থক এবং একজন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সমর্থক নারী রয়েছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ১২টি ঘটনার মধ্যে ১১টিতে বিএনপি ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের এবং একটিতে জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
রাজনৈতিক মামলা ও আটকের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মী এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ধারায় কমপক্ষে ৭৬টি মামলা হয়েছে। এ সব মামলায় এক হাজার ৮৫০ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ২১ হাজার ৭৪ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
এ সময়ে রাজনৈতিক মামলায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী অন্তত ৪৩৬ জন, বিএনপির নেতাকর্মী ৩১৪ জন এবং জামায়াতের ৭৬ জন, এনসিপির ১৭ জন গ্রেফতার হয়েছে।
এ ছাড়া এই সময়ে সারা দেশে যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযানে ছয় সহস্রাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মী।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত তিন মাসে ১৭টি সভা ও সমাবেশ আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা প্রদান করে। এতে ২০৪ জন ব্যক্তি আহত হন, যাদের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ পথচারীও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
এই সময়ে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫-এর বিভিন্ন ধারার অধীনে পৃথক সাতটি মামলায় ৩৪ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে চারজনকে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট দেয়ায় দু’জনকে আটক করা হয়েছে। অন্যান্য রাজনৈতিক ব্যক্তির সমালোচনায় নিহত একজন, আহত একজন, আটক একজন ও চারটি মামলা হয়েছে। এ ছাড়া পাঁচজনকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও কুরআন অবমাননার অভিযোগে আটক করা হয়েছে, এসব ঘটনায় দু’টি মামলা দায়ের ও একজন আহত হয়েছে।
উল্লিখিত, সময়ে ৮২টি হামলার ঘটনায় ১৮৩ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১২২ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ২০ জন, হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ২১ জন সাংবাদিক। দু’জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ-২০২৫ এর অধীনে আটজন সাংবাদিককে আসামি করে পৃথক দু’টি মামলা হয়েছে।
মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত তিন মাসে গণপিটুনি ও মব সহিংসতায় সারা দেশ চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাগি¦তণ্ডা, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননাসহ নানা অভিযোগে ৮৮টি ঘটনায় ৪৯ জন নিহত ও ৮০ জন আহত হয়েছেন।
সংখ্যালঘু নির্যাতন ও মন্দিরে হামলার ঘটনার উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ২৭টি হামলার ঘটনায় ৩১ জন আহত হয়েছেন, এবং চারটি মন্দির, দু’টি প্রতিমা ও ১৯টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়াও জমি দখলের তিনটি ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির ১০টি ঘটনা ঘটেছে।
সীমান্তে হতাহত ও আটকের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে এইচআরএসএসের প্রতিবেদনা বলা হয়, গত তিন মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ১৩টি হামলার ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরী বাহিনীর (বিএসএফ) হামলায় একজন নিহত হয়েছে। এ ছাড়া ১১ জন আহত হয়েছে, এর মধ্যে গুলিবিদ্ধ চারজন। এ ছাড়া ১৫ জনকে বিভিন্ন সীমান্ত থেকে আটক করা হয়েছে।
অপর দিকে মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে ১১টি সহিংসতার ঘটনায় একজন নিহত, পাঁচজন আহত, গুলিবিদ্ধ চারজন এবং ৩২ জনকে আটক করা হয়েছে।
বিচার বহির্ভূত হত্যার (হেফাজতে/নির্যাতনে/গুলি/বন্দুকযুদ্ধে মৃত্যু) বিষয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজত, নির্যাতন, গুলিবর্ষণ এবং কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধ’র ঘটনায় সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হেফাজতে ও নির্যাতনের শিকার হয়ে পাঁচজন, গুলিবিদ্ধ হয়ে একজন এবং বন্দুকযুদ্ধে একজন নিহত হয়েছেন।
কারা হেফাজতে মৃত্যুর বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে সারা দেশে কারাগারে কমপক্ষে ৩৯ জন আসামি মারা গিয়েছেন। ৩৯ জনের মধ্যে ১৬ জন কয়েদি ও ২৩ জন হাজতি। এর মধ্যে ১২ জন আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের এবং ২৭ জন সাধারণ কয়েদি।
শ্রমিক নির্যাতনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত তিন মাসে ১৩৯টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় ৩০ জন নিহত ও ৫৭৩ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে ও দুর্ঘটনায় ৭২ জন শ্রমিক তাদের কর্মক্ষেত্রে মারা গেছেন। এ ছাড়া দু’জন গৃহপরিচারিকা নিহত ও একজন আহত হয়েছে।
গত তিন মাসে নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের তথ্য উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত তিন মাসে ৬৭০ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৪৭ জন, যাদের মধ্যে ৭৬ জন (৫২%) ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। এটা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে, ৩৯ জন (২৭%) নারী ও কন্যাশিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৯ জনকে। ধর্ষিত হয়ে আত্মহত্যা করেছেন একজন।
১৮০ জন নারী ও কন্যাশিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন তন্মধ্যে শিশু ৪২ (২৩%) জন। এ ছাড়া যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত চার, আহত হয়েছেন আটজন নারী। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ১৩৬ জন, আহত হয়েছেন ৯৬ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ৩০ জন নারী। এ ছাড়া এসিড সহিংসতায় আহত হয়েছেন এক নারী।
অন্য দিকে এটি উদ্বেগজনক যে, ৩২৮ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন যাদের মধ্যে ১৩৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১৯০ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক, মানবাধিকার সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদের সাথে গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি, যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দৃঢ় হয় এবং মানুষের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
তিনি আরো বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতা, মব সহিংসতা, কারাগার ও হেফাজতে মৃত্যু, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ- এসব বিষয় সমাধান করা না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরো অবনতির দিকে যেতে পারে।
এ সময় সরকারের প্রতি মানবাধিকার রায় আরো জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি সব নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতি এইচআরএসএসের পক্ষ থেকে অধিক সোচ্চার ও সক্রিয় ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানান তিনি।



