- লুটেরাদের ফেরার পথ খোলায় অস্থির ব্যাংকিং খাত
- মাত্র ৭.৫ শতাংশ টাকা জমা দিলেই দুর্বল ব্যাংকের মালিকানায় ফেরার সুযোগ
- শঙ্কায় আমানতকারী ও বিশ্লেষকরা
দেশের ব্যাংকিং খাতে বহুল আলোচিত ব্যাংক রেজুলেশন আইন পাসের শেষ মুহূর্তে এমন একটি ধারা যুক্ত হয়েছে, যা নিয়ে আর্থিক খাতজুড়ে তীব্র বিতর্ক ও গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আইনটির ১৮(ক) ধারা এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত, কারণ এই বিধানের মাধ্যমে একীভূত হওয়া বা রেজুলেশন প্রক্রিয়ায় যাওয়া দুর্বল ব্যাংকগুলোর সাবেক শেয়ারহোল্ডার ও মালিকদের আবারো মালিকানায় ফিরে আসার আইনি পথ খুলে দেয়া হয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে- যেসব ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অনিয়ম, ঋণ লুটপাট, জালিয়াতি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে ব্যাংকগুলো ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিল, তারাই কি আবার সেই ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসতে পারবেন? নতুন আইনের ভাষ্য অনুযায়ী, উত্তর হচ্ছে- হ্যাঁ পারবেন। আর সেখানেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় জনশঙ্কা। বিশ্লেষকদের ভাষায়, এটি শুধু একটি আইনি সংশোধনী নয়; বরং ব্যাংক খাতে অতীতের লুটপাটে দায়ীদের ‘ফেরার সিঁড়ি’ তৈরি করা হয়েছে।
শেষ মুহূর্তে যুক্ত হলো বিতর্কিত ধারা
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশের মূল খসড়ায় ১৮(ক) ধারা ছিল না। সংসদে বিলটি তোলার ঠিক আগে, ৯ এপ্রিল রাতে এই ধারা নতুন করে সংযোজন করা হয়। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে কার্যত পাশ কাটানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সকালে বিষয়টি জানতে পেরে তারা অর্থ মন্ত্রণালয়কে বিতর্কিত ধারা না রাখার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, এই বিধান ভবিষ্যতে দুর্বল ব্যাংক সংস্কারের পুরো প্রক্রিয়াকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে। এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যারা ব্যাংক ডুবিয়েছে, তাদের ফেরার রাস্তা এত সহজ করে দিলে রেজুলেশন প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্যই নষ্ট হয়ে যাবে। এই মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়, ধারা সংযোজনের পেছনে কতটা অস্বস্তি ছিল নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অপর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এই আইনের কারণে আগের মালিকরা খুব সহজেই আবার ব্যাংকের মালিক হতে পারবেন। কারণ, সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক যে মোট টাকা দিয়েছে, তার মাত্র ৭.৫ শতাংশ জমা দিলেই তারা নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে পারেন। আর আমাদের দেশে একবার কেউ মালিকানা পেলে পরে তাকে সরানো কঠিন হয়। শুরুর দিকে বিরোধীদল কোনো পরিবর্তন ছাড়াই আইনটি পাসে রাজি ছিল। কিন্তু পরে বিষয়টি ভালোভাবে দেখার জন্য একটি কমিটি করা হয়। গত ১ এপ্রিল ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়, যেখানে অর্থ মন্ত্রণালয়, আইন বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা ছিলেন। আগের অধ্যাদেশে ৯৮টি ধারা ছিল, যা কমিয়ে ৭৪টি করার প্রস্তাব দেয়া হয়। কম গুরুত্বপূর্ণ ২৪টি ধারা বাদ দিয়ে পরে আলাদা নিয়মে রাখার কথা বলা হয়, যাতে আইনটি সহজ হয়। এ ছাড়া কিছু ভুল-ত্রুটি ঠিক করে সংশোধিত খসড়া সরকারকে দেয়া হয়। তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, সবচেয়ে বিতর্কিত ১৮(ক) ধারাটি আগে ছিল না; সংসদে তোলার আগেই এটি নতুন করে যোগ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কমিটি গঠনের পর থেকে একটি পক্ষ এই ধরনের ধারা যুক্ত করার প্রস্তাব দেয়। তবে, অধিকাংশ সদস্য এতে আপত্তি জানান, তাই চূড়ান্ত খসড়ায় এটি রাখা হয়নি। কিন্তু বিল পাসের ঠিক আগে, ৯ এপ্রিল রাতে এই ধারা যুক্ত করার বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক জানতে পারে। পরের দিন সকালে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থ মন্ত্রণালয়কে এটি না করার অনুরোধ জানায়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, যদি