ডিজিটাল লেনদেনে বাড়ছে ঝুঁকি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন গ্রাহকরা

সাম্প্রতিক সময়ে মোবাইল ব্যাংকিং প্রতারণার কৌশল আরো প্রযুক্তিনির্ভর ও মনস্তাত্ত্বিক হয়ে উঠেছে। সাধারণত যে পদ্ধতিগুলো বেশি দেখা যাচ্ছে তা হলো, ওটিপি ও পিন হাতিয়ে নেয়া। নিজেকে কাস্টমার কেয়ার পরিচয় দিয়ে ফোন করে ওটিপি বা পিন জেনে নেয়া। দ্বিতীয়ত, ফিশিং লিঙ্ক। ভুয়া এসএমএস বা মেসেঞ্জার লিংকের মাধ্যমে অ্যাপের নকল পেজে ঢুকিয়ে তথ্য নেয়া। তৃতীয়ত, কেওয়াইসি আপডেট প্রতারণা। এর মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে, এমন ভয় দেখিয়ে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ। চতুর্থ সিম সোয়াপ জালিয়াতি। এর মাধ্যমে জালিয়াতি চক্র মোবাইল নম্বরের ডুপ্লিকেট সিম তুলে অ্যাকাউন্ট নিয়ন্ত্রণ নেয়া। পঞ্চম হলো মার্চেন্ট প্রতারণা। এর মাধ্যমে কিউআর কোড বা পেমেন্ট স্ক্রিনশট জাল করে পণ্য নিয়ে পালানো হয়।

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition

বাংলাদেশে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ও ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার গত এক দশকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। শহর থেকে গ্রাম- সবখানেই বিকাশ, রকেটসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বেতন, রেমিট্যান্স, সরকারি ভাতা, কেনাকাটা থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসার লেনদেন পর্যন্ত সম্পন্ন হচ্ছে মুহূর্তেই। তবে লেনদেন যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে প্রতারণা ও সাইবার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ। প্রশ্ন উঠছে, নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত?

লেনদেন বৃদ্ধি

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের গ্রাহক সংখ্যা ২০ কোটির কাছাকাছি। প্রতিদিন গড়ে লেনদেন হচ্ছে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা থেকে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা। মাসিক লেনদেনের পরিমাণ এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বড় অংশ এখন এমএফএসের মাধ্যমে বিতরণ হচ্ছে। ডিজিটাল কমার্স, ইউটিলিটি বিল, ট্রেন-বাসের টিকিট, ফ্রিল্যান্স আয়ের অর্থ গ্রহণ- সব ক্ষেত্রেই মোবাইল ওয়ালেট ব্যবহারের হার দ্রুত বাড়ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি ক্যাশলেস অর্থনীতির দিকে বড় অগ্রগতি হলেও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সক্ষমতা একই গতিতে শক্তিশালী হয়নি।

প্রতারণার ধরন

সাম্প্রতিক সময়ে মোবাইল ব্যাংকিং প্রতারণার কৌশল আরো প্রযুক্তিনির্ভর ও মনস্তাত্ত্বিক হয়ে উঠেছে। সাধারণত যে পদ্ধতিগুলো বেশি দেখা যাচ্ছে তা হলো, ওটিপি ও পিন হাতিয়ে নেয়া। নিজেকে কাস্টমার কেয়ার পরিচয় দিয়ে ফোন করে ওটিপি বা পিন জেনে নেয়া। দ্বিতীয়ত, ফিশিং লিঙ্ক। ভুয়া এসএমএস বা মেসেঞ্জার লিংকের মাধ্যমে অ্যাপের নকল পেজে ঢুকিয়ে তথ্য নেয়া। তৃতীয়ত, কেওয়াইসি আপডেট প্রতারণা। এর মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে, এমন ভয় দেখিয়ে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ। চতুর্থ সিম সোয়াপ জালিয়াতি। এর মাধ্যমে জালিয়াতি চক্র মোবাইল নম্বরের ডুপ্লিকেট সিম তুলে অ্যাকাউন্ট নিয়ন্ত্রণ নেয়া। পঞ্চম হলো মার্চেন্ট প্রতারণা। এর মাধ্যমে কিউআর কোড বা পেমেন্ট স্ক্রিনশট জাল করে পণ্য নিয়ে পালানো হয়। সাইবার ক্রাইম ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিনই মোবাইল ব্যাংকিং প্রতারণার অভিযোগ জমা পড়ছে এবং ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা।

ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা

রাজশাহীর পবা উপজেলার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হাসান আলী (ছদ্মনাম) জানান, একদিন বিকেলে ফোন দিয়ে বলা হয় আমি নাকি সরকারি ভাতা পাব। কোড দিতে বললে সরল বিশ্বাসে দিয়ে দিই। পাঁচ মিনিটের মধ্যে অ্যাকাউন্ট খালি। ঢাকার এক গার্মেন্টস কর্মী বলেন, নগদের কাস্টমার কেয়ার পরিচয়ে ফোন দিয়ে বলে কেওয়াইসি আপডেট না করলে অ্যাকাউন্ট বন্ধ হবে। ভয় পেয়ে তথ্য দিই, পরে দেখি টাকা নেই। দেখা গেছে, ভুক্তভোগীদের বড় অংশই স্বল্পশিক্ষিত বা নতুন ব্যবহারকারী, যারা ডিজিটাল নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন নন।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি ব্যবহারকারীর সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মূল পরামর্শ- কখনোই ওটিপি, পিন, পাসওয়ার্ড কাউকে না দেয়া; অচেনা লিংকে ক্লিক না করা। অফিসিয়াল অ্যাপ ছাড়া অন্য কোথাও লগইন না করা, নিয়মিত পিন পরিবর্তন করা ও সন্দেহজনক কল সাথে সাথে কেটে দেয়া। আইটি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন, বায়োমেট্রিক লগইন, ট্রানজ্যাকশন লিমিট কাস্টমাইজেশন বাধ্যতামূলক করলে ঝুঁকি কমবে।

নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত?

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের এমএফএস প্ল্যাটফর্মগুলোর প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক মানের কাছাকাছি। বড় ধরনের হ্যাকিংয়ের ঘটনা তুলনামূলক কম। কিন্তু সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বা ব্যবহারকারীকে বোকা বানিয়ে তথ্য নেয়াই এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। অর্থাৎ সিস্টেম যতটা নিরাপদ, ব্যবহারকারী ততটা নয়। আগামীতে ডিজিটাল লেনদেন আরো বাড়বে, এটি নিশ্চিত। তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিগত সুরক্ষা জোরদার করা, দ্রুত প্রতিকার ব্যবস্থার পাশাপাশি গণসচেতনতা বাড়াতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস বড় ভূমিকা রাখছে। এটি যেমন অর্থনীতিকে গতিশীল করছে, তেমনি প্রতারণার নতুন ঝুঁকিও তৈরি করছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার উদ্যোগ, সেবাদাতাদের শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সর্বোপরি ব্যবহারকারীর সচেতনতা- এই তিনের সমন্বয়েই কেবল নিরাপদ ডিজিটাল লেনদেন নিশ্চিত করা সম্ভব।