লাশ দু’বার কবর দিতে বাধ্য হচ্ছে লেবাননবাসী

Printed Edition
দক্ষিণ লেবাননের টাইর শহরে একটি সাময়িক গণকবরস্থানে আত্মীয়ের কবরের পাশে প্রার্থনা করছেন স্থানীয়রা	: ইন্টারনেট
দক্ষিণ লেবাননের টাইর শহরে একটি সাময়িক গণকবরস্থানে আত্মীয়ের কবরের পাশে প্রার্থনা করছেন স্থানীয়রা : ইন্টারনেট

দ্য গার্ডিয়ান

ইসরাইল দক্ষিণ লেবাননে আগ্রাসন বাড়ানোয় মানুষকে তাদের প্রিয়জনদের সাময়িকভাবে কবর দিতে হচ্ছে। লেবাননে সাধারণত লাশকে শেষবারের মতো নিজ শহরের রাস্তায় নিয়ে যাওয়া হয়। প্রিয়জনরা কবরস্থানে নিয়ে গিয়ে মাটি ছিটিয়ে দেন।

কিন্তু দক্ষিণ লেবাননে যুদ্ধ সেই বিদায় কেড়ে নিয়েছে। ইসরাইলের স্থল আগ্রাসনের কারণে পরিবারগুলোকে উত্তরাঞ্চলে সাময়িক কবরস্থানে লাশ দাফন করতে হচ্ছে। টাইর শহরে দুই মিটার প্রশস্ত গর্ত খুঁড়ে লাশ রাখা হচ্ছে। নামের বদলে লাল রঙে নম্বর লিখে দেয়া হচ্ছে কাঠের পাতায়। রাবিহ কুবাইসি টাইরে থেকে দাফনের কাজ তদারকি করছেন, যদিও ইসরাইল শহর ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে এবং বিমান হামলা চলছে। এটি তার তিন বছরের মধ্যে দ্বিতীয় যুদ্ধ।

ইসলামে লাশ একবার দাফন হলে তা পুনরায় তোলা যায় না। সাধারণত লাশ গোসল দিয়ে কাফন পরিয়ে সরাসরি মাটিতে দাফন করা হয়। তবে যুদ্ধের মতো বিশেষ পরিস্থিতিতে ‘ওদিআ’ নামে একটি নিয়মে কফিনে দাফন করা যায়, যাতে পরে তা পুনরায় স্থানান্তর করা সম্ভব হয়। কুবাইসি বলেন, মুসলমানকে যেকোনো মুসলিম কবরস্থানে দাফন করা যায়। কিন্তু মানুষ চায় তাদের প্রিয়জনকে পূর্বপুরুষের জমিতে কবর দিতে। এটি আবেগ, ঐতিহ্য ও উপস্থিতির প্রতিফলন। যুদ্ধের কারণে অনেক সময় লাশ গোসল দেয়া সম্ভব হয় না। কুবাইসি বলেন, কখনো শুধু লাশের অংশ পাওয়া যায়। তখন যতটুকু পাওয়া যায়, কাপড়ে জড়িয়ে ব্যাগে রেখে কফিনে রাখা হয়।

তিনি বলেন, সাময়িক দাফন কিছুটা শান্তি দিলেও শেষ পর্যন্ত তা কষ্টের কারণ। পরিবারগুলোকে প্রিয়জনকে দুইবার কবর দিতে হচ্ছে। দক্ষিণ লেবাননের মানুষ আশঙ্কা করছে, হয়তো তারা আর কখনো প্রিয়জনকে নিজ গ্রামে কবর দিতে পারবে না। ইসরাইলি কর্মকর্তাদের বক্তব্যে বোঝা যাচ্ছে, লিতানি নদীর দক্ষিণাঞ্চল দীর্ঘ সময় দখলে রাখা হতে পারে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে হিজবুল্লাহ ও ইসরাইলের ১৩ মাসের যুদ্ধ শেষে ধাইরা গ্রামের মানুষ দ্রুত তাদের নিহতদের পুনরায় কবর দিয়েছিল। কিন্তু ফিরে এসে তারা দেখেছিল, গ্রামের কবরস্থান ধ্বংস হয়ে গেছে। ইসরাইলি বুলডোজার কবরস্থান ও মসজিদ গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ফলে লাশ অন্যত্র কবর দিতে হয়েছিল।

টাইরে সাময়িক কবরস্থানে লাশগুলো অপেক্ষায় আছে। অধিকাংশ পরিবার শহর ছেড়ে গেছে। কেবল কিছু মানুষ ফুল দিয়ে কবর সাজাচ্ছে। আল-ক্লাইলাহ গ্রামের দুই তরুণের কবরেই ছবি রাখা হয়েছে। এক দম্পতি সেখানে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। আইতা আল-চাব গ্রামের মেডিক হিশাম রেদা তার বন্ধু হাদিকে স্মরণ করে বলেন, সে সব সময় আমাদের সাথে ছিল। কিন্তু এবার হামলা এত দ্রুত হয়েছিল যে সে বাঁচতে পারেনি। রেদা আশঙ্কা করছেন, হয়তো আর কখনো বন্ধুকে নিজ গ্রামে কবর দিতে পারবেন না।

কুবাইসি কবরগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকেন, দূরে বিমান হামলার শব্দ শোনা যায়। তিনি বলেন, সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত হলো যখন পরিবার জানতে চায় তাদের প্রিয়জন কেমন ছিল। তারা দেখতে পারে না, কিন্তু আমি দেখেছি। সত্য বলা যায় না, মিথ্যাও বলা যায় না তাদের সান্ত¡না দেয়ার চেষ্টা করি। তিনি বলেন, আগের যুদ্ধের ক্ষত শুকানোর আগেই আমরা নতুন যুদ্ধে ঢুকে পড়েছি।