বস্তিবাসীদের মানবেতর জীবন জিম্মি প্রভাবশালীদের হাতে

প্রতিদিন গড়ে এক হাজার ৫০০ মানুষ গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় আসছেন, যার একটি বড় অংশ আশ্রয় নেয় বিভিন্ন বস্তিতে। বিবিএসএর বস্তিশুমারি অনুযায়ী, রাজধানীতে তিন হাজার ৩৯৪টি বস্তিতে ৪০ লাখের বেশি মানুষ বসবাস করেন। বাস্তব সংখ্যা আরো অনেক বেশি হবে। মানুষের এই চাপ ঢাকাকে দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ জনসংখ্যা ও অবকাঠামোগত সঙ্কটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

আব্দুল কাইয়ুম
Printed Edition
  • প্রতি চার পরিবারের একটি খাদ্যসঙ্কটে
  • অভিবাসনের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে রাজধানীতে
  • স্থানীয় নেতাদের ছত্রছায়ায় জড়িয়ে পড়ে অপরাধে

নোংরা-আবর্জনার মধ্যে গাদাগাদি করে বসবাস। এক ঘরে ছেলে-মেয়ে-ছেলের বউ, নাতি-নাতনি নিয়ে বসবাস। অবৈধ পানি ও বিদ্যুতের সংযোগ দিয়ে চলে নিত্যদিনের কাজ। এ জন্য গুনতে হয় মাসে হাজার টাকা। শৌচাগারের সঙ্কট তীব্র। একটি শৌচাগার ব্যবহার করে কোথাও কোথাও ৫০ জনের বেশি মানুষ। অনেক সময় শৌচাগারের পানি গড়িয়ে আসে ঘরে। এতে রোগাক্রান্ত হচ্ছে শিশুসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ। এভাবেই পরিবার নিয়ে বসবাস করছে ঢাকার বস্তিবাসীরা। তবে এসব বস্তিবাসী আবার এক শ্রেণীর মানুষের কাছে জিম্মি।

জানা যায়, শহরে নি¤œ-আয়ের মানুষের আবাসনের জন্য নেয়া প্রকল্পগুলো ধনীদের কব্জায় চলে গেছে। ফলে শহরের বস্তি এলাকায় বসতি বাড়ছে। গ্রামে দরিদ্রদের জন্য নেয়া প্রকল্পগুলো অংশগ্রহণমূলক না হওয়ায় তা সুফল বয়ে আনছে না। তা ছাড়া বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সরকারি কোনো জমির উপরে স্থানীয় প্রভাবশালীরা জায়গা দখল করে ঘর তুলে সেগুলো ভাড়া দিয়ে থাকেন। এসব জায়গাতেও ঘর ভাড়া দিতে হয় তিন থেকে চার হাজার টাকায়। কোনো কোনো এলাকায় ঘর ভাড়া কিছুটা বেশি। মাসে ৫০০ টাকা দিতে হয় পানির বিল আর গ্যাস বিল ৩০০ টাকা। বিদ্যুতের বিলও দিতে হয়। এসব বস্তিতে মূলত যারা বাস করেন তারা পেশায় বেশির ভাগই পোশাককর্মী, গৃহকর্মী, দিনমজুর, রিকশাচালক অথবা কেউ হয়তো কোনো খুচরা পথ-ব্যবসার সাথে জড়িত।

রাজধানীর উল্লেখযোগ্য বস্তিগুলোর মধ্যে কড়াইল, মহাখালীর সাততলা, ভাসানটেক, ধলপুর, হাজারীবাগ এবং মিরপুরের বিভিন্ন বস্তি অন্যতম। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত নগরায়ন, কাজের সন্ধানে গ্রাম থেকে আসা এবং আবাসন সঙ্কটের কারণে ঢাকায় বস্তির সংখ্যা ও বস্তিবাসী উভয়ই বাড়ছে।

জাতিসঙ্ঘের জনসংখ্যা তহবিল-ইউএনএফপিএ বলছে, প্রতিদিন গড়ে এক হাজার ৫০০ মানুষ গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় আসছেন, যার একটি বড় অংশ আশ্রয় নেয় বিভিন্ন বস্তিতে। বিবিএসএর বস্তিশুমারি অনুযায়ী, রাজধানীতে তিন হাজার ৩৯৪টি বস্তিতে ৪০ লাখের বেশি মানুষ বসবাস করেন। বাস্তব সংখ্যা আরো অনেক বেশি হবে। মানুষের এই চাপ ঢাকাকে দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ জনসংখ্যা ও অবকাঠামোগত সঙ্কটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

গবেষণা বলছে, ঢাকায় বস্তিবাসীর ৪০ শতাংশ জলবায়ু-বাস্তুচ্যুত। বরিশাল-ভোলা, পটুয়াখালীর পরিবারগুলো নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততায় ভিটেমাটি হারিয়ে ঢাকাকে শেষ আশ্রয় মনে করছেন। জাতিসঙ্ঘের মতে, মৌলিক চাহিদা মেটাতে আবাসনে একজন ব্যক্তির ন্যূনতম ৯৭ বর্গফুট জায়গা প্রয়োজন। অন্যদিকে ইউএনএইচসিআরের জরুরি আশ্রয়ের মানদণ্ড অনুযায়ী, জরুরি পরিস্থিতিতে শরণার্থী শিবিরের মতো স্থানে জনপ্রতি ৩৭ দশমিক ৭ থেকে ৫৯ বর্গফুট জায়গা থাকা উচিত।

