এসএম মিন্টু
- ১০ লাখ টাকা চাঁদা না দিলে ঠিকাদারকে হত্যার হুমকি
- সড়কে গাছ ফেলে ভেকু ও স্কেভেটর ভাঙচুর
- রাস্তাটি নির্মাণ হলে ভোগান্তি কমবে স্থানীয়দের -ডিসি
- সেনাবাহিনীর সহযোগিতা প্রয়োজন : রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান
রাঙামাটি বগাছড়ি-নানিয়ারচর-লংগদু সড়কের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে গেলেও বর্তমানে সাত কিলোমিটার নির্মাণ কাজ বন্ধ থাকায় ওই সড়ক দিয়ে সব ধরনের চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে সাধারণ পাহাড়িদের। অভিযোগ উঠেছে, পাহাড়ে সশস্ত্র সন্ত্রাসীগোষ্ঠী ইউপিডিএফ (মূল) সদস্যরা অত্যন্ত দুর্গম দুই উপজেলার পাহাড়ে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাতে প্রতিবেশী দেশ থেকে ভারী অস্ত্র আমদানি ও মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার জন্য রাস্তার কাজ বন্ধ করে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। যার ফলে স্থানীয় সাধারণ পাহাড়িরাও ইউপিডিএফের সন্ত্রাসীদের কারণে সবসময় আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। ২৪ কিলোমিটারের এই সড়কটির কাজ সম্পন্ন হলে রাঙামাটি সদর থেকে নানিয়ারচর হয়ে লংগদু উপজেলার পাঁচ লাখ মানুষের যাতায়াত সহজ হবে।
অভিযোগ রয়েছে, সম্প্রতি মাত্র সাত কিলোমিটার সড়কের কাজে বাধা দিয়ে ঠিকাদারের কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে ইউপিডিএফ সদস্যরা। চাঁদা না দিলে ঠিকাদার ও শ্রমিকদের হত্যার হুমকি দিয়ে কাজ বন্ধ করে দেয়। এরই মধ্যে দু’টি যন্ত্র (ভেকু ও স্কেভেটর) ইউপিডিএফ সদস্যদের দ্বারা ইঞ্জিনে বালি দিয়ে নষ্ট করা হয়। এ ছাড়াও সম্প্রতি নানিয়ারচর-লংগদু সড়কের ডাকঘর মনপাড়া এলাকায় রাস্তার এলাইনমেন্ট ও ফিনিশিং কাজের স্থানে গর্ত করে মাটি সরিয়ে ফেলে ও রাস্তায় গাছের গুঁড়ি ফেলে কাজ বন্ধ করে দেয় সশস্ত্র ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীরা। স্থানীয় সূত্র-আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র মতে জানা গেছে, মূলত ইউপিডিএফ (মূল) শুধু চাঁদার জন্যই নয়, তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট উদ্দেশ্যে নানিয়ারচর-লংগদু সড়ক নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত করার ষড়যন্ত্র হিসেবে এই তৎপরতা চালাচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ের রাস্তাটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করা হলে ইউপিডিএফের সন্ত্রাসী কার্যক্রম যেমন কমে আসবে ঠিক তেমনই পাহাড়ি জনপদে স্বস্তি ফিরবে।
অন্য দিকে পর্যটকদের জন্য সাজেকের পথও প্রায় ১৫ কিলোমিটার কমে আসবে। অপর দিকে নানিয়ারচর ও লংগদুর বাসিন্দাদের রাঙাগামাটি শহরের পথ কমে আসবে অন্তত ছয় ঘণ্টা।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কৃষিবিদ কাজল তালুকদার গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, রাস্তাটির মাটিকাটা কাজ প্রায় সম্পন্ন করা হয়েছে। যেসব কাজ এখনো অসমাপ্ত রয়েছে সেগুলো করার চেষ্টা অব্যাহত রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, এখানের অনেক বিষয় আছে যা প্রকাশ করা যাচ্ছে না। তবে সড়ক ও জনপদ বিভাগের কাছে রাস্তাটির পিচঢালাইয়ের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এখন কাজ করতে হলে ব্যাপক নিরাপত্তার প্রয়োজন। সড়কের কাজটি সম্পন্ন করতে হলে সেনাবাহিনীর সহযোগিতা প্রয়োজন।
