নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ

সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীকে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, মাদক নির্মূল ও জুয়া বন্ধ করার পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এই সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মধ্যে জনসাধারণের নিরাপত্তার পাশাপাশি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নতুন করে ঢেলে সাজানো, লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের আটক এবং চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এ ছাড়াও সীমান্ত দিয়ে যেন অস্ত্র, চোরাচালান রোধ করা হয় সে ব্যাপারে সজাগ থাকার নির্দেশ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

Printed Edition

- মাদকবিরোধী অভিযান, লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের আটকের তাগিদ

- পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা

- চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা

এস এম মিন্টু

সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীকে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, মাদক নির্মূল ও জুয়া বন্ধ করার পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এই সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মধ্যে জনসাধারণের নিরাপত্তার পাশাপাশি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নতুন করে ঢেলে সাজানো, লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের আটক এবং চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এ ছাড়াও সীমান্ত দিয়ে যেন অস্ত্র, চোরাচালান রোধ করা হয় সে ব্যাপারে সজাগ থাকার নির্দেশ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে বৈঠক করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বৈঠকে পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাবের মহাপরিচালক, বিজিবি মহাপরিচালকসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সব স্টেকহোল্ডার উপস্থিত ছিলেন।

দেখা গেছে, নতুন সরকারের সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই সংবেদনশীল হয়ে ওঠে, কারণ মাঠপর্যায়ে মতার ভারসাম্য পুনর্নির্ধারণ, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস এবং প্রত্যাশা-বাস্তবতার টানাপড়েন সাময়িক অনিশ্চয়তা তৈরি করে। ফলে নতুন সরকারের জন্য শাসনব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। আবার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে অর্থনীতিও সচল থাকতে পারে না। শিল্পকারখানা, বন্দর, পরিবহন সবকিছুই নিরাপদ পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। বিনিয়োগকারীরা স্থিতিশীলতা চান। দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়া ও অপরাধ দমনে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি বলেও মনে করে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, আইনশৃঙ্খলা ও অর্থনীতি একে অপরের পরিপূরক। নিরাপত্তা ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না, আবার অর্থনৈতিক স্বস্তি ছাড়া সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় না। তাই নতুন সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত এই দুই খাতে সমন্বিত ও সময়োপযোগী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ।

তিনি আরো বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য শুধু পুলিশ বাড়ানো বা অভিযান চালানো যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন গোটা বিচারব্যবস্থার সমন্বিত সংস্কার। তদন্তের মান উন্নত করা, মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে অপরাধপ্রবণতা কমবে না। পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার করা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাদার বাহিনী গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।

অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে নাজুক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী : জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর গত ১৮ মাসে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে অনেকের। রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিােভ, ‘মব’ সহিংসতা, দখলদারি ও অবরোধের মতো ঘটনায় জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। প্রশাসনিক ভবন ঘেরাও, রাস্তা অবরোধ ও সহিংসতার মতো ঘটনা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে। নতুন সরকারের প্রথম চ্যালেঞ্জ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমতা তৈরি ও জন-আস্থা অর্জন করা।

