বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেছেন, নতুন সরকারের সামনে অর্থনীতিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করানো এখন শুধু একটি নীতিগত কাজ নয়, বরং এটি টিকে থাকার লড়াই। তিনি উল্লেখ করেন, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা, কর্মসংস্থান সঙ্কট এবং বিপর্যস্ত ব্যাংকিং খাত- সবমিলিয়ে নতুন সরকারের জন্য পরিস্থিতি বেশ কঠিন।
দৈনিক নয়া দিগন্তকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। নিচে তার সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো-
প্রশ্ন : নতুন সরকার যে অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দায়িত্ব নিলো-সামগ্রিকভাবে চ্যালেঞ্জটা কিভাবে দেখছেন?
ড. মুজেরি : যদি রাজনীতি বাদ দিয়ে কেবল অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে বলি, তাহলে পরিস্থিতি খুবই ভঙ্গুর। প্রধান অর্থনৈতিক সূচকগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায়- সবখানেই নেতিবাচক চিত্র। মূল্যস্ফীতি এখনো ৮.৫৯ শতাংশের আশপাশে, যা নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। প্রবৃদ্ধি কমেছে, বিনিয়োগ কমেছে, কর্মসংস্থান বাড়েনি। অন্তর্বর্তী সরকারও দৃশ্যমান কোনো উন্নতি আনতে পারেনি। ফলে নতুন সরকারকে প্রায় একই ভঙ্গুর অর্থনীতিই উত্তরাধিকার হিসেবে নিতে হয়েছে।
প্রশ্ন : আপনি বলছেন অর্থনীতি ‘ভঙ্গুর’ এটা কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
ড. মুজেরি : গত বছরের গণ-অভ্যুত্থানের সময় অনেক দুর্বলতা আড়ালে ছিল। পরে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর ব্যাংক খাতের দুর্নীতি, খেলাপি ঋণ, অপচয়-সব বেরিয়ে আসে। দেড় বছরেও সেসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। আজো অর্থনীতির মৌলিক খাতগুলো দুর্বল। তাই বলছি-অর্থনীতি কার্যত স্থবির অবস্থায় আছে।
প্রশ্ন : প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের চিত্র কতটা উদ্বেগজনক?
ড. মুজেরি : প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। দেশীয় বিনিয়োগ নেই, বিদেশী বিনিয়োগ তো আরো কম। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। সরকারি হিসাবেই প্রায় ২৮ লাখ বেকার বাস্তবে সংখ্যাটা আরো বেশি হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে অর্থনীতির গতি ফেরানোই সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত।
প্রশ্ন : মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়ে আপনার সুপারিশ কী?
ড. মুজেরি : মূল্যস্ফীতি কমানোই সবচেয়ে জরুরি। কারণ এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে নিম্নআয়ের মানুষ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর। বাজার ব্যবস্থাপনা শক্ত করা, সরবরাহ বৃদ্ধি, নীতি সমন্বয়- এসব দ্রুত করতে হবে। লাগাম টেনে ধরতে না পারলে মানুষের জীবনযাত্রা আরো কঠিন হবে।
প্রশ্ন : বিনিয়োগ বাড়াতে কী ধরনের পরিবেশ দরকার বলে মনে করেন?
ড. মুজেরি : বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ মানে শুধু কর ছাড় নয়-আইনশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতি ধারাবাহিকতা, সামাজিক শান্তি সবমিলিয়ে একটি নিরাপদ পরিবেশ। বিনিয়োগকারী যদি ঝুঁকি দেখেন, তারা আসবেন না। নতুন সরকার এ ক্ষেত্রে আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারলে দেশীয় ও বিদেশী উভয় বিনিয়োগই বাড়বে।
প্রশ্ন : উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে মূল্যস্ফীতির সম্পর্ক কিভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে?
ড. মুজেরি : উৎপাদন বাড়লে বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়বে, ফলে দাম কমার প্রবণতা তৈরি হবে। একই সাথে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ উৎপাদন বৃদ্ধি করলে এক দিকে মূল্যস্ফীতি কমবে, অন্য দিকে বেকারত্বও কমবে- দুই দিকেই লাভ।
প্রশ্ন : ব্যাংক ও আর্থিক খাতের বর্তমান অবস্থা কতটা সংকটপূর্ণ?
ড. মুজেরি : খুবই খারাপ। খেলাপি ঋণ ৩৬-৩৭ শতাংশের মতো। অনেক ব্যাংক দুর্বল, আমানতকারীরা টাকা তুলতে পারছেন না। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গেছে। ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়েছে। ব্যাংকিং খাত সুস্থ না হলে অর্থনীতিও সুস্থ হবে না।
প্রশ্ন : এই খাতে দ্রুত কী পদক্ষেপ দরকার?
ড. মুজেরি : দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণ আদায়, সুশাসন নিশ্চিত করা, পরিচালনা ব্যবস্থার সংস্কার- এসব জরুরি। আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বড় সঙ্কট তৈরি হতে পারে।
প্রশ্ন : নতুন সরকারের জন্য কোনো নির্দিষ্ট রোডম্যাপের কথা বলবেন?
ড. মুজেরি : অবশ্যই। অন্তত ১০০ দিনের একটি কর্মপরিকল্পনা নেয়া উচিত- চাইলে ছয় মাসেরও হতে পারে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে কাজ করলে অর্থনীতির গতি ফিরবে।
প্রশ্ন : রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়টি অর্থনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলে?
ড. মুজেরি : খুব বড় প্রভাব ফেলে। নির্বাচনের ফল সবাই মেনে নিলে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে বিনিয়োগ বাড়বে। কিন্তু অস্থিরতা থাকলে কেউ বিনিয়োগ করবে না। তাই রাজনৈতিক স্থিরতা এখন অত্যন্ত জরুরি।
প্রশ্ন : আইনশৃঙ্খলা ও চাঁদাবাজির প্রসঙ্গ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
ড. মুজেরি : চাঁদাবাজি, দখলদারি, সিন্ডিকেট-এসব থাকলে ব্যবসা করা অসম্ভব। বিনিয়োগকারীরা নিরাপত্তা চান। বাজারে কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি বা মুনাফাখোরি বন্ধ করতে হবে। বাজারব্যবস্থাকে স্থিতিশীল ও স্বচ্ছ করতে হবে।
প্রশ্ন : সবমিলিয়ে নতুন সরকারের জন্য আপনার বার্তা কী?
ড. মুজেরি : প্রথম অগ্রাধিকার-মূল্যস্ফীতি কমানো। দ্বিতীয়, বিনিয়োগ ও উৎপাদন বৃদ্ধি। তৃতীয়-ব্যাংক খাত সংস্কার। চতুর্থ-রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। এই চারটি ক্ষেত্রেই দ্রুত, সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারলে অর্থনীতি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াবে। অন্যথায় সঙ্কট আরো দীর্ঘস্থায়ী হবে।