নানিয়ারচর-লংগদু দুই উপজেলার সংযোগ সড়কের বিষয়ে রাঙামাটি জেলা প্রশাসক (ডিসি) নাজমা আশরাফি গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, আমি জেলায় নতুন এসেছি। তবে এরই মধ্যে ওই সংযোগ সড়কের কারণে সাধারণ পাহাড়িরা দুর্ভোগে আছেন বলে আমি বিভিন্ন মাধ্যমে শুনেছি। রাস্তার কাজটি কেন আটকে আছে আমি সড়ক ও জনপদ বিভাগের কাছ থেকে শুনে বর্তমান অবস্থা কি তা বলতে পারব। তবে রাস্তাটি নির্মাণ হলে ভোগান্তি কমবে স্থানীয়দের এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
সড়ক ও জনপদ বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো: মনিরুজ্জামান গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, রাস্তাটির মাটি কাটা কাজ প্রায় সম্পন্ন। এখন নতুন করে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। কাজটি করবে সেনাবাহিনী। আগামী বছরের জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়েছে। শিগগিরই অর্ডার হয়ে যাবে। তিনি বলেন, পাহাড়ে কাজের অগ্রগতি অনেকটা থমকে যায় বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কারণে। আশা করি শিগগিরই রাস্তাটির উন্নয়ন কাজ শুরু করা যাবে।
তবে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য মিনহাজ মুরশীদ নয়া দিগন্তকে বলেন, বগাছরি-নানিয়ারচর-লংগদু সড়কের জেলা পরিষদের কাজ প্রায় সম্পন্ন। সড়ক ও জনপদ বিভাগে এরই মধ্যে পুনর্নির্মাণ এবং সম্প্রারণের লক্ষ্যে বিদ্যমান বৈদ্যুতিক তারসহ খুঁটি অপসারণ/স্থানান্তর কাজে ব্যয়ের জন্য গত ২২ ফেব্রুয়ারি একটি প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। সেটি এখনো অনুমোদন হযনি। এ ছাড়াও পিচ ঢালাইয়ের কাজের জন্য এখনো সড়ক ও জনপদ বিভাগ থেকে কাজের অনুমোদন হয়নি। যার ফলে কাজের অগ্রগতি নেই।
সম্প্রতি নানিয়ারচর সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের এক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি রাঙামাটি জেলার নানিয়ারচর-লংগদু এলাকা। পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় এই জায়গাটি শুধু সবুজ ঘেরা পাহাড়ই নয়, চারপাশ ঘেরা অসম সৌন্দর্যে ভরপুর। একপাশে বিশালাকারের পাড়ার অন্য দিকে মাইলের পর মাইল লেক এবং পাহাড়ি সরু পথ। তবে এই সুন্দরের ভাজে ভাজে লুকিয়ে আছে এক অজানা আতঙ্ক। নানিয়ারচর-লংগদু এলাকা জনবিচ্ছিন্ন হওয়ায় সেখানে আস্তানা গেড়েছে পাহাড়ের সশস্ত্র সন্ত্রাসীগোষ্ঠী ইউপিডিএফ। মাত্র সাত কিলোমিটার সড়কটি নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করা হলে স্থানীয়দের রাঙামাটির শহরে যেতে সময় বাঁচবে সাড়ে ছয় ঘণ্টা। স্থানীয়দের অনুরোধে গত বছর সড়কের কাজ শুরু করলে সেই কাজে বাধা দেয় সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ইউপিডিএফ।
