এক সময়ে দোর্দণ্ড দাপট দেখানো আওয়ামী লীগ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে রাজনীতির মাঠ থেকে ছিটকে পড়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠিত হয়। গেল বুধবার জাতীয় সংসদে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত ব্যক্তি বা সত্তার কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ অনুমোদন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে রাজনীতির ময়দান থেকে ছিটকে পড়া দলটি বিদায় হওয়ার পথ গুনছে। এরআগে অবশ্য নজিরবিহীনভাবে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরই সাবেক ক্ষমতাসীনদের নেটওয়ার্ক একেবারে ভেঙে পড়েছিল। তারপরও নানা কলাকৌশলে দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন দফতরে ঘাপটি মেরে থাকা দোসরদের মাধ্যমে সাবেক ক্ষমতাসীনরা তাদের নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে পুনর্বাসনের চেষ্টা করেও হালে পানি পায়নি। নির্বাচনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ে রাজনীতিতে কিছুটা স্পেস তৈরি হয়েছে এমনটি মনে করে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সুবিধাভোগী আমলা ও পতিত দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের মাধ্যমে পুনরায় সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দিল্লিতে অবস্থান করলেও তার বলয়ের নেতৃত্ব এখনো দেশ-বিদেশে দলীয়ভাবে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করছে। শেখ হাসিনার নির্দেশ মতোই দেশ-বিদেশে কয়েকটি নেটওয়ার্ক সক্রিয়ভাবে কাজ করছে এবং দলীয়ভাবে সংগঠিত হয়ে সাংগঠনিক কাঠামো গোছানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। পতিত আওয়ামী লীগের নেটওয়ার্ক এখন দুইটি ধারায় সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। প্রথমত দলের শীর্ষ রাজনীতিকরা বিদেশে বসেই দলীয় একাধিক সোশ্যাল মিডিয়ার গ্রুপের মাধ্যমে তৃণমূল থেকে শুরু করে কেন্দ্রকে ঢেলে সাজানোর কাজটি অব্যাহত রেখেছেন। দ্বিতীয়ত আওয়ামী সমর্থিত ও সুবিধাভোগী আমলাদের একটি বড় অংশ বিদেশে বসে আন্তর্জাতিক লবিং জোরদার করার চেষ্টা করছেন।
সূত্র আরো বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আওয়ামী লীগ প্রধান ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি বিশেষ হেলিকপ্টারে ভারতে পালিয়ে নিরাপদ আশ্রয় নেন। এর বেশ কিছুদিন পর পরিস্থিতি বুঝে শীর্ষ নেতাদের অনেকেই ছাত্র-জনতার রোষানল থেকে বাঁচতে কলকাতায় পাড়ি জমান। এরমধ্যে রয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক ও মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ও মাহবুবউল আলম হানিফ, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, পতিত আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম, অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন ও এস এম কামাল হোসেন, সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত উল্লেখযোগ্য। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তত আড়াই থেকে তিন হাজার নেতা কলকাতায় পাড়ি জমিয়েছেন। যদিও পতিত দলটির শীর্ষ নেতা মাহবুবউল আলম হানিফ বর্তমানে কানাডায় অবস্থান করছেন এবং সেখান থেকে দলীয় প্রয়োজনে মাঝে মধ্যে কলকাতা গমন করেন বলে জানা গেছে। লন্ডনে অবস্থান করছেন সাবেক মন্ত্রী ও পতিত দলটির শীর্ষ নেতা আবদুর রহমান ও খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। সেখান থেকেই শেখ হাসিনার নির্দেশ অনুযায়ী দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন বলে জানা গেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরপরই বেলজিয়ামে পাড়ি জমান পতিত দলটির প্রভাবশালী নেতা ও মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। তিনিও দলের প্রয়োজনে মাঝেমধ্যে ভারতে সফর করেন বলে জানা গেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ভারতের দিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ড. হাছান মাহমুদ ও মহিবুল হাসান চৌধুরীকে দীর্ঘদিন পর প্রকাশ্যে আসতে দেখা যায়। যেটা সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়। এ ছাড়াও ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সাবেক বন ও পরিবেশ মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী, পতিত দলটির বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন, ত্রাণ ও সমাজ কল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দীসহ আরো বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা দেশের অভ্যন্তরের নেটওয়ার্কে সক্রিয় থেকে দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং গোপনে দল গোছানোর কাজটি করছেন বলে সূত্রে জানা গেছে।
এ দিকে দীর্ঘ ২০ মাস আত্মগোপনে থাকার পর গেল সপ্তাহে ধানমন্ডি থেকে গ্রেফতার হন সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। তারও আগে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে গ্রেফতার হন স্বেচ্ছাসেবক লীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি কামরুল হাসান রিপন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরপরই গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, পতিত আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা আমির হোসেন আমু, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, ফারুক খান ও ডা: মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ও অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী ডা: দীপু মনি, সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকসহ আরো বেশ কয়েকজন। আবার ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পরপরই আত্মগোপনে চলে যাওয়া শীর্ষ নেতাদের কেউ কেউ এখনো পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেননি। জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়ায়ও তাদের উঁকি মারতে দেখা যায়নি।
অপর দিকে আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী আমলাদের মধ্যে সাবেক সচিব কবির বিন আনোয়ার ও নজরুল ইসলাম খান লন্ডনে রয়েছেন। এরমধ্যে কবির বিন আনোয়ার ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে প্রশাসনকে ম্যানেজ করার দায়িত্বে ছিলেন বলে জানা গেছে। সাবেক এই দুই আমলা লন্ডনে গিয়ে শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে আওয়ামী লীগকে গোছানোর কাজে সহযোগিতা করছেন বলে সূত্রের দাবি। পাশাপাশি শেখ হাসিনার নির্দেশে কবির বিন আনোয়ার ও এনআই খানসহ ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সুবিধাভোগী আমলারা পতিত দলটির পক্ষে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিকবিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্কোন্নয়নের জন্য কাজ করছেন এবং অতীতের বদনাম ঘুচিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক করে কিভাবে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করা যায় সেজন্য চেষ্টা তদবির করছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।



