বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা কাটাতে সুদের হার কমানো, ডলার বাজারে স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন দেশের শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠনগুলোর নেতারা। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে চাপ বাড়ার ফলে নতুন বিনিয়োগে উদ্যোক্তারা আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে প্রত্যাশিত গতি না ফেরায় সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনীতিতে চাপ অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো। সংশ্লিষ্টদের মতে, উচ্চ সুদের হার, ডলার সঙ্কট, জ্বালানি ঘাটতি ও নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে পড়েছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জিডিপির তুলনায় বেসরকারি বিনিয়োগের হার দাঁড়ায় প্রায় ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় সামান্য বৃদ্ধি পেলেও প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রাক্কলনে এ হার ২৪ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, বর্তমানে ব্যাংকঋণের সুদের হার ১২ থেকে ১৪ শতাংশে অবস্থান করায় নতুন বিনিয়োগে উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। তাদের মতে, এ হার এক অঙ্কে না নামানো গেলে শিল্পখাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ আসা কঠিন হবে। একই সাথে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সঙ্কট ও খেলাপি ঋণের চাপ বিনিয়োগ পরিবেশকে আরো জটিল করে তুলছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে ব্যাংকঋণের সুদের হার ১২ থেকে ১৪ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করছে, যা শিল্পখাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাদের মতে, প্রতিযোগী দেশগুলোতে এই হার ৬ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন শিল্প স্থাপন কিংবা সম্প্রসারণে উদ্যোক্তারা ঝুঁকি নিতে চাইছেন না বলে তারা মনে করছেন।
দেশের শিল্প উদ্যোক্তারা ডলার সঙ্কটকেও বিনিয়োগ স্থবিরতার অন্যতম বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কয়েক বছরের ব্যবধানে ৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে নেমে প্রায় ২০-২২ বিলিয়ন ডলারে এসেছে। এতে আমদানি ব্যয় নির্বাহে চাপ তৈরি হয়েছে এবং শিল্পখাতে কাঁচামাল আমদানিতে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এলসি খোলা ও নিষ্পত্তিতে জটিলতা থাকায় অনেক কারখানাই পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল নয়া দিগন্তকে বলেন, জ্বালানি খাতের সঙ্কটও বিনিয়োগে বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্যাস সরবরাহে ঘাটতির কারণে অনেক কারখানা ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং বিনিয়োগের রিটার্ন কমে যাচ্ছে। তারা দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।
করনীতি ও নীতিগত অনিশ্চয়তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, প্রায়ই করহার পরিবর্তন, নতুন শুল্ক আরোপ কিংবা নীতির হঠাৎ পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট করছে। তিনি কমপক্ষে ৫ থেকে ১০ বছরের জন্য স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য করনীতি প্রণয়নের দাবি জানান।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু নয়া দিগন্তকে বলেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাও বিনিয়োগে বড় বাধা। একটি বড় শিল্প প্রকল্প অনুমোদন পেতে অনেক ক্ষেত্রে ৬ মাস থেকে ১ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। এতে বিনিয়োগ ব্যয় বেড়ে যায় এবং অনেক উদ্যোক্তা মাঝপথে পরিকল্পনা বাতিল করতে বাধ্য হন। এজন্য তিনি কার্যকর ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ চালুর মাধ্যমে অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার দাবি জানান।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও বিনিয়োগে প্রভাব ফেলছে। বন্দর জট, উচ্চ পরিবহন ব্যয় এবং লজিস্টিক দুর্বলতার কারণে রফতানি খাতে প্রতিযোগিতা কমছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, দেশের লজিস্টিক খরচ অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের মোট মূল্যের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় বেশি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনা, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনা, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা কাটানো সম্ভব। অন্যথায় আগামী বছরগুলোতে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি আরো কমে যেতে পারে বলে তারা মনে করছেন।