এছাড়া মতার পালাবদলের পর স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে সঙ্ঘাত, দখল বা প্রতিশোধমূলক সহিংসতার ঝুঁকি আছেই। অতীতে এ সময়গুলোতে বিচ্ছিন্ন সহিংসতার ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে, যা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনলে তা বিস্তৃত অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে। ফলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা পূর্বশর্ত। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, ভোটের পর মুন্সীগঞ্জে সহিংস ঘটনায় একজন নিহত হয়েছেন। একইভাবে বাগেরহাটেও সহিংসতায় একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া সিলেট, কুমিল্লা, নরসিংদী, ফেনী, গাজীপুর, নাটোর, ঝালকাঠি, নড়াইল, পাবনা, বগুড়া, ফরিদপুর, বরগুনা, ঝিনাইদহ, চাঁদপুর, পটুয়াখালী, কিশোরগঞ্জ, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন জেলায় হামলার ঘটনায় দুই শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পুলিশ সদর দফতরের পরিসংখ্যান বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অপরাধের কিছু সূচকে বৃদ্ধি দেখা গেছে। ২০২৫ সালে সারা দেশে চুরির মামলা হয়েছে ৯ হাজার ৬৭২টি, ছিনতাই এক হাজার ৯৩৫টি এবং ডাকাতি ৭০২টি- যা আগের বছরের তুলনায় বেশি। ২০২৪ সালে যথাক্রমে ছিল আট হাজার ৬৫৫টি, এক হাজার ৪১২টি ও ৪৯০টি। হত্যা মামলার সংখ্যাও উদ্বেগজনক। গত পাঁচ বছরে মোট ১৬ হাজার ৬৩১টি হত্যা মামলা হয়েছে, যার মধ্যে সর্বোচ্চ তিন হাজার ৮৩৬টি মামলা হয়েছে ২০২৫ সালে। নারী ও শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণ সংক্রান্ত মামলার সংখ্যাও পাঁচ বছরে এক লাখ দুই হাজার ৮৪৫টি, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির গভীর সঙ্কটের ইঙ্গিত দেয়। ২০২৫ সালে ২২ হাজার ৪৩১টি এবং ২০২৪ সালে ১৭ হাজার ৫৭১টি। এমন পরিস্থিতিতে নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ এই অপরাধগুলো কমিয়ে আনা।

লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ফের আটক : অন্তর্বর্তী সরকার বারবার ঘোষণা দেয়ার পরও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দেড় বছর পর পুলিশের যেসব আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়েছিল সেগুলো পুরোপুরি উদ্ধার করা যায়নি। এখনও হদিস না পাওয়া এক হাজারেরও বেশি আগ্নেয়াস্ত্র এবং দুই লাখের বেশি গোলাবারুদ নিয়ে ভয়-আতঙ্ক রয়েছে। পুলিশ সদর দফতরের সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের সময় পুলিশের পাঁচ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র লুণ্ঠিত হয়। এর মধ্যে উদ্ধার হয়েছে চার হাজার ৪৩২টি। উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি এখনো এক হাজার ৩০টি আগ্নেয়াস্ত্র। এছাড়া লুণ্ঠিত গোলাবারুদের সংখ্যা ছিল ছয় লাখ ৫২ হাজার আটটি। এখন পর্যন্ত উদ্ধার হয়নি দুই লাখের বেশি গোলাবারুদ। এছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর কারাগার থেকে অনেক শীর্ষ সন্ত্রসীরা জামিনে মুক্তি পেয়েছেন, যা নতুন সরকারের গলার কাঁটা হতে পারে। এদের ফের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নেয়ায় নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে নতুন সরকারের নতুন পরিকল্পনা রয়েছে। থানা থেকে লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার ও জামিনে মুক্তি পাওয়া শীর্ষ সন্ত্রসীদের ফের গ্রেফতারেরও প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।

বাহিনীর সমতা ও সমন্বয় : আইনশৃঙ্খলা রায় প্রধান দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ পুলিশ, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন এবং অন্যান্য সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নতুন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীা হয়ে দাঁড়াবে। মাঠপর্যায়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত, জবাবদিহিতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাদারত্ব নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হতে পারে। পুলিশের অভ্যন্তরে কথা উঠেছে, পুলিশকে শক্তিশালী বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে সংস্কারের বিকল্প নেই। এছাড়া চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে বাহিনীর মধ্যে থাকা বর্তমান কর্মরতদের মধ্য থেকে আইজিপি ও ডিএমপি কমিশনার নিয়োগ দেয়া গেলে গতি আরো বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টদের অনেকেই।

পুলিশকে জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে : আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি শুধু অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ নয়, জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিচারহীনতার সংস্কৃতি কমানো, অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি এবং কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার করলে নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রতি আস্থা বাড়তে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। তাই নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীা হবে- আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি জন-আস্থা পুনর্গঠন করা।

চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা : দেশের সবচেয়ে অপরাধমূলক কাজের মধ্যে চাঁদাবাজি অন্যতম। দীর্ঘ একটি সময় একটি দল চাঁদাবাজি করে আসছিল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সময়েও এই চাঁদাবাজির হার কমে নাই। চাঁদাবাজির অভিযোগে বিএনপির নেতাকর্মীদের বহিষ্কার করার মতো ঘটনাও ঘটছে। তাই নতুন সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা ।