- সত্যায়ন তুলে দেয়ার দাবি
- ওমরাহর নাম করেও লিবিয়ায় যাচ্ছে
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ইমিগ্রেশনের চিহ্নিত কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেই প্রতিনিয়ত বডি কন্ট্রাক্টে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আদম পাচারের কার্যক্রম জোরেশোরে চলছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই চক্রের সদস্যরা কখনো ওমরাহর নামে, কখনো নন-বিএমইটির (অসত্যায়িত) নামে, আবার কখনো ভিজিট ভিসার নামে নিরাপদে উড়োজাহাজ পর্যন্ত উঠার সুযোগ করে দিচ্ছে।
বিদেশ যাওয়ার পর পরবর্তীতে এসব তরুণের অনেকেরই ঠাঁই হচ্ছে কারাগারে অথবা ডিটেনশন সেন্টারে। এদের মধ্যে অনেকে সাগর পথে ইউরোপের দেশ ইতালি পাড়ি দিতে গিয়ে ভূমধ্যসাগরেই ডুবে মারা যাচ্ছে। আবার অনেকে উদ্ধারও হচ্ছে।
অভিবাসন বিশ্লেষকরা বলছেন, অবৈধভাবে যারা না জেনে-শুনে বিদেশে যাচ্ছে, তাদের মোটিভেশনাল প্রোগ্রামের আওতায় আনতে হবে, সচেতন করাতে হবে। একই সাথে মানবপাচার দালাল চক্র, এয়ারলাইন্স সংশ্লিষ্টসহ জড়িতদেরকে তদন্ত করে খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে হবে। নতুবা এভাবে অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়া কখনোই কমবে না।
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর টার্মিনালে দীর্ঘ দিন ধরে কর্মরত এমন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নয়া দিগন্তকে নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, গত তিন-চার দিন ধরে ইমিগ্রেশন বিভাগে একটু কঠোরতা দেখছি। মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কার ফ্লাইটে ভিজিট ভিসার যাত্রীদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। মোট কথা তাদের ক্লিয়ারেন্স একদমই দিচ্ছে না। তার পরও এয়ারপোর্টের আশপাশে আস্তানা গেড়ে বসা মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যদের পাঠানো লোক বডি কন্ট্রাক্টে কোনো না কোনোভাবে ঠিকই যাচ্ছে। এদেরকে ইমিগ্রেশনের কিছু কর্মকর্তা সুযোগবুঝে পার করে দিচ্ছেন বলে অনেক আগে থেকেই তারা দেখে আসছেন।
তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে লিবিয়ায় মানবপাচার করছেন আকরাম নামে এক ব্যক্তি। তার আস্তানা হাজী ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকায়। বিদেশে লোক পাঠাতে তার কোনো লাইসেন্সও লাগে না, অফিসও লাগে না। তাকে বিমানবন্দরের সবাই কমবেশি চেনে।
শুধু আকরাম নয়, এই চক্রের সদস্য হয়ে দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করছে টমাস ও বেল্লাল নামে দুই ব্যক্তি। টমাস এবং বেল্লাল দু’জনে পার্টনার। এদের নাকি অফিস আছে আশকোনায়। এই চক্রের সদস্যরা কখনো বড় স্যারদের, আবার কখনো ছোট্ট স্যারদের সাথে বডি কন্ট্রাক্ট করে বিভিন্ন রুটে বিভিন্ন প্যাকেজে যাত্রী তুলে দিচ্ছেন।
এক প্রশ্নের জবাবে তারা বলেন, এরা কখনো ওমরাহ ভিসার নামে সৌদি পাঠিয়ে সেখান থেকে মিসর নেয়। এর পর বেনগাজি হয়ে লিবিয়ায় পাঠায়। আবার কখনো ভিজিট ভিসার নামে মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কায় পাঠাচ্ছে। আবার নন-বিএমইটি ক্লিয়ারেন্সে মালদ্বীপের ফ্লাইটে তুলে দিচ্ছে। এসব যাত্রীর গন্তব্য অজানা হওয়ায় পরবর্তীতে তাদের কারো কারো ঠাঁই হয় ওই সব দেশের জেলে, কারো ডিটেনশন সেন্টারে। কেউ আবার গ্যাং লিডারদের চক্করে পড়ে লিবিয়া থেকে সাগর পথে পাড়ি দেয় ইতালি। তার তখনই ঘটে বিপত্তি।
সর্বশেষ চলতি মাসে সাগর পথে ইতালি যাওয়ার সময় উত্তাল সাগরে ১০ বাংলাদেশীর মৃত্যু হয়। জীবিত উদ্ধার হয় ২৬ জন। এ ধরনের ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে।
গতকাল বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমানের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, যারা অবৈধভাবে বিদেশে যাচ্ছে তাদের পাঠানোর সাথে আমাদের রিক্রুটিং এজেন্সির কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই। এসব ঘটনার সাথে নামধারী ট্র্যাভেল এজেন্সিগুলো জড়িত। তারা কারা এটা সরকার তদন্ত করলেই পেয়ে যাবে। তবে জেনে হোক না জেনে হোক যারাই যাচ্ছেন তারা নির্দিষ্ট এলাকার লোক। তারা মূলত মানবপাচারকারী চক্রের ফাঁদে পড়ে যাচ্ছেন। এ জন্য জেলায় জেলায় এসব লোককে মোটিভেশনাল প্রোগ্রামের আওতায় আনতে হবে। বিদেশগামীদের সাথে তাদের আপনজনদেরকেও সচেতন করতে হবে এর কোনো বিকল্প নেই।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি দাবি করেন, এমপ্লয়মেন্ট ভিসা ছাড়া কেউ অন্যভাবে বিদেশ গেলে সেটি বৈধ নয়। অনেকে ভিসা আসার পর সব কিছু হওয়ার পরও সঠিক সময়ে বিদেশ যেতে পারে না। এই সুযোগে কেউ কেউ তার যাত্রীকে এয়ারপোর্ট দিয়ে তুলে দিতে পারে। এর অন্যতম কারণ আমাদের বাংলাদেশ দূতাবাসের সত্যায়ন না থাকা। আমার মতে বিদেশগামীদের জন্য ভিসাই হচ্ছে আসল জিনিস। ভিসা ঠিক থাকলে সত্যায়ন লাগে না। এটা কর্মীর থাকলে তার বিদেশ যেতে সমস্যা নেই। তার পরও শুধু আমাদের দেশেই সত্যায়ন নিয়ে জটিলতা তৈরি করা হচ্ছে। এটা তুলে দিলে অবৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার ঘটনা তথা মানবপাচার কমে আসবে। তখন বিদেশগামীর সংখ্যাও বাড়বে।
ফ্লেয়ার রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক আনিসুর রহমান বলেন, ইদানীং লিবিয়াগামীদের আদম পাচার সিন্ডিকেটের সদস্যরা প্রথমে ওমরাহ ভিসায় সৌদি নিচ্ছে। সেখান থেকে মিসর, এর পর লিবিয়া নেয়ার নতুন রুট খুলেছে।



