ডলারের চাপে আমদানি খরচে নতুন ধাক্কা, নিম্নমুখী ঋণপত্র

ডলারের চাহিদা এখনো বেশি, কিন্তু রফতানি আয় ও প্রবাসী আয়ের প্রবাহ প্রত্যাশামতো না বাড়ায় সরবরাহে চাপ রয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের বাড়তি দায়। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো ডলার ব্যবস্থাপনায় রক্ষণশীল অবস্থান নিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে উচ্চ মার্জিন আরোপ, আমদানিকারকের সক্ষমতা যাচাই এবং বিলাসী বা অপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিক নিরুৎসাহ এসব কারণে এলসি খোলার গতি কমে এসেছে।

শাহ আলম নূর
Printed Edition

ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ও বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থায়ী অস্থিরতার কারণে আমদানি খরচে নতুন করে ধাক্কা লেগেছে। ব্যাংকিং খাতের তথ্য বলছে, উচ্চ ডলার মূল্য ও সরবরাহ সঙ্কটের প্রভাবে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে আমদানি এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) বা ঋণপত্র খোলার প্রবণতা কমেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডলার সঙ্কট ও ব্যাংকের কড়াকড়ির কারণে কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্যের আমদানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, সরাসরি এর প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডলারের চাহিদা এখনো বেশি, কিন্তু রফতানি আয় ও প্রবাসী আয়ের প্রবাহ প্রত্যাশামতো না বাড়ায় সরবরাহে চাপ রয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের বাড়তি দায়। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো ডলার ব্যবস্থাপনায় রক্ষণশীল অবস্থান নিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে উচ্চ মার্জিন আরোপ, আমদানিকারকের সক্ষমতা যাচাই এবং বিলাসী বা অপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিক নিরুৎসাহ এসব কারণে এলসি খোলার গতি কমে এসেছে।

দেশের ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ও বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থায়ী অস্থিরতার কারণে আমদানি খরচে নতুন ধাক্কা লেগেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) আমদানি এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খোলার পরিমাণ আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে। ব্যাংকার ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডলারের উচ্চমূল্য, সরবরাহ সঙ্কট এবং এলসি খোলায় কড়াকড়ির কারণে আমদানি কমছে; যার প্রভাব ইতোমধ্যে খুচরা বাজারে পড়তে শুরু করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে নতুন এলসি খোলা হয়েছে প্রায় ৩৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের, যেখানে গত অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৪ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার কম এলসি খোলা হয়েছে। এ দিকে নিষ্পত্তিকৃত এলসির পরিমাণও কমে ৩৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছর একই সময়ে ছিল প্রায় ৪১ বিলিয়ন ডলার।

ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডলারের দাম আন্তঃব্যাংক বাজারে ১২০ টাকার আশপাশে ঘোরাফেরা করলেও খোলাবাজারে তা আরো বেশি। ডলার প্রতি ৫-৭ টাকা বৃদ্ধি বড় চালানের ক্ষেত্রে কয়েক কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি করছে। এতে অনেক আমদানিকারক অর্ডার কমিয়ে দিচ্ছেন বা স্থগিত রাখছেন।

তারা বলছেন, ডলারের সরবরাহ সীমিত হওয়ায় এখন এলসি খোলার আগে আমদানিকারকের নগদ মার্জিন বাড়াতে হচ্ছে। আগে যেখানে ১০-১৫ শতাংশ মার্জিনে এলসি খোলা যেত, এখন অনেক ক্ষেত্রে ২৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। এতে কার্যকর মূলধনের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি কমেছে ভোগ্যপণ্য ও শিল্পের কাঁচামালের এলসি খোলার পরিমাণ। ভোগ্যপণ্যে প্রায় ১৮ শতাংশ এবং মধ্যবর্তী কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে এলসি খোলা কমেছে ১২ শতাংশ। মূলধনী যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রেও প্রবৃদ্ধি শূন্যের কাছাকাছি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, অনিশ্চয়তার কারণে বড় বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত স্থগিত ছিল।

মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আলী ভুট্টো নয়া দিগন্তকে বলেন, আমদানিকারকদের অভিযোগ, ডলারের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যাংক চার্জ, এলসি কমিশন, বীমা ও শিপিং খরচও বেড়েছে। গত ছয় মাসে শুধু ডলারের দর বাড়ার কারণে আমাদের প্রতি কনটেইনারে ৮-১০ লাখ টাকা অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। এই বাড়তি ব্যয় বাজারে সমন্বয় না করলে টিকে থাকা কঠিন।

তিনি বলেন, এলসি খোলা কমে যাওয়ার প্রভাব খুচরা বাজারেও দৃশ্যমান। রাজধানীর বাজারগুলোতে আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম গত এক মাসে ৫ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ভোজ্যতেল, ডাল, চিনি, শুকনা ফল, শিশুখাদ্য ও প্রসাধনী পণ্যে বাড়তি দাম লক্ষ্য করা গেছে।

কাওরান বাজারে ভোগ্যপণ্য ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, পাইকারি দামে প্রতি কার্টনে ২০০-৩০০ টাকা বাড়তি দিতে হচ্ছে। এ জন্য খুচরা দামে সমন্বয় করতে হচ্ছে। তিনি জানান, অনেক আমদানিকারক ভবিষ্যতে ডলার আরো বাড়তে পারে এই আশঙ্কায় আগাম দাম বাড়াচ্ছেন।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু নয়া দিগন্তকে বলেন, কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্ব উৎপাদন চক্রকে ব্যাহত করছে। টেক্সটাইল ও তৈরী পোশাক খাতে সুতা, রাসায়নিক ও আনুষঙ্গিক কাঁচামালের বড় অংশ আমদানিনির্ভর। এলসি খোলা কমে যাওয়ায় অনেক কারখানা সীমিত সক্ষমতায় চলছে। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের রফতানিকারকরা আগের মজুদের ওপর নির্ভর করছে। নতুন চালান দেরি হলে রফতানি আদেশ পূরণে সমস্যা হবে বলে তিনি জানান।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম নয়া দিগন্তকে বলেন, ডলারের চাপ অব্যাহত থাকলে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি হবে। বর্তমানে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। আমদানি ব্যয় বাড়লে খাদ্য ও অখাদ্য উভয় খাতেই মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম বাড়লে তার প্রভাব পরিবহন ও উৎপাদন খরচের মাধ্যমে সবখানে ছড়িয়ে পড়ে।

এ দিকে দেশের ব্যবসায়ী নেতারা দাবি করছেন, উৎপাদনমুখী খাতে এলসি খোলায় অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং ডলারের সরবরাহ বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তাদের মতে, বিনিময় হার স্থিতিশীল না হলে বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়বে এবং বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত আরো ধীর হবে। তারা বলছেন, এলসি খোলা এবং খুচরা বাজার তিন ক্ষেত্রেই স্পষ্ট প্রভাব ফেলছে। এলসি খোলা ১৫ শতাংশ কমে যাওয়া তার বড় ইঙ্গিত। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি ও বাজারে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নতুন চাপ তৈরি করছে। বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সমন্বিত নীতি ও দ্রুত পদক্ষেপ ছাড়া এই চাপ কমানো কঠিন হবে।