নানিয়ারচর উপজেলা হতে লংগদু উপজেলা পর্যন্ত আনুমানিক সাত কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ/সংস্কার কাজের প্রেক্ষিতে ইউপিডিএফ (মূল) নানিয়ারচর ইউনিটের পরিচালক অতল চাকমা ওরফে সুর্কীতি চাকমা ঠিকাদার মো: তানভীরের কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা প্রদান না করলে কাজ বন্ধ করে দেয়ার এবং গুলি করার হুমকি দেন। পরবর্তীতে চাঁদা না দেয়ায় ঠিকাদারের রাস্তার কাজে ব্যবহৃত দু’টি যন্ত্র (ভেকু ও স্কেভেটর) ইউপিডিএফ সদস্যদের দ্বারা ইঞ্জিনে বালি দিয়ে নষ্ট করা হয়।
স্থানীয়রা জানান, ইউপিডিএফ (মূল) পূর্বে তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং নানিয়ারচর-লংগদু সড়কের আশেপাশে তাদের প্রভাব বলয় কমে যাওয়ার আশঙ্কায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সড়ক নির্মাণ কাজ বন্ধ করার চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। একপর্যায়ে ব্যর্থ হওয়ায় বর্তমানে সংগঠনটি কৌশল পরিবর্তন করে চাঁদার রেট বাড়ানো এবং বিভিন্ন উপায়ে সড়ক নির্মাণ কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। ওই সূত্র জানায়, সম্প্রতি ঠিকাদার চাঁদা দিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। ইউপিডিএফ সদস্যরা চাঁদা না নিয়ে উল্টো সড়ক উন্নয়ন কাজে বাধা দিচ্ছে এবং সাধারণ পাহাড়িদের ওই সড়কে চলাচল বন্ধ করে দেয়। এরই মধ্যে কয়েকজনের গতিপথ বন্ধ করে মোবাইল ফোন, বাই সাইকেল ও নগদ অর্থ জোরপূর্ব নিয়ে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। যার কারণে কাঁচা মাটির সড়কে চলাচলেও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে।
গত ১০ মার্চ ইউপিডিএফ (মূল) সাবেক্ষং সাব-পোস্ট পরিচালক সর্বানন্দ চাকমা ওরফে ভূমিবল চাকমার নেতৃত্বে আরো দুই জন সদস্যসহ আবারো রাস্তার কাজে বাধা দেয়া হয়। নানিয়ারচর-লংগদু সড়কের মাটি কাটার কাজে নিয়োজিত ডোজার ড্রাইভার আল-আমিন ডোজার নিয়ে লংগদু এলাকার উদ্দেশ্যে যাওয়ার সময় নানিয়ারচর উপজেলার সাবেক্ষং ইউপির রাঙ্গীপাড়া যাত্রী ছাউনির সামনে ডোজারটি থামিয়ে ডোজার ও তাকে আটক করে।
যে কারণে রাস্তাটি নানিয়ারচর-লংগদু বাসীর জন্য দরকার : নানিয়ারচর-লংগদু উপজেলা সদর থেকে নৌপথে রাঙামাটি জেলা শহরে পৌঁছাতে যে প্রায় সাড়ে ৪ ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। সড়কটি নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলে যাতায়াতের সময় নেমে আসবে দুই ঘণ্টায়। এই রাস্তা সম্পূর্ণ হলে লংগদুবাসীর শুধু যাতায়াতের সময়ই কমবে না। এর সাথে সাথে উভয় এলাকার জনসাধারণ পাবে দ্রুত চিকিৎসা ব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত উপস্থিতি, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণের প্রসার এবং প্রশাসনিক সেবার সহজলভ্যতা। নানিয়ারচরের সাথে লংগদু উপজেলার প্রত্যক্ষ সংযোগ স্থাপিত হলে এর সাথে যুক্ত হবে দেশের বৃহত্তর বাঘাইছড়ি উপজেলা। ফলে এক বিস্তৃত জনসমষ্টি জেলা শহরসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সাথে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগে সক্ষম হবে।



