পাচার হওয়া হাজার হাজার কোটি টাকা ফেরাতে তৎপরতা

এপ্রিলের মধ্যেই বিদেশী আইনি প্রতিষ্ঠানের সাথে নতুন এনডিএ চুক্তির নির্দেশ

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

দেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম ও ঋণের নামে অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় এবার বড় ধরনের পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিশেষ করে পাঁচটি ইসলামী ধারার ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচারের ঘটনা চিহ্নিত হওয়ার পর সেই অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। চলতি এপ্রিল মাসের মধ্যেই বিদেশী আইনি সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে নতুন করে একাধিক অপ্রকাশযোগ্য (এনডিএ) চুক্তি করার নির্দেশ দিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।

গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এসব নির্দেশনা দেয়া হয়। বৈঠকে সম্প্রতি দুর্বল ব্যাংকগুলোতে নিয়োগ পাওয়া প্রশাসকরা উপস্থিত ছিলেন। গভর্নর স্পষ্টভাবে জানান, ঋণের নামে যেসব অর্থ আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে, তা ফেরত আনার জন্য আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। একই সাথে ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনে সেগুলোকে সচল করাও সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।

তথ্য অনুযায়ী, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক কাঠামোর আওতায় থাকা পাঁচটি ব্যাংকের মধ্যে চারটিÑ সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়ে আসছিল। এই গ্রুপটি বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে বলে চিহ্নিত হয়েছে। অন্য দিকে এক্সিম ব্যাংক পরিচালিত হতো আরেকটি শিল্পগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে, যাদের ঋণের পরিমাণ ৯ হাজার ২১৪ কোটি টাকা।

এই দুই গোষ্ঠীসহ মোট ছয়টি গ্রুপের মাধ্যমে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে ইতোমধ্যে ১০টি ব্যাংক ৩৬টি এনডিএ চুক্তি করেছে বিদেশী বহুজাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানের সাথে। এ ছাড়া আরো ২৩টি নতুন চুক্তির প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এসব চুক্তির মাধ্যমে বিদেশে থাকা সম্পদের অবস্থান শনাক্ত করা, আইনি দাবি উত্থাপন এবং অর্থ পুনরুদ্ধারের পথ তৈরি করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত এই পাঁচটি একীভূত ব্যাংকের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯৬ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণই ১ লাখ ৬৫ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৮৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। এত উচ্চ খেলাপি হার দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে।

ব্যাংকভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ইউনিয়ন ব্যাংকের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। ব্যাংকটির মোট ২৮ হাজার ১৭ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ৯৭ দশমিক ৬৪ শতাংশই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৬২ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ৯৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ খেলাপি। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি হার ৯৬ দশমিক ২৭ শতাংশ। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে ৩৮ হাজার ৩৮১ কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে খেলাপি ৩৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে থাকলেও এক্সিম ব্যাংকেরও ৫৩ হাজার ৪৯১ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ৬২ দশমিক ৪৫ শতাংশ খেলাপি হয়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর সুশাসন নিশ্চিত না করলে এই সঙ্কট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। প্রশাসকদের সক্রিয় ভূমিকা, কঠোর নজরদারি এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ধীরে ধীরে আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক যৌথভাবে এই সঙ্কট মোকাবেলায় কাজ করছে। বিদেশী আইনি সহায়তার মাধ্যমে সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং অভ্যন্তরীণ সংস্কারের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।

সবমিলিয়ে ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এনডিএ চুক্তি সম্পন্ন করে কত দ্রুত পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়।