২০১৮ সালের বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভিটেমাটি হারানো বাংলাদেশীর সংখ্যা ২০৫০ সালের মধ্যে এক কোটি ৩৩ লাখে পৌঁছাতে পারে, যা দক্ষিণ এশিয়ার মোট উদ্বাস্তু জনসংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগ। অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের (আইডিএমসি) তথ্যানুসারে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বর্তমানে বাংলাদেশের বার্ষিক বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা ৯ লাখ ১৫ হাজার। চলতি শতকের শুরুর দশকে এই সংখ্যা ছিল গড়ে সাত লাখ। আইডিএমসির তথ্য বলছে, উপকূলীয় জেলা, যেমন ভোলা, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, সাতক্ষীরার মতো জেলাগুলো থেকে বাস্তুচ্যুতি বেশি ঘটে। প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের বছরগুলোতে বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা বেড়ে যায়।

রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) ২০১৮ সালে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যারা অভিবাসন নিচ্ছে তাদের প্রায় ৬০ শতাংশ রাজধানী ঢাকা, ২০ শতাংশ চট্টগ্রাম শহরে ও ২০ শতাংশ আন্তঃজেলায় অভিবাসী হচ্ছে। নিউট্রি-ক্যাপের এক গবেষণা বলছে, বস্তির ৫৯ শতাংশ শিশু রক্তস্বল্পতায় ভোগে। ৯১ শতাংশ পরিবার ঋণগ্রস্ত।

প্রতি চার পরিবারের একটিতে খাদ্য সঙ্কট আছে। ডায়রিয়া, জ্বর, শ্বাসকষ্ট, অপুষ্টিসহ নানা রোগশোকে আক্রান্ত হন বস্তির নারী-পুরুষ-শিশুরা।

বস্তিবাসীরা জানান, অনেকেই বহু বছর ধরে নিজ খরচে বস্তিতে স্বামী-স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েসহ পরিবার নিয়ে বসবাস করে আসছেন। বস্তিতে ঘর ভাড়াসহ অবৈধ বিদ্যুৎ ও পানির জন্য মাসে এক হাজার টাকা পরিশোধ করতে হয়। ছোট একটা ঘরে তাদের পাঁচ থেকে ছয়জন থাকতে হয়।

রাতের বেলায় ঘরের মধ্যে নড়াচড়া করতে কষ্ট হয়। বস্তির চিপা গলিতে চলাফেরা করা অনেক কঠিন। নিয়মিত পানি ও বিদ্যুৎ বিল দিলেও সব সময় এ সুবিধা পাওয়া যায় না। তা ছাড়া একটি শৌচাগারে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন লোক ব্যবহার করে। অনেক কষ্টের মধ্যে বস্তিতে থাকতে হয় বলে জানান তারা।

জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে এসব বস্তিতে বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য কেনাবেচা হচ্ছে। বিভিন্ন মহলে মাসোহারা দিয়ে বস্তিতে বসবাসকারী কিছু বখাটে নিয়মিত মাদকদ্রব্যের কারবার করে। বস্তির অনেকে সে মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েছেন। বিভিন্ন স্থানীয় নেতাকর্মীরা এসব মাদক সরবারহ করছে। তা ছাড়া বস্তির লোকজন চুরি, ছিনতাই ও হত্যার মতো বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোতে এবং কখনো দেশের বাইরে অভিবাসন নিচ্ছে বাস্তুচ্যুতরা। ফলে শহরগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে। স্বাধীনতার অর্ধশতক পরও যেন শুধু একটি শহর নয়, একটি অদৃশ্য শ্রেণীবৈষম্যের চিত্রপট। এই শহরের এক কোণে যেমন দামি অ্যাপার্টমেন্ট, চকচকে গাড়ি, বিলাসবহুল ব্যবহার্য জিনিসপত্র নিয়ে গড়ে ওঠা ধনীদের রাজত্ব, অন্য কোণে স্যাঁতসেঁতে ঘর, কাদামাখা রাস্তা, টিনের চালার নিচে গড়ে ওঠা দরিদ্রদের জীবনসংগ্রাম। এখানে যেমন রয়েছে গুলশান-বনানীর ঝলমলে আলো, তেমনই রয়েছে মিরপুর, কড়াইল ও রায়েরবাজারের বস্তির অন্ধকার দিক। এই দ্বৈত রূপই যেন ঢাকাকে বিভক্ত করে ফেলেছে দুই ভাগে বস্তি আর বিলাসবহুলতায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান খান বলেন, জলবায়ু বিপর্যয় এখন শহরমুখী অভিবাসনের অন্যতম কারণ।

এ ছাড়াও অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণেও বস্তিতে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। তবে রাজনৈতিক কারণে আসা মানুষের সংখ্যা কম। তিনি বলেন, বস্তিজনিত সঙ্কট থামাতে হলে প্রথমেই গ্রাম উন্নয়নে জোর দিতে হবে। কর্মসংস্থান না বাড়ালে ঢাকামুখী যাত্রা থামবে না। স্থানীয় সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতার কারণে বস্তিবাসীরা মৌলিক সেবাটুকু পান না।