রফিকুল হায়দার ফরহাদ চর পাতিলা, ভোলা থেকে ফিরে
‘আমরা আর কত চাপব স্থলভাগে? নদীর ভাঙনে চাপতে চাপতে আমরা এই স্থানে এসে ঠেকেছি। তিন দফা ভেঙেছে বাড়িঘর। ঘূর্ণিঝড়-সাইকোনে সবই ভেসে যায়। কিছুই আর থাকে না। পর্যাপ্ত সাইকোন শেল্টার নেই। চিকিৎসাব্যবস্থা এতটাই অপ্রতুল যে বিনা চিকিৎসায় আমাদের মরতে হয়। তার ওপর জলদস্যুর উৎপাত- ডাকাতরা সাগরে আমাদের জাল-ট্রলার সব নিয়ে যায়।’- এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বললেন চর পাতিলার বিএনপি নেতা ও ওয়ার্ড সভাপতি মোহাম্মদ ঝিলন মিয়া।
তার সাথে একই সুর মিলিয়েছেন চর পাতিলা বাজারের ট্রলারের যন্ত্রাংশ ব্যবসায়ী আবদুল মালেক ও আরেক ব্যবসায়ী ইউসুফ মিলন। তাদের ভাষ্য, নদীভাঙনে চরের পাঁচ থেকে সাত কিলোমিটার এলাকা বিলীন হয়েছে। অনেকেই এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন।
ঝিলন মিয়া জানান, প্রতি বর্ষায় নদী ও সাগরে জেলে-মাঝিদের ট্রলার ডাকাতির শিকার হয়। গত বর্ষায় দুইটি ট্রলার জলদস্যুদের কবলে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমেও ডাকাতি হয়; তখন বাজারে এসে হামলা চালায় ডাকাতরা। ‘বছর দশেক আগে আমার দোকানেও ডাকাতি হয়েছিল। সব হারিয়েছিলাম। নদীভাঙনে সেই বাজারই এখন আর নেই,’ বলেন তিনি।
ডাকাতের কবলে পড়লে স্থানীয়রা একজোট হয়ে প্রতিরোধ করতে পারেন না। কারণ ডাকাতরা থাকে অস্ত্রসজ্জিত। তবে তিন-চার বছর আগে ভোলার শশীভূষণের আবুল কালাম নামে এক জলদস্যুক সাগরে পিটিয়ে হত্যা করেন জেলেরা। একাধিক ট্রলারের জেলে এক হয়ে তাকে প্রতিহত করেন। ‘খুব অত্যাচার করত সে,’ বলেন ঝিলন মিয়া। জাতীয় নির্বাচনের আগেও চরের মানুষ ব্যাপক চাঁদাবাজির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ তাদের।
মেঘনা নদীর মোহনায় বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন ভোলা জেলার চর ফ্যাসন উপজেলার চর কুকরি-মুকরি ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ড হলো চর পাতিলা। ষাটের দশকের আগে চরটি জেগে ওঠে। ১৯৬০ সালের দিকে বসতির জন্য বন্দোবস্ত দেয়া হয়। ১৯৭২ সালের পর নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ এখানে বসতি গড়েন। বর্তমানে ভোটার এক হাজার ২৭০ জন; মোট জনসংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। আয়তন প্রায় ১৫ কিলোমিটার। উত্তরে ‘মিনি সুন্দরবন’ খ্যাত চর কুকরি-মুকরি, মাঝখানে আড়াই কিলোমিটার উপকূলীয় বন। ফলে হেঁটে যাতায়াতের সুযোগ নেই; জোয়ারের সময় খালপথে বা নদীপথই ভরসা।
