ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ আক্রমণ এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইরানের পাল্টা আক্রমণে বাংলাদেশ উভয় সঙ্কটে পড়েছে। একদিকে সরকারকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এনএলজি) বহনকারী জাহাজগুলোকে নির্বিঘœ চলাচল নিশ্চিত করতে ইরানের মুখাপেক্ষী থাকতে হচ্ছে। অন্য দিকে মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ওমান ও বাহরাইনকে নিয়ে গঠিত গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলভুক্ত (জিসিসি) দেশগুলোতে অবস্থানরত বিশাল প্রবাসী বাংলাদেশী সম্প্রদায়ের স্বার্থরক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের একক বৃহত্তম বাজার যুক্তরাষ্ট্রের বিরাগভাজন হতে চাইছে না সরকার।
সার্বিক দিক বিবেচনায় নিয়ে জিসিসিভুক্ত দেশগুলোতে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে তার পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির জিসিসিভুক্ত দেশগুলোতে ধারাবাহিকভাবে সফর করছেন। এ সময় তিনি দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের হাতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চিঠি তুলে দিচ্ছেন। চিঠিতে প্রধানমন্ত্রী মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে আরব দেশগুলোর ওপর হামলা, প্রাণহানি ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়া তিনি বর্তমান আঞ্চলিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে দেশগুলোর নেতৃত্ব, সরকার এবং ভ্রাতৃপ্রতিম জনগণের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন। হুমায়ুন কবির ইতোমধ্যে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান সফর শেষ করেছেন।
অন্য দিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরগচির কাছে চিঠি লিখে ইরানে আটকেপড়া বাংলাদেশীদের দেশে ফেরার ব্যবস্থা করার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন। ইতঃপূর্বে সরকারের অনুরোধের প্রেক্ষাপটে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল বাংলাদেশমুখী ছয়টি জ্বালানি তেল ও এলএনজিবাহী জাহাজকে হরমুজ প্রণালী পার হওয়ার অনুমতি দিয়েছে।
সম্প্রতি ওয়াশিংটন সফরের সময় খলিলুর রহমান যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানীমন্ত্রী ক্রিস রাইটের সাথে সাক্ষাৎত করে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের ওপর প্রভাব তুলে ধরেছেন। তিনি জ্বালানী নিয়ে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়েছেন। রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সুযোগে বাংলাদেশ বিকল্প উৎস হিসেবে দেশটি থেকে জ্বালানি আমদানি করতে চায়। ক্রিস রাইট এ কঠিন সময়ে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা দেয়া এবং বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সাথে কাজ করার আশ্বাস দেন।
প্রসঙ্গত, হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল ও এলএনজিবাহী জাহাজ চলাচল করে। যুদ্ধ শুরুর পর ইরান এ প্রণালীর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। দেশটির অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ প্রণালীটি অতিক্রম করতে পারছে না। ইতোমধ্যে কয়েকটি জাহাজে আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। কুয়েত, বাহরাইন, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে জ্বালানি নিয়ে শত শত জাহাজ পারস্য উপসাগরে আটকা পড়েছে। সম্প্রতি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট কিছু বন্ধু রাষ্ট্রের জন্য এ প্রণালী খোলা থাকবে। এ তালিকায় ভারত, পাকিস্তান, চীন, রাশিয়া, ইরাকের পাশাপাশি বাংলাদেশও রয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দু’টি বিবৃতি দেয়া হয়েছে। প্রথমটিতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ইরানের হামলার নিন্দা জানানো হয়েছে; কিন্তু ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ আক্রমণের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। সমালোচনার মুখে পরদিনই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেয়া অপর বিবৃতিতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করা হয়েছে।
এ দিকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ আক্রমণ নিয়ে ঢাকার অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বান জানিয়ে গত বুধবার রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দেশটির রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদি বলেছেন, এ সংক্রান্ত বাংলাদেশের দেয়া বিবৃতি নিয়ে আমাদের কষ্টের জায়গা রয়েছে। আমরা জানি, মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ জিসিসিভুক্ত দেশগুলোতে অনেক প্রবাসী বাংলাদেশী রয়েছে; কিন্তু ইরানের আপত্তি উপেক্ষা করে এ সব দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে ঘাঁটি করার অনুমতি দিয়েছে। এ সব ঘাঁটি থেকে ইরানের ওপর আক্রমণ হচ্ছে। কয়েকটি দেশ আবার ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে তাদের রাজধানীতে দূতাবাস স্থাপনের অনুমোদনও দিয়েছে। এ সব ঘাঁটি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যদের সম্ভাব্য অবস্থান লক্ষ্য করে ছোড়া ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বা তার ধ্বংসাবশেষের আঘাতে কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশী নিহত হয়েছে। এ জন্য আমরা দুঃখিত; কিন্তু এর দায়দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রকে ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দেয়া দেশগুলোর ওপর বর্তায়। তিনি বলেন, জাতিসঙ্ঘ সনদ অনুযায়ী ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ অবৈধ। এটিকে বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ এ অবৈধ যুদ্ধের নিন্দা জানাতে পারে। মুসলিম দেশ না হয়েও স্পেনের মতো অনেক ইউরোপীয় দেশ এ অবৈধ যুদ্ধের নিন্দা জানিয়েছে। খোদ যুক্তরাষ্ট্রেও এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে।
এ ব্যাপারে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশ কিছুটা সঙ্কটে অবশ্যই রয়েছে। নতুন সরকার ‘সবার আগে বাংলাদেশ’- এ পররাষ্ট্র নীতিকে প্রাধান্য দিচ্ছে। এ নীতির কয়েকটি উপাদানে মনোযোগ দিলে এ সঙ্কট থেকে উত্তরণের পথ সুগম হবে। প্রথমত, বাংলাদেশের স্বার্থটা আগে পরিষ্কারভাবে চিহ্নিত করতে হবে। আর এ জন্য জাতীয় সংহতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা জাতীয় স্বার্থকে বিভিন্ন দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্লেষণ করে আসছি। এ কারণে বাংলাদেশের ওপর কখনো ভারত, কখনো যুক্তরাষ্ট্র বা কখনো চীনের প্রভাব বাড়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির ওপর জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিলে আমরা একটি অভিন্ন প্লাটফর্ম তৈরি করতে পারব।
পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ভারতের দু’টি বড় রাজনৈতিক দল কংগ্রেস ও বিজেপি। রাজনীতির মাঠে তারা পরষ্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী; কিন্তু বাংলাদেশ ইস্যুতে তাদের অবস্থান অভিন্ন। নিজ দেশের স্বার্থে রাজনৈতিক ঐক্য একটি রাষ্ট্রের প্রধান শক্তির জায়গা।
মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে সাবেক এ রাষ্ট্রদূত বলেন, জাতীয় স্বার্থের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল দেশকে নিরাপদ রাখা। অপেক্ষাকৃত ছোট একটি রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের সুরক্ষার জন্য নীতিগত অবস্থান থেকে বাংলাদেশকে অন্য কোনো রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণের নিন্দা জানাতে হবে। এরপর আমাদের স্বার্থের দিতে নজর দিতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশের প্রায় ৮০ লাখ মানুষ কাজ করে। এ সব প্রবাসী বাংলাদেশীর জানমালের নিরাপত্তার পাশাপাশি কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা আমাদের মৌলিক স্বার্থের সাথে জড়িত। তাই প্রবাসী বাংলাদেশীদের স্বার্থ রক্ষায় আমাদের উচ্চকণ্ঠ হতে হবে।



