বাংলাদেশ ক্রিকেটে নতুন নির্বাচক প্যানেলের জন্য শুরুটাই যেন অগ্নিপরীক্ষা। হাবিবুল বাশার সুমনের নেতৃত্বে দায়িত্ব পাওয়া এই কমিটির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দলকে ভারসাম্যপূর্ণ ও কার্যকর করে তোলা। বিশেষ করে ওপেনিং জুটি নিয়ে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা এখনো কাটেনি। নিয়মিত পারফরম্যান্স দিতে না পারা ওপেনারদের কারণে শুরুতেই চাপে পড়ে যায় দল, যার প্রভাব পড়ে পুরো ইনিংসে।
নির্বাচকদের এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ধারাবাহিক পারফরমার খুঁজে বের করা এবং তরুণদের সঠিকভাবে গড়ে তোলা। একই সাথে অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের সাথে নতুনদের সমন্বয় ঘটানোও বড় চ্যালেঞ্জ। কন্ডিশনভিত্তিক দল নির্বাচন, ফর্ম ও ফিটনেস বিবেচনা, সবকিছু মিলিয়ে নিতে হবে সূক্ষ্ম সিদ্ধান্ত।
আরেকটি বড় চাপ আসছে সমালোচনার দিক থেকে। সাম্প্রতিক সময়ে বোর্ড ও দল নির্বাচনে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ায় নির্বাচকদের প্রতিটি সিদ্ধান্তই থাকবে কড়া নজরে। তাই শুধু দল গঠনই নয়, নিজেদের সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা প্রমাণ করাও জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে এই নতুন নির্বাচক প্যানেলের জন্য সময়টা সহজ নয়। তবে সঠিক পরিকল্পনা, সাহসী সিদ্ধান্ত এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে তারাই পারে বাংলাদেশের ক্রিকেটে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে।
নির্বাচকদের এমন এক ব্যাটিং ইউনিটকে পরিচর্যা করতে হবে, যেখানে প্রতিটি পজিশন থাকবে নি-িদ্র। যেখানে নিয়মিত একাদশের পাশাপাশি ড্রেসিংরুমে তৈরি থাকবে যোগ্য ও কার্যকর বিকল্প ক্রিকেটার। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপে, বিশেষত ওডিআই সংস্করণে স্থিতিশীলতা যেন এখন এক সোনার হরিণ। দলের এই অস্থিরতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান। এই সময়ে ওয়ানডেতে বাংলাদেশ মোট ২২টি ভিন্ন ওপেনিং জুটি ব্যবহার করেছে। আর এই অন্তহীন পরীক্ষা-নিরীক্ষার যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে সবচেয়ে বড় শিকারে পরিণত হয়েছেন সৌম্য সরকার।
২০১৪ সালে রাজকীয় অভিষেকের পর থেকে দলের কাঠামোতে থিতু হতে না পারা সৌম্যর ক্যারিয়ার যেন এক গোলকধাঁধা। গত পাঁচ বছরেই তিনি চারটি ভিন্ন ওপেনিং জুটির অংশ ছিলেন। গত বছরের অক্টোবরে ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৮৬ বলে ৯১ রানের সেই বিধ্বংসী ও ম্যাচ জেতানো ইনিংসটিও তাকে জাতীয় দলে শুভেচ্ছা জানাতে পারেনি।
পাকিস্তান সিরিজে তিন ম্যাচেই ইনিংসের সূচনা করেছেন সাইফ হাসান ও তানজিদ হাসান তামিম। সাইফ রানের দেখা না পেলেও বাংলাদেশ ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জয় করায় ‘উইনিং কম্বিনেশন’ ভাঙার চিরাচরিত অনীহা সৌম্যর সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়। ফলে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে আসন্ন সিরিজেও তার একাদশে ফেরার পথটা বেশ কণ্টকাকীর্ণ।
৩৩ বছর বয়সী এই ক্রিকেটারের জাতীয় দলে সুযোগ আসা-যাওয়ার চিত্রটি অনেকটা ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’ খেলার মতোই অনিশ্চিত। এমনকি এক সময় তাকে ৭ নম্বর পজিশনে পাঠিয়েও পরখ করা হয়েছে। তবে দায়টা সৌম্যরও কম নয়। এক নির্বাচক আক্ষেপ করে বলেন, ‘সৌম্য এমন এক প্রতিভার নাম, যার দলের মূল ব্যাটিং স্তম্ভ হওয়ার কথা ছিল। তার মতো সামর্থ্যবান খেলোয়াড়কে ছাড়া দল গঠনের ভাবনা আসাটাই ছিল অবিশ্বাস্য। কিন্তু আফসোস, তিনি নিজের জায়গাটা আগলে রাখতে পারেননি।’
একজন স্বীকৃত ওপেনারকে ৭ নম্বরের মতো পজিশনে নামিয়ে দেয়া বাংলাদেশ ক্রিকেটের গভীর কোনো সঙ্কটেরই বহিঃপ্রকাশ। সৌম্যরও বুক চিতিয়ে বলা যে, তিনি ওই পজিশনে খেলবেন না। আত্মবিশ^াসের ঘাটিিত থেকে যা সৌম্য বলতে পারেননি। মুশফিকুর রহীম ও মাহমুদুল্লাহর মতো অভিজ্ঞদের প্রস্থানে মিডল অর্ডারের রিক্ততা এখন আরো প্রকট। জাকের আলী, মাহিদুল ইসলাম কিংবা শামীম হোসেনদের ব্যর্থতায় রিজার্ভ বেঞ্চে নতুন কোনো আশার আলো না থাকায় ম্যানেজমেন্টকে আবার সেই পুরনো ও ব্রাত্য নামগুলোর কাছেই ফিরে যেতে হচ্ছে।
আফিফ হোসেন পাকিস্তান সিরিজ দিয়ে ওডিআইতে প্রত্যাবর্তন করেছেন। অন্য দিকে কোচ ফিল সিমন্সের বিশেষ আগ্রহে ক্যাম্পে ডাকা হয়েছে মোসাদ্দেক হোসেনকে, যিনি ২০২২ সালের পর দেশের জার্সিতে কোনো সংস্করণেই খেলার সুযোগ পাননি। এই ৩০ বছর বয়সী অলরাউন্ডারের ওপরও সতর্ক নজর রাখছেন নির্বাচকরা।