২০২২ সালে চর কুকরি-মুকরিতে গিয়ে বনের ভেতর দিয়ে নির্মিত পাকা সড়ক ধরে হরিণ-শিয়াল-বাঁদর দেখার অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেন প্রতিবেদক। একবার খেয়াঘাটে দেখা মেলে চর পাতিলা থেকে আসা একটি বিয়ের দলের- ছোট ট্রলারে ছাগল উপহার নিয়ে গান বাজিয়ে যাচ্ছিল তারা। আবার ভোরে দেখা যায় চর পাতিলা থেকে হেঁটে আসা লোকজনকে, কাদা ধুয়ে জুতা পরে রওনা দিচ্ছেন। এক মাদরাসাছাত্র খাঁচায় ঝুঁটি শালিকের বাচ্চা, আরেকজন কবুতর নিয়ে এসেছিল। এবার চর পাতিলায় যাওয়ার ইচ্ছা ছিল খালপথে বনের দশ্য দেখতে দেখতে; কিন্তু ভাটার কারণে সম্ভব হয়নি। তাই মেঘনার মোহনা ঘুরে ট্রলারে করে পৌঁছাতে হয় চর পাতিলায়। দুপুরে বাজার প্রায় ফাঁকা। বিকেলে জমে ওঠে কেনাবেচা।
ব্যবসায়ী আবদুল মালেক বলেন, ‘ইলিশ মৌসুমেই আমাদের ব্যবসা জমে। অন্য সময় পুঁজি ভেঙে খেতে হয়।’ ১৯৭৫ সালে এখানে আসেন ঝিলন মিয়া, ১৯৮৮ সালে ইউসুফ মিলন। আবদুল মালেকের বসবাস ৪০ বছর। তাদের অভিযোগ, চরে নাগরিক সুবিধা বলতে কিছু নেই। সামান্য জলোচ্ছ্বাসেই বাজার হাঁটুপানিতে ডুবে যায়। মোবাইল টাওয়ার না থাকায় বাইরে এসে কথা বলতে হয়।
১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণ বাঁচাতে জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েও রক্ষা হয়নি। ৩০-৪০ জনের মৃত্যু হয়, গাছ পড়ে নিহত হন অনেকে। ২০০৭ সালের সিডরে চরের সব গরু-মহিষ মারা যায় বলে জানান ইউসুফ মিলন। ঝড় এলে নিরাপদে যাওয়ার সুযোগও থাকে না; উত্তাল নদীতে ট্রলার চলে না।
চরে কোনো হাইস্কুল নেই; একটি এনজিও পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সেবাও মানসম্মত নয় বলে অভিযোগ। ফলে অধিকাংশ শিশু অল্প বয়সে মাছ ধরার কাজে জড়িয়ে পড়ে। সচ্ছল পরিবারগুলো সন্তানদের দক্ষিণ আইচায় হোস্টেলে রেখে পড়ায়- খরচ দ্বিগুণ হয়।
প্রধান জীবিকা মাছ ধরা, মাছ বিক্রি ও শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ। ইলিশ মৌসুমে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবসায়ীরা এসে ডাকের মাধ্যমে মাছ কেনেন। কিছু এলাকায় ধান, শীতে তরমুজ ও খেসারি চাষ হয়। ‘করলে অনেক ফসলই হয়,’ বলেন ঝিলন মিয়া। তবে তার আক্ষেপ, ‘দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখলেও আমাদের নেই হাসপাতাল, নেই বড় সাইকোন শেল্টার।’ রেড ক্রিসেন্ট নির্মিত একটি সাইকোন শেল্টার এখন ব্যবহার অনুপযোগী।
রোগী গুরুতর হলে ট্রলারে চর ফ্যাসন যেতে চার ঘণ্টা লাগে; স্পিডবোটে ভাড়া চার হাজার টাকা। অনেকসময় পথেই রোগীর মৃত্যু হয়। স্থানীয়দের দাবি- একটি হাসপাতাল, বড় সাইকোন শেল্টার, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং গবাদিপশু রক্ষায় উঁচু কিল্লা নির্মাণ।
চর কুকরি-মুকরি সংলগ্ন চর পাতিলায় একটি পাঁচ-ছয়তলা ওয়াচ টাওয়ার আছে, তবে থাকার ব্যবস্থা না থাকায় পর্যটক কম। ফেরার পথে চোখে পড়ে শুঁটকি পল্লী; চেউয়া মাছের শুঁটকি কেজি ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সেই শুঁটকি কিনে ট্রলারে শুকিয়ে রান্না করে খাওয়ার স্বাদ আলাদা- তবে তার আড়ালে রয়ে যায় নদীভাঙন, জলদস্যুতা ও অবহেলায় অবরুদ্ধ এক দ্বীপের দীর্ঘশ্বাস।



