ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে সারা দেশে কোটি পর্যটকের সমাগম হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ায় নির্বিঘেœ দেশজুড়ে ভ্রমণ করেছেন পর্যটকরা। সংশ্লিষ্টদের মতে, ঈদের লম্বা ছুটিকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী পর্যটকের ঢল নেমেছে। সব মিলিয়ে এবার পর্যটন খাতে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি ব্যবসা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কক্সবাজারের স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, গতকাল পর্যন্ত সেখানে প্রায় ১০ লাখ পর্যটকের সমাগম হয়েছে। এর পরেই ছিল সিলেট, কুয়াকাটা, পতেঙ্গা, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও সুন্দরবন- এসব পর্যটনকেন্দ্রে লক্ষাধিক পর্যটকের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
কক্সবাজার পর্যটন সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ঈদের ছুটির ছয় দিনে পাঁচ শতাধিক হোটেল, রিসোর্ট ও গেস্টহাউজ, ছয় শতাধিক রেস্তোরাঁ এবং তিন হাজারের বেশি দোকানপাট ও পরিবহনসহ মোট ১৩টি খাতে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার ব্যবসা হয়েছে।
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পানিতে নামা দর্শনার্থীদের সুরক্ষায় নিয়োজিত ছিল সিসেফ লাইফগার্ডের ২৭ জন কর্মী। তবে এর মধ্যে বৃহস্পতিবার সমুদ্রে তলিয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। ট্যুরিস্ট পুলিশ জানায়, ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া ৪০ শিশুকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে।
হোটেল-গেস্টহাউজ মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার জানান, অতিরিক্ত কক্ষভাড়া ও খাবারের দাম নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে কাজ করেছে।
সিলেটেও ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের ঢল নেমেছে। জাফলং, সাদাপাথর, রাতারগুল, বিছনাকান্দি, পান্তুমাই ও লালাখালসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। সিলেট ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হুমায়ুন কবির লিটন বলেন, দীর্ঘদিন পর এবার পর্যটন খাত ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ পর্যটকের আগমন ঘটবে বলে তারা আশা করছেন। এ খাতে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার ব্যবসা হতে পারে।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থানবিষয়ক মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক মো: সারওয়ার আলমও একই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ঈদের ছুটিতে সুন্দরবনেও পর্যটকদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা গেছে। করমজল, হাড়বাড়িয়া, হিরণপয়েন্ট, কটকা, কচিখালী, নীলকমল ও দুবলা কেন্দ্রসহ বিভিন্ন স্পটে পর্যটকদের ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে বন বিভাগ। পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়াতে নেয়া হয়েছে বিশেষ উদ্যোগ এবং জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থা।
চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতেও লাখো পর্যটকের সমাগম হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকরা এসে সমুদ্রসৈকতে ভিড় করেছেন। পাশাপাশি শহরের অন্যান্য বিনোদনকেন্দ্রেও দর্শনার্থীদের উপচে পড়া উপস্থিতি দেখা গেছে। ট্যুরিস্ট পুলিশ জানিয়েছে, এসব এলাকায় বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন বিনোদন স্পটেও ঈদের ছুটিতে মানুষের ঢল নামে। বিশেষ করে ডেমরার ধার্মিকপাড়ায় অবস্থিত ‘মিনি কক্সবাজার’ এলাকায় বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। এখানে নৌকা ও প্যাডেল বোটে ভ্রমণের সুযোগ ছাড়াও রয়েছে শিশুদের জন্য বিভিন্ন রাইড, স্ট্রিট ফুড ও বিনোদনের নানা আয়োজন।
ট্যুরিস্ট পুলিশ জানায়, দেশে মোট এক হাজার ৬৭৫টি পর্যটনকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে ৩৩ জেলার ১০৭টি গুরুত্বপূর্ণ স্পটে প্রায় দেড় হাজার ট্যুরিস্ট পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের পরিদর্শক পারভেজ আহমেদ জানান, তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ইউনিফর্ম পরিহিত পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকের গোয়েন্দা সদস্যরাও ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করছেন।
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম এ মোতালেব শরীফ বলেন, রমজান ও নির্বাচনপূর্ব সময়ের তুলনায় এবার পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকায় ঈদে পর্যটকের চাপ অনেক বেড়েছে।
বান্দরবান রেসিডেন্সিয়াল হোটেল ও রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম জানান, সেখানে প্রায় ৮০টি হোটেল ও রিসোর্টে একসাথে প্রায় পাঁচ হাজার পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা থাকলেও অতিরিক্ত ভিড়ে আবাসন সঙ্কট দেখা দিয়েছে।
রাঙ্গামাটির কাপ্তাইসহ পাহাড় ও লেকঘেরা পর্যটনকেন্দ্রগুলোতেও হাজারো পর্যটকের আগমন ঘটেছে। রাঙ্গামাটি পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্সের উপব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা বলেন, পর্যটকদের ভিড় সামলাতে তাদের যথেষ্ট বেগ পেতে হচ্ছে।
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সাবেক সভাপতি শিবলুল আজম কোরেশী নয়া দিগন্তকে বলেন, অনুকূল আবহাওয়া ও দীর্ঘ ছুটির কারণে এবার অভ্যন্তরীণ পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সব মিলিয়ে পর্যটন খাতে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।


