রিটার্নিং অফিসারদের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক

নিয়োগের পর থেকেই বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া একাধিক রিটার্নিং অফিসার আওয়ামী লীগ সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ফলে নিজেদের পদ ও চেয়ার নিরাপদ রাখতে তারা বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের তোষামোদ করতে গিয়ে এমন বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বলে মনে করছেন ক্ষুব্ধ প্রার্থীরা। এ ধরনের পক্ষপাতমূলক আচরণের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে একাধিক লিখিত অভিযোগও জমা পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

শামছুল ইসলাম
Printed Edition

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রিটার্নিং অফিসারদের ভূমিকা নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্বে থাকা জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলছেন বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা। অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগের পর থেকেই বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া একাধিক রিটার্নিং অফিসার আওয়ামী লীগ সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ফলে নিজেদের পদ ও চেয়ার নিরাপদ রাখতে তারা বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের তোষামোদ করতে গিয়ে এমন বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বলে মনে করছেন ক্ষুব্ধ প্রার্থীরা। এ ধরনের পক্ষপাতমূলক আচরণের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে একাধিক লিখিত অভিযোগও জমা পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকার অভিযোগে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুড়িগ্রাম-৩ (উলিপুর) আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মাহবুবুল আলম (সালেহী)-এর মনোনয়নপত্র বাতিল করেন জেলা রিটার্নিং অফিসার। এ ঘটনার প্রতিবাদে সম্মেলন কক্ষের ভেতরে ও বাইরে জামায়াতের বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ করেন।

তবে একই সময়ে ফেনী-৩ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আব্দুল আওয়াল মিন্টু দ্বৈত নাগরিকত্ব ত্যাগের কোনো ডকুমেন্টস দাখিল না করেই মনোনয়নপত্রের বৈধতা পেয়েছেন বলে একটি সূত্র দাবি করেছে। এতে করে নির্বাচন কমিশনের অধীন যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন আরো ঘনীভূত হয়েছে। মনোনয়ন বাতিলের বিষয়ে জামায়াত প্রার্থী মাহবুবুল আলম সালেহী বলেন, ‘আমাকে ডাকা হলেও কথা বলার সুযোগ দেয়া হয়নি। রিটার্নিং অফিসার তার আগের অবস্থানে অনড় ছিলেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সাথে নিয়ে উপস্থিত হলেও তা দেখানোর সুযোগ দেয়া হয়নি। তিনি আগেও বোঝেননি, বোঝার চেষ্টাও করেননি। এখনো বুঝছেন না। তিনি সম্পূর্ণ বায়াসড হয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।’

জেলা প্রশাসক হিসেবে অন্নপূর্ণা দেবনাথ দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই কুড়িগ্রামে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। স্থানীয় রাজনৈতিক মহল ও নাগরিক সমাজের অভিযোগ, কুড়িগ্রামে যোগদানের পর আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের বিতর্কিত নেতাদের জেলা প্রশাসনের আশপাশে নিয়মিত ঘোরাফেরা করতে দেখা যাচ্ছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, কুড়িগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও একাধিক মামলার আসামি আমান উদ্দিন আহমেদ মঞ্জুর ঘনিষ্ঠ সহচর এবং সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক সম্পাদক আব্দুল বাতেন সরকার- যিনি অতীতে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন- বর্তমান জেলা প্রশাসকের আশপাশে নিয়মিত উপস্থিত থাকছেন।

ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত অন্নপূর্ণা দেবনাথ ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে গুরুত্বপূর্ণ দফতরে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ায় বিশ্ব হিন্দু মহাজোট উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিনন্দন জানিয়েছে। মহাজোটের এক নেতা লিখেছেন, ‘অভিনন্দন ও শুভকামনা রইল দিদিভাই।’

কক্সবাজার-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদের মনোনয়নপত্র বাতিল করেন রিটার্নিং অফিসার। সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তাকে হাততালি দিতে দেখা যায়, যা প্রশাসনের পক্ষপাতমূলক আচরণের ইঙ্গিত দেয় বলে অভিযোগ উঠেছে। হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, প্রশাসনের ভেতরে এখনো ফ্যাসিবাদী সরকারের প্রভাব ও তাদের সহযোগীরা সক্রিয় রয়েছে। সেই প্রভাবের কারণেই তার মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। দায়িত্বে থেকে যারা এমন আচরণ করেন, তারা কখনো নিরপেক্ষ হতে পারেন না। এতে প্রমাণ হয়, প্রশাসনের ভেতরে এখনো ফ্যাসিবাদী শক্তির অনুসারীরা সক্রিয়।

তিনি আরো বলেন, ফ্যাসিবাদী আমলে দায়ের করা সাজানো ও মিথ্যা মামলাকে অজুহাত বানিয়ে তার প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে। তার হলফনামায় ঋণখেলাপি, কর ফাঁকি বা রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের কোনো অভিযোগ নেই। তা সত্ত্বেও ২০১৩ সালের একটি আদালত অবমাননার মামলাকে সামনে এনে তাকে নির্বাচনের বাইরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বৈষম্যমূলক।