নতুন এই ধারাটি যোগ করতেই হতো, তবে সেখানে আরো কঠোর শর্ত থাকা প্রয়োজন ছিল। বিশেষ করে যাদের কারণে ব্যাংকগুলো সঙ্কটে পড়েছে, তাদের মালিকানায় ফেরার পথ চিরতরে বন্ধ রাখার প্রস্তাব ছিল তাদের। পাশাপাশি মালিকানা ফিরে পাওয়ার আগে আমানতকারীর টাকা, সরকারি সহায়তা এবং অন্যান্য সব দেনা পুরোপুরি পরিশোধ করার বাধ্যবাধকতা রাখার পরামর্শও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই কঠোর শর্তগুলো রাখা হয়নি; বরং কেবল দায় পরিশোধের একটি প্রতিশ্রুতি (অঙ্গীকারনামা) দিয়েই আগের শেয়ার ফেরত পাওয়ার সুযোগ আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিতর্কিত ধারাটি ছাড়া বাকি অংশে আগের অধ্যাদেশের মূল কাঠামো প্রায় অপরিবর্তিত রেখেই আইনটি পাস করা হয়েছে। আইনে বাংলাদেশ ব্যাংককে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক সামাল দিতে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রয়োজনে প্রশাসক নিয়োগ করা, ব্যাংকের মূলধন বাড়ানো, সম্পদ ও দায় অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা, অস্থায়ীভাবে ‘ব্রিজ ব্যাংক’ গঠন করা এবং সরকারি সহায়তা দেয়ার ব্যবস্থা। এ ছাড়া, একটি আলাদা রেজোল্যুশন তহবিল গঠনের কথা বলা হয়েছে এবং প্রয়োজন হলে কোনো ব্যাংক বন্ধ (অবসায়ন) করে দেয়া এবং এর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়ার বিধানও রাখা হয়েছে।
বিতর্কিত ১৮(ক) ধারায় যা বলা হয়েছে
নতুন ধারা অনুযায়ী, রেজুলেশন বা একীভূতকরণের আগে যেসব ব্যক্তি ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার ছিলেন, তারা চাইলে আবারো সেই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় পুনরায় ধারণের আবেদন করতে পারবেন। অর্থাৎ, এক সময় যাদের হাত থেকে ব্যাংক উদ্ধার করতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংককে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে, তারাই পুনরায় মালিকানা চাইতে পারবেন। আইনের সবচেয়ে বিস্ময়কর অংশ হলো, সাবেক মালিকদের পুরো অর্থ একসাথে ফেরত দিতে হবে না। মাত্র ৭.৫ শতাংশ জমা দিলেই ফের মালিকানা উপধারা (৩) অনুযায়ী, আবেদন চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হওয়ার তিন মাসের মধ্যে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের দেয়া মোট অর্থের মাত্র ৭.৫ শতাংশ জমা দিলেই শেয়ার ও নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হবে। অর্থাৎ, ধরুন সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক মিলে কোনো দুর্বল ব্যাংককে বাঁচাতে ২০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। সে ক্ষেত্রে সাবেক মালিককে প্রথম ধাপে দিতে হবে মাত্র দেড় হাজার কোটি টাকা। আর বাকি সাড়ে ১৮ হাজার কোটি টাকা দুই বছরের মধ্যে ১০ শতাংশ সরল সুদসহ পরিশোধের সুযোগ থাকবে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কার্যত ‘নামমাত্র ডাউন পেমেন্টে ব্যাংক ফেরত’ দেয়ার মতো ব্যবস্থা। একজন ব্যাংক বিশ্লেষক বলেন, ‘যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী হাজার হাজার কোটি টাকা বের করে ব্যাংককে সঙ্কটে ফেলেছে, তাদের কাছে ৭.৫ শতাংশ জোগাড় করা কোনো কঠিন বিষয় নয়। এতে তারা খুব সহজেই আবার মালিকানায় ফিরতে পারবে।’ একজন আমানতকারী বলেন, ‘যারা ব্যাংক শেষ করেছে, তারাই যদি আবার ব্যাংক পায়, তাহলে আমরা কাকে বিশ্বাস করব?’
পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে নতুন ইসলামী ব্যাংক
এই আইন ঘিরে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে পাঁচটি দুর্বল ব্যাংক একীভূত করে নতুন ব্যাংক গঠনের প্রক্রিয়া। এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামী- এই পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে গঠন করা হয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। এর মধ্যে চারটি ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে S Alam Group-এর নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে আলোচিত ছিল। এক্সিম ব্যাংক পরিচালিত হতো নাসা গ্রুপের প্রভাবাধীন ব্যবস্থাপনায়। অভিযোগ রয়েছে, এই ব্যাংকগুলো থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা অনিয়মিত ঋণ হিসেবে বের হয়ে গেছে।



