মিসাইল এলেই মোবাইলে বাজছে সতর্কবার্তা

মধ্যপ্রাচ্যের দেশে দেশে প্রবাসী আয়ে স্থবিরতা, বাড়ছে খরচ

ইরানের সাথে ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৬ দিনের চলমান যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে। বিশেষ করে এসব দেশে প্রবাসী ও তাদের পরিবার মিলিয়ে কোটি মানুষের দিন কাটছে চরম উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায়। এর সাথে যোগ হয়েছে অর্থনৈতিক সঙ্কট। প্রবাসী আয়ে স্থবিরতা নেমে এসেছে। পাশাপাশি জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় বাংলাদেশীরা অনেকটা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

মনির হোসেন
Printed Edition

ইরানের সাথে ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৬ দিনের চলমান যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে। বিশেষ করে এসব দেশে প্রবাসী ও তাদের পরিবার মিলিয়ে কোটি মানুষের দিন কাটছে চরম উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায়। এর সাথে যোগ হয়েছে অর্থনৈতিক সঙ্কট। প্রবাসী আয়ে স্থবিরতা নেমে এসেছে। পাশাপাশি জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় বাংলাদেশীরা অনেকটা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

গতকাল শনিবার কুয়েত সিটিতে বসবাসকারী প্রবাসী বাংলাদেশী জালাল উদ্দিন যুদ্ধ শুরুর আগের এবং পরের ভয়াবহ অবস্থার বর্ণনা করে নয়া দিগন্তকে বলেন, দু’দিন আগেও কুয়েতের মিনা আল আহমদিয়াসহ কয়েকটি স্পটে মিসাইল হামলা হয়েছে। ইরানে হামলায় ব্রিজ ভাঙার প্রতিশোধ হিসেবে তারা (ইরান) কুয়েত, আবুধাবি, বাহরাইন, সৌদি আরব ও লেবাননের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে হামলা চালাবে বলে সরকার বিভিন্ন সূত্রে জানতে পেরেছে। এরমধ্য কুয়েতের গুরুত্বপূর্ণ ১০টি স্থানকে তারা হামলা করার টার্গেটে রেখেছে। এমন তথ্য জানার পর ঐসব এলাকার কুয়েতি-বাংলাদেশীসহ সব নাগরিককে সাবধানে থাকতে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, যুদ্ধ লাগার পর কুয়েতি মালিক-নাগরিকদের অনেকেই ভয়ে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেছেন। যদিও সরকার থেকে ঘোষণা দেয়া হয়েছে, যারা এই মুহূর্তে কুয়েতের (শুধু কুয়েতি) বাইরে যাবে তাদের নাগরিকত্ব বাতিল করা হবে। মালিকরা আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাওয়ায় অনেক কোম্পানিতে কাজ করা বাংলাদেশীদের ঠিকমতো বেতন হচ্ছে না। জিনিসপত্রের দামও আগের থেকে কিছুটা বেড়েছে। তিনি বলেন, বেতন না হওয়ায় গত দুই মাস ধরে অনেকে দেশে টাকা পাঠাতে পারছেন না। ইতোমধ্য যারা হোটেল, দোকানে কাজ করতেন তাদের বেশিরভাগেরই চাকরি নেই। যার দরুন প্রবাসী আয়ে মারাত্মক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

এক প্রশ্নের জবাবে জালাল বলেন, ইরান থেকে মিসাইল ছোড়া হলেই কুয়েত সীমান্তে আসার আগেই আমাদের সবার মোবাইলের রিংটোন একসাথে বেজে উঠছে। তখন সবাই নিরাপদ আশ্রয় নেয়ার সুযোগ পাচ্ছি। তারপরও আমাদের দিন কাটছে আতঙ্কের মধ্যে। অপর প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কুয়েতের সাথে সরাসরি ফ্লাইট বন্ধ থাকলেও বিকল্প ব্যবস্থায় ঢাকা থেকে সৌদি আরবের দাম্মাম এসে তারপর সড়কপথে সেখান থেকে প্রবাসীরা সালমি ও আবদালি ইমিগ্রেশন হয়ে কুয়েতে আসছে। একইভাবে যারা কুয়েত থেকে দেশে যাচ্ছে তাদের সবার খরচই এখন তিন গুণ বেড়েছে।

নোয়াখালীর চাটখিল থেকে ইকবাল নামের প্রবাসী কুয়েতে যান গত সপ্তাহে। তিনি জানান, ১২০ দিনারের বিমান টিকিট ২৮০ দিনারে কাটতে হয়েছে। তাও রিটার্ন না, সিঙ্গেল টিকিট।

কুয়েত রেমিট্যান্স হাউজের ব্যবস্থাপক এ কে এম আজাদ নয়া দিগন্তকে বলেন, পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। প্রতিদিন আকাশে সাউন্ড গ্রেনেড আর মোবাইল ম্যাসেজের আতঙ্কে আছি। প্রবাসী আয়ে ঝুঁকি শুরু হয়ে গেছে। আগে যারা দেশে এক লাখ টাকা পাঠাতেন তারা এখন ২০ হাজার টাকা পাঠায়। ইনকাম নাই। সবকিছু স্থবির। আবার খরচও বেড়ে গেছে। যে কাঁচা মরিচ কিনতাম হাফ দিনারে সেটি এখন কোনো কোনো দিন কিনছি চার দিনারে। যুদ্ধ না থামলে এই অবস্থা আরো খারাপ হবে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়বে।

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, শুধু কুয়েত নয়, আবুধাবি, দুবাই কাতার, সৌদি আরব, বাহরাইন, লেবাননে বেশি প্রভাব পড়ছে। মোট কথা আমরা মধ্যপ্রাচ্যর কোটি প্রবাসী আতঙ্কে আছি। তিনি বলেন, বাংলাদেশীরা যদি কোন কারণে দেশে ফিরে যায় তখন তাদের কী ধরনের সুবিধা দেয়া হবে সেসব বিষয়ে এখন থেকেই সরকারের প্রস্তুতি রাখা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

এদিকে যুদ্ধের কারণে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে বিমান চলাচলের উপর মারাত্মক প্রভাব পড়েছে বলে মনে করছেন বিদেশগামী ও ব্যবসায়ীরা।

গতকাল শনিবার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বাবুস সালাম মসজিদ মার্কেটের ব্যবসায়ী ও ঢাকা মহানগর রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির (উত্তর) সহসভাপতি মো: সালাউদ্দিন পেয়ারী নয়া দিগন্তকে আক্ষেপ করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরুর পর আমরা অচল হয়ে পড়ছি। বিমান চলাচলের উপরই আমাদের ব্যবসা নির্ভরশীল। নতুন যাত্রী নাই। যারা এখন যাচ্ছে তারা পুরনো যাত্রী। ছুটিতে এসে আবার যাচ্ছে।

এসব যাত্রীরা বলছেন, ভিসা বাতিল হয়ে যাবে বলে তারা যাচ্ছে। আবার যারা মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশেষ ফ্লাইটে দেশে আসছে তারা বলেন, আতঙ্কে নিজেকে বাঁচাতেই চলে আসছেন। বলেন, বেঁচে থাকলে কাজ করতে পারবো।

তবে ফেরত আসা ফ্লাইটের সংখ্যা কম। তার জানা মতে, বর্তমানে সৌদি আরবের রিয়াদ, জেদ্দা, দাম্মাম ও মদিনা রুটে ঢাকা থেকে ফ্লাইট চলছে। মাঝে মধ্যে দুবাই, আবুধাবি ও কাতার থেকে বিশেষ ফ্লাইটে যাত্রীরা দেশে ফেরত আসছেন।