আইনি ব্যাখ্যা তুলে ধরে ড. আযাদ বলেন, যে মামলার অজুহাতে তার মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে, সেটি কোনো ফৌজদারি অপরাধ নয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সংক্রান্ত একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ওই আদালত অবমাননার মামলা হয়েছিল, যা ক্রিমিনাল মামলার আওতায় পড়ে না।

তিনি আরো জানান, ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও একই বিষয় উত্থাপন করা হয়েছিল। তখন আইনি পর্যালোচনার পর রিটার্নিং অফিসার সেটিকে নির্বাচনী অযোগ্যতা হিসেবে গ্রহণ করেননি। এমনকি ওই মামলায় সাজা ঘোষণার পরও তিনি প্রায় দেড় বছর সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

গাইবান্ধা-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মাজেদুর রহমানের মনোনয়নপত্র প্রথমে বাতিল করা হয়। পরে পুনরায় শুনানি ও রিভিউ শেষে রিটার্নিং অফিসার তার প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করেন। কিন্তু একই ধরনের পরিস্থিতিতে কক্সবাজার-২ আসনে হামিদুর রহমান আযাদ পুনঃশুনানির আবেদন করলে রিটার্নিং অফিসার ‘প্রভিশন নেই’ দেখিয়ে শুনানি গ্রহণ করেননি এবং মনোনয়ন বাতিল বহাল রাখেন।

আরো অভিযোগ রয়েছে, যে মামলার অজুহাতে হামিদুর রহমান আযাদের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে, একই মামলায় সাজাপ্রাপ্ত রফিকুল ইসলাম খানকে সিরাজগঞ্জের রিটার্নিং অফিসার এবং সিলেটের রিটার্নিং অফিসার সেলিম উদ্দীনের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছেন। প্রশাসনের এমন দ্বিচারিতায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রার্থীরা।

নীলফামারী-২ আসনে ধানের শীষের প্রার্থীর বিরুদ্ধে মনোনয়নপত্রের মূল কপি জমা না দিয়ে ফটোকপি দাখিলের অভিযোগ উঠেছে। জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী এ ঘটনাকে আইনবিরোধী আখ্যা দিয়ে মনোনয়ন বাতিলের দাবি জানান এবং জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ এনে নির্বাচন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দেন।

সংবাদ সম্মেলনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট আল ফারুক আব্দুল লতিফ বলেন, ‘মনোনয়নপত্রের মূল কপি জমা না দিয়ে ফটোকপি দাখিল করা সম্পূর্ণ আইনবিরোধী। কিন্তু ধানের শীষের প্রার্থী শাহরিন ইসলাম চৌধুরী তুহিন মূল কপি না দিয়ে ফটোকপি জমা দিয়েছেন। জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে অবহিত করলেও তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি। এতে তার পক্ষপাতমূলক আচরণ স্পষ্ট।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনে ‘পলাতক’ আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ এ কে একরামুজ্জামান সুখনের মনোনয়নপত্র স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বৈধ ঘোষণা করেন জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা শারমিন আক্তার জাহান। যাচাই-বাছাইয়ের সময় একরামুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন না। তার বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার ওপর হামলা ও হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলা রয়েছে।

২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়ে পরে আওয়ামী লীগে যোগ দেন একরামুজ্জামান। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর তার বিরুদ্ধে নাসিরনগর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর, যাত্রাবাড়ী ও উত্তরা-পূর্ব ও পশ্চিম থানায় সাতটি মামলা দায়ের হয়েছে বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন তিনি। নাসিরনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আব্দুল হান্নান একরামুজ্জামানের মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন করেন।

মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা দেয়া রিটার্নিং কর্মকর্তা শারমিন আক্তার জাহান আওয়ামী সুবিধাভোগী কর্মকর্তা বলে অভিযোগ উঠেছে। উপসচিব পদে পদোন্নতির পর তিনি ও কয়েকজন আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তা বঙ্গবন্ধুর মাজারে ফুল দিয়ে ‘বঙ্গবন্ধুর আর্দশে শপথ’ নেন। নড়াইলের ডিসি থাকাকালে তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ইস্যুর অভিযোগও রয়েছে। তার স্বামী আলমগীর হোসেন তালুকদার আওয়ামী আইন ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ছিলেন।

রিটার্নিং অফিসারদের কর্মকাণ্ডে উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। সংগঠনটির সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের সময় কোনো কোনো রিটার্নিং অফিসারের কর্মকাণ্ডে উদ্দেশ্যমূলক ও বৈষম্যমূলক চিত্র দেখা যাচ্ছে। তুচ্ছ ও গুরুত্বহীন বিষয়ে যোগ্য প্রার্থীদের প্রার্থিতা বাতিল করা হচ্ছে। কোনো একটি মহলের ইন্ধনে এসব করা হচ্ছে বলে আমাদের কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ হবে- এ প্রশ্ন দেশবাসীর সামনে বড় হয়ে দাঁড়াবে।’

তিনি তুচ্ছ অজুহাতে বাতিল হওয়া সব প্রার্থীর মনোনয়ন অবিলম্বে বৈধ ঘোষণার আহ্বান জানান এবং